এক

ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি সারা দেশে ৯৪২-টি বধ্যভূমির খোঁজ পায়। ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ডঃ এম এ হাসান বলেছেন এ হিসাব অসম্পূর্ণ। বধ্যভূমির সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কিছুদিন আগে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ এক লেখায় বলেছেন বাংলাদেশে ছোট-বড় বধ্যভূমির সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

যদি বধ্যভূমির সংখ্যা হয় তিন হাজারের অধিক আর যদি প্রতিটা বধ্যভূমিতে এক হাজার মানুষকে হত্যা করা হয় তাহলে ১৯৭১ সালে শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় তিরিশ লাখের ওপরে। অথচ আমরা দেখতে পাই চট্রগ্রামের পাহাড়তলী বধ্যভূমির একটি গণ-কবরের মাত্র একটা গর্ত থেকে এগারো’শ মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়। সেই বধ্যভূমিতে এরকম গর্ত ছিলো একশোটি। তাহলে একবার কল্পনা করুন তো একা পাহাড়তলী বধ্যভূমিতে কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছিলো? এখানে একটু মনে করিয়ে দিতে চাই ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি তাদের গবেষণায় সারা দেশে যে ৯৪২-টি বধ্যভূমির খুঁজে পায় তার মধ্যে ১১৬-টি বধ্যভূমির উপস্থিতি পাওয়া যায় চট্রগ্রামে।

প্রিয় পাঠক একটু ধারনা করে বলুন তো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা তাহলে আসলে কত? নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না যে মুক্তিযুদ্ধে নিহত সকল মানুষ বধ্যভূমিতে মারা পড়েননি, পাক সেনা এবং তাদের দোসরেরা আমাদের মেরেছে ঘরে ঘরে গিয়ে, শত-শত হাজার-হাজার লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে, শরণার্থী শিবিরে কলেরায়-ডায়রিয়ায়া মারা পড়েছে লাখ লাখ শিশু, যুদ্ধের প্রভাবে দেশের ভেতরে খাদ্যের অভাবে, ওষুধের অভাবে, চিকিৎসার অভাবে কত মানুষ মারা গিয়েছে তার কি কোন হিসাব আছে? তারপরেও এদেশের অনেক মানুষ স্বীকার করতে চায় না মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা তিরিশ লক্ষাধিক।

দুই

আমাদের দেশের কিছু স্থানে ওয়ার সিমেট্রির খোঁজ পাওয়া যায়। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চট্রগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি এবং কুমিল্লার ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি। ওয়ার সিমেট্রি হচ্ছে কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধি। ১৯৪১-১৯৪৫ সালে সংগঠিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে ৪৫০০০ কমনওয়েলথ সৈনিক নিহত হন, তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে এই সমাধিক্ষেত্রগুলো তৈরি করা হয়েছে কমনওয়েলথের পক্ষ থেকে। বাংলাদেশে অফিসিয়ালি বড় আকারে দুটি কমনওয়েলথ রণ সমাধিক্ষেত্র আছে একটি কুমিল্লায় অপরটি চট্টগ্রামে। প্রতিবছর প্রচুর দর্শনার্থী যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের প্রতি সম্মান জানাতে এসকল রণ সমাধিক্ষেত্রে আসেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিভিন্ন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর নিহত ৭৫৫ জন সদস্য চট্রগ্রাম ওয়ার সিমেট্রির সমাধিক্ষেত্রে শায়িত আছেন। এখানে সমাহিত সৈনিকদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাজ্যের ৩৭৮ জন, কানাডার ২৫ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৯ জন, নিউজিল্যান্ডের ২ জন, অবিভক্ত ভারতের ২১৪ জন, পূর্ব আফ্রিকার ১১ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৯০ জন, মিয়ানমারের ২ জন, নেদারল্যান্ডসের ১ জন, জাপানের ১৯ জন এবং বেসামরিক ৪ জন।

কুমিল্লায় আছে যুক্তরাজ্যের ৩৫৭ জন, কানাডার ১২ জন, অস্ট্রেলিয়া ১২ জন, নিউজিল্যান্ডের ৪ জন, দক্ষিণ আফ্রিকার ১ জন, অবিভক্ত ভারতের ১৭৮ জন, রোডেশিয়ার ৩ জন, পূর্ব আফ্রিকার ৫৬ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৮৬ জন, মিয়ানমারের ১ জন, বেলজিয়ামের ১ জন, পোল্যান্ড ১ জন এবং জাপানের ২৪ জন, সর্বমোট ৭২৩ জন যাদের সবার পরিচয় জানা যায়নি।

এই সমাধিক্ষেত্রগুলো Commonwealth War Graves Commission (CWGC) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তারাই এই সমাধিক্ষেত্র পরিচালনা করেন। প্রতি বছর একবার সকল ধর্মের ধর্মগুরুদের সমন্বয়ে এখানে একটি বার্ষিক প্রার্থনাসভা অনুষ্ঠিত হয়।

কুমিল্লা ওয়ার সিমেট্রির প্রবেশমুখে একটি তোরণ ঘর, যার ভিতরের দেয়ালে এই সমাধিক্ষেত্রে ইতিহাস ও বিবরণ ইংরেজি ও বাংলায় লিপিবদ্ধ করে একটি দেয়াল ফলক লাগানো রয়েছে। ভিতরে সরাসরি সামনে প্রশস্থ পথ, যার দুপাশে সারি সারি কবর ফলক। সৈন্যদের ধর্ম অনুযায়ী তাদের কবর ফলকে নাম, মৃত্যু তারিখ, পদবির পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতীক লক্ষ করা যায়- খ্রিস্টানদের কবর ফলকে ক্রুশ, মুসলমানদের কবর ফলকে আরবি লেখা (যেমন: হুয়াল গাফুর) উল্লেখযোগ্য। প্রশস্থ পথ ধরে সোজা সম্মুখে রয়েছে সিঁড়ি দেয়া বেদি, তার উপরে শোভা পাচ্ছে খ্রিস্টধর্মীয় পবিত্র প্রতীক ক্রুশ। বেদির দুপাশে রয়েছে আরো দুটি তোরণ ঘর। এসকল তোরণ ঘর দিয়ে সমাধিক্ষেত্রের পিছন দিকের অংশে যাওয়া যায়। সেখানেও রয়েছে আরো বহু কবর ফলক। প্রতি দুটি কবর ফলকের মাঝখানে একটি করে ফুলগাছ শোভা পাচ্ছে। এছাড়া পুরো সমাধিক্ষেত্রেই রয়েছে প্রচুর গাছ। সমাধিক্ষেত্রের সম্মুখ অংশের প্রশস্ত পথের পাশেই ব্যতিক্রমী একটি কবর রয়েছে, যেখানে একসাথে ২৩টি কবর ফলক দিয়ে একটা স্থানকে ঘিরে রাখা হয়েছে। এই স্থানটি ছিল মূলত ২৩ জন বিমানসৈনিকের একটি গণকবর, যেখানে লেখা রয়েছে:

These plaques bear the names of twenty three Airmen whose remains lie here in one grave
(ওয়ার সিমেট্রি সম্পর্কিত তথ্যগুলো পেয়েছি উইকিপিডিয়া, অফরোড বাংলাদেশে ওয়েবসাইট এবং কমনওয়েলথ গ্রেভস কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে)।

আপনি যখন চট্রগ্রামের কিংবা কুমিল্লার ওয়ার সিমেট্রি গুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে আসবেন আপনার ভেতরে একটা ভয়াবহ হাহাকার এসে ভর করবে। দেশের নানান প্রান্তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষদের কবরগুলো অত্যন্ত যত্নের সাথেই সংরক্ষন করা হয়ে আসছে। আমি আমার শৈশবে সিলেটেও এরকম কিছু কবরের খোঁজ পেয়েছিলাম। এসব জায়গা এমন ভাবে রাখা হয় যে আপনা থেকেই শ্রদ্ধা চলে আসে।

তিন

হায়রে আমার অভাগা জাতি। হাজার হাজার বধ্যভূমি অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকে, কারো একবার মনে হয় না- ‘যাই একটু ঘুরে আসি’। বছর বছর এই অভাগা শহীদদের জন্য লোক জড় হয়ে প্রার্থনা করা হয় না। তাদের শ্বেত কবরফলকে লেখা থাকে না বীরত্বের ইতিহাস। প্রবেশমুখে থাকে না কোন তোরণ। অল্পকিছু বধ্যভূমি সংরক্ষণ করতে পেরেছি আমরা, যেটা মোটের ওপরে একশভাগের একভাগ কিংবা তারও কম।

আমি মাঝেমাঝে চিন্তা করি- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ২৩ জন বিমানসেনাকে একটি কবরে দেখে আমাদের মধ্যে যে হাহাকার তৈরি করে, পাহাড়তলী বধ্যভূমির একটা গণকবরে এগারো’শ-টি মাথার খুলি আছে সেই কথা জেনে আমাদের মাঝে কতোটা হাহাকার তৈরি করা উচিত?

এই দেশের মানুষ দল বেঁধে সাজানো গোছানো ওয়ার সিমেট্রিতে ঘুরতে যায়, শ্বেত-পাথরের মর্মরফলকে দেখে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস, এরপর এরাই মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনলেই বিরক্ত হয়ে যায়, তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে, এক ক্যাসেট তাদের আর ভালো লাগে না, একই প্যাচাল শুনতে শুনতে তাদের কান পচে গিয়েছে। তিরিশ লক্ষ শহীদ আমাদের কাছে কেবল একটা সংখ্যা। কতোটা রক্ত, কতোটা কষ্ট, কতোটা যন্ত্রণায় তিরিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হয় সেটা আমাদের জাতির ধারণায় নাই। আমরা ৪৫ বছরের পুরনো ইতিহাস নিয়ে ঘাটতে চাই না।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-