বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহিত্যপ্রেমী, বাউলিয়ানা যুবকদের যুদ্ধংদেহী রুপটা কেমন ছিল? কীভাবে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়া, লালনের গান শোনা এক তরুণ তার দেশকে ভালোবেসে বুকের সমস্ত সাহস একসাথ করে যুদ্ধে নিজেকে বিলিয়ে দেয়? ‘ভুবন মাঝি’ চলচ্চিত্রে আমরা পাই এরকমই একজনের দেখা। চলুন জেনে আসা যাক মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এক বাউলিয়ানা যুবকের কথা। রবীন্দ্র-নজরুল-লালনে মজে থাকে থিয়েটার পাগল যুবক নহির শাহ্‌র রাজনীতির পালাবদলে, যুদ্ধবাস্তবতায় দেশের স্বাধীনতার পাশাপাশি নিজেকে খোঁজার যুদ্ধই এখানে মুখ্য।

নহির এই চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র। এই চলচ্চিত্র যতটা দেশের যুদ্ধ নিয়ে ঠিক ততটাই নহিরের ব্যক্তিসত্ত্বার সাথে যুদ্ধ নিয়েও। রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম, নজরুলের বিদ্রোহ চেতনা আর লালনের আমিত্ব- এই তিনের মিশেল যার মনে সে স্বাভাবিকভাবেই সময় নেবে সিদ্ধান্ত নিতে। তবুও এই সিদ্ধান্তহীনতার মাঝে থেমে থাকে নি রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় মিজানের সাথে মিলে রাজনীতিতে তার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, শহরে-শহরে, গ্রামে-গ্রামে সচেতনতা সৃষ্টি করা আর ফরিদার সাথে চিঠিতে স্বাধীন বাংলাদেশ আর একটা সুখী সংসারের স্বপ্ন দেখা।

ফরিদা- নহিরের প্রিয়জন। নহিরের প্রিয়তমাসু। তবুও সবকিছু ছাপিয়ে ফরিদা হয়ে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী এক স্বাধীন নারীসত্ত্বার প্রতীক। অদম্য সাহসী এই নারী চরিত্র বারবার সাহস যুগিয়ে গেছে নহিরকে তার লক্ষ্য খুঁজে পেতে। ছয় দফা হস্তান্তরের সময় সেটিকে ফরিদা বলে ওঠে- এ সময়ের চিত্রনাট্য! কী কাব্যিক অভিব্যক্তি। ভুবন মাঝি সেসময় থেকেই যেন হয়ে ওঠে সে সময়ের চিত্রনাট্য। ফরিদার মতো সাহস যুগিয়ে যাওয়ার কাজ নহিরের জন্য আরেকজনও ক্রমাগত করে গেছে আর সে হচ্ছে মিজান। নহিরের বন্ধু, নহিরের সহচর, নহিরের সহযোদ্ধা।

তিনটি চরিত্র যথাক্রমে পর্দায় রূপায়িত করেছেন- পরমব্রত, অপর্ণা ও মাজনুন মিজান। এই ৩ টি চরিত্রই এই চলচ্চিত্রের তিনটি খুঁটি, চতুর্থ খুঁটি এদের আত্মবিশ্বাস। পরমব্রত সিদ্ধান্তহীনতায় যুঝতে থাকা একজন দেশপ্রেমিকের চরিত্রে উতরে গেছেন নিখুঁতভাবে। অপর্ণা একটা রেভেলেশন। সুঅভিনেত্রী হিসেবে তাকে জানতাম আগে থেকেই, কিন্তু এভাবে একটা চরিত্রকে একদম নিজের করে নিতে হলে অসাধারণ অভিনয়দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস লাগে, সেটিই তিনি করে দেখিয়েছেন। তার মেকাপবিহীন শ্যামল স্নিগ্ধতা, সুতি শাড়ি গোল গলার ব্লাউজে অনিন্দ্যপনা আর ডায়লগ ডেলিভারিতে কঠোর কোমলতা মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। মাজনুন মিজান এতো বছর পর চলচ্চিত্রে ফিরে এসে অনবদ্য অভিনয়দক্ষতা দেখিয়েছেন। আমি নিশ্চিত নহিরের সেসময় যদি মিজান নামে আসলেই কোন বন্ধু থেকে থাকেন তাহলে এই মিজানে তিনি মুগ্ধ হতেন। এছাড়া নওশাবা, গায়ক সোহেলকেও তাদের চরিত্রে ভালো মানিয়েছে। মামুনুর রশীদের মতন একজন শক্তিমান অভিনেতার চরিত্র আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করেছিলাম, এক্ষেত্রে কিছুটা হতাশা রয়েছে। বাকি চরিত্রগুলো যার যার কাজ ভালোমতোই করেছে।

এই চলচ্চিত্রের বিষয় নির্বাচন ও সেটা নিয়ে স্ক্রিপ্ট প্ল্যানিং করা অনবদ্য হয়েছে। ৩ টা ভিন্ন টাইমলাইন এনে দর্শককে সেটা বোঝানো খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এ জায়গায় পরিচালক উতরে গেলেও, দুর্বলতা রয়ে গেছে স্ক্রিনপ্লেতে। প্রথম দিকে গল্পে একটু বেশিই ডিটেইলিং ছিল, একেকটা ফ্রেম প্রয়োজন ছাড়াই আধা-এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড বেশি ধরে রাখা হচ্ছিল, একই দেয়াল লিখন বারবার দেখিয়ে সিম্বলাইজ করার চেষ্টা বা ঘন ঘন নিঃশ্বাস নেয়া প্রায় এক মিনিট ধরে শোনানো অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে এবং স্ক্রিনপ্লের ফ্লোকে হ্যাম্পার করেছে বলে মনে হয়েছে। সেকেন্ড হাফে প্রথম হাফের তুলনায় বেশ তাড়াহুড়ো মনে হয়েছে। আর ফিনিশিংটা একদমই হঠাৎ করে, একদমই। এখানেই মূলত ডিটেইলিং এর বড় একটা সুযোগ পরিচালক ও এডিটর মিস করে গেছেন।

সিনেম্যাটোগ্রাফি অনবদ্য ছিল। ওয়াইড এঙ্গেল শট, ড্রোন ক্যামেরার চমৎকার ব্যবহার মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে “আমি তোমারই নাম গাই” গান ও সেই গানের সিনেম্যাটোগ্রাফিই আপনার পয়সা উসুল করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রতিটি গানই শ্রুতিমধুর ছিল। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর ডাবিং অনবদ্য ছিল। ‘পড়শি বসত করে’ গানে আসলে উঠে এসেছে প্রতিবেশি দুই দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় চাপা পড়ে যাওয়া ভালোবাসার কান্নাটাই। একসময় যারা হাত বাড়িয়ে দিতো পরম ভালোবেসে সেই ভালোবাসা এখন কই হারিয়ে গেছে? সে কান্নাই ধ্বনিত হয় পরমব্রতের কণ্ঠে-

পদ্মা নদীর নৌকা ভিড়লো হুগলী নদীর চরে,
বাড়ির কাছে আরশি নগর, পড়শি বসত করে।
পড়শি আমার পশ্চিম জুড়ে, পড়শি আমার পূবে,
নাও যদি ছোঁয় জল দেখো ঠিক, পড়শিও এসে ছোঁবে…

ভুবন মাঝি কেবল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র না। এর মাঝে ব্যক্তিমানসের আত্মিকদ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে যুদ্ধ পূর্ববর্তী ও যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের একটা স্থিরচিত্র দেখতে পাওয়া যায়। যে স্থিরতা কখনো গতি পায় ইতিহাসের পাতাকে জীবন্ত করে আবার কখনো বর্তমানকে মূর্ত করে। ফাখরুল আরেফীন খান সরকারি অনুদানের স্বল্প বাজেটেই চমৎকার এক সিনেম্যাটিক ক্যানভাসের সৃষ্টি করেছেন, যেখানে নহির শাহ্‌র উপস্থিতিতে ৬ দফা, নির্বাচন, স্বাধীন দেশের পতাকা উত্তোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ভারত সরকারের সহযোগিতা, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা ও বাউল শিল্পী/ভিন্নধর্মী মানুষদের ওপর হওয়া অত্যাচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সবকিছু উঠে এসেছে অকপটে, লাল-সবুজের গাঢ় স্বাপ্নিক তুলিতে। মুক্তির দিন অর্ধেক খালি হলে দেখেছিলাম ‘ভুবনমাঝি’, কিন্তু সিনেমা শেষে স্রেফ দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকেই দাঁড়িয়ে হাত তালি দিয়েছি আমরা সবাই। মানুষ কম হলেও আসলে এক হওয়াটাই জরুরী। এই হাত তালি গুলির মতো ছড়িয়ে পড়ুক সারা দেশে। যে গুলিতে মুক্তি পাবে চলচ্চিত্র, মুক্তি পাবে ভেতরে উত্তরাধিকারসূত্রে চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস। ৪৬ বছরের চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস…যে দীর্ঘশ্বাসে ছন্দ দিলে অনেক গভীর কবিতা হবার কথা।

কবিতা গেল মিছিলে, মিছিল নিয়েছে চিলে,
অসহায় জন্মভূমি।
আজ একতারার ছিলা তোমার স্পর্শ চায়
যদি টঙ্কার দাও তুমি।
আমি তোমারই, তোমারই, তোমারই নাম গাই,
আমার নাম গাও তুমি।।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-