গর্ভধারিনী মাকে রেলস্টেশনে ফেলে রেখে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক বিসিএস ক্যাডারের বিরুদ্ধে। গত ২৯ মার্চ এমন অভিযোগ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করা হয় ব্যারিস্টার এস এম ইকবাল চৌধূরীর টাইমলাইন থেকে। সেখানে বলা হয়-

কি ভাবছেন, এখনই শুরু হবে রেলস্টেশনে মা’কে ফেলে যাওয়া এক নরাধম পাষণ্ড বউয়ের দাস বিসিএসপুত্রের উপাখ্যান বর্ণনা ? গতকাল রাত থেকে যেভাবে আলোর গতিতে এই মর্মস্পর্শী উপাখ্যান ভাইরাল হতে শুরু করলো, আর সেটার সত্যাসত্য বিশ্লেষণ না করে, তথ্যসুত্র না জেনে, ঘটনাটা ক্রসচেক না করেই যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সবাই শেয়ার দিতে জগতের সকল ছেলেসন্তানের প্রতি, বিসিএস ক্যাডারদের প্রতি এবং ম্যাজিস্ট্রেস্টদের প্রতি প্রবল বিষেদাগার ছড়াতে শুরু করলেন, তাতে বিস্মিত হবার সময়টাও পাওয়া গেল না। আর তারপরেই ঘটলো সবচেয়ে বিচিত্র ঘটনা। যুগান্তর, কালেরকন্ঠসহ দেশের প্রথম সারির দায়িত্বশীল পত্রিকাগুলো পর্যন্ত এটা হুবহু কপি পেস্ট করে তাদের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ করে দিল! কি আশ্চর্য! কোন রেফারেন্স নাই, কোন তথ্যসুত্র নাই, স্রেফ ক্লিকবিটে কিছু টাকা কামানোর জন্য একটা আবেগী গুজব ছাপিয়ে দিয়ে হাজার হাজার শেয়ার করানোটা কি ধরনের সাংবাদিকতা?

আসুন পুরো ঘটনাটা আবার প্রথম থেকে দেখা যাক। যে ঘটনাটি মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা হচ্ছে এক প্রশাসন ক্যাডারের বিসিএস কর্মকর্তা তার ম্যাজিস্ট্রেট বউয়ের কথায় নিজের গর্ভধারিনী মাকে রেলস্টেশনে ফেলে গেছেন। এস এম ইকবাল চৌধুরী নামে এক ব্যারিস্টার রেলস্টেশনে তার এক কলিগের জন্য অপেক্ষমাণ থাকাকালীন এই মাকে খুঁজে পান, যিনি তার ছেলের খোঁজ করছেন এবং বলছেন, তার খোকা কোথায় গেল? তার সাথে একটা ছোট ব্যাগ আছে যার পকেটে থাকা এক চিঠিতে জানা গেল, মা সন্তানকে লোকের বাড়িতে কাজ করে আর রাতে কাপড় সেলাই করে বিসিএস পাশ করালেও এখন বউয়ের পছন্দ না হওয়ায় কাপুরুষ সন্তান তার মাকে স্টেশনে ফেলে চলে গেছে। তাই সন্তান তার মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে একটা আবেগী চিঠি লিখে মাকে রেলস্টেশনে ফেলে চলে গেছে। বৃদ্ধাকে পরে সেই ব্যারিস্টার একটি বৃদ্ধাশ্রমে ভর্তি করেন এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

বড়ই মর্মস্পর্শী কাহিনী! যেই পড়বে, সেই কিছুটা হলেও ধাক্কা খাবে, স্বভাবতই প্রবল ক্ষোভ আর রাগ জন্মাবে ওই সন্তানের উপর। কিন্তু একই সময়ে যদি মাথাটা একটু ঠাণ্ডা রেখে চিঠি এবং এই লেখার বিশাল বিশাল অসঙ্গতিগুলো নিয়ে কেউ ভাবে, তাহলে প্রথমেই মনে পড়বে সেটা হচ্ছে, একজন বিসিএস ক্যাডার কেন তার মাকে রেলস্টেশনে ফেলে যাবে? বউয়ের জন্য যদি মাকে একসাথে রাখতে সমস্যা হয় কোন পাষন্ড কাপুরুষ সন্তানের, তাহলেও তো এইভাবে নিজের মাকে রেলস্টেশনে ফেলে চলে যাবে না কারন এতে ঝামেলা বাড়ার সম্ভবনা থাকে, কোনভাবে এই ঘটনা ছড়িয়ে গেলে লোকজনের কাছে লজ্জিত হবার ভয় থাকে। বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসলে যেন কোন সমস্যা না হয়। তার চেয়েও বড় কথা, যদি যুক্তি দিয়ে চিন্তা করি, একজন ম্যাজিস্ট্রেট পদমর্যাদার বিবাহিত বিসিএস ক্যাডারকে কর্মক্ষেত্রের শুরুর দিকে দেশের নানা জায়গায় পোস্টিং-এর কারণে থাকতে হয়। ফলে সন্তানকে ঢাকায় রেখে পড়ালেখা করাতে চাইলে সবচেয়ে বড় সমস্যা রিলায়েবল গার্ডিয়ান। যেহেতু বাবা-মা দুজনেই সরকারী চাকুরে, সুতরাং দুজনের পোস্টিং ভিন্ন ভিন্ন জেলায় হবার কথা। সেক্ষেত্রে তাদের সন্তানের জন্য শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর চেয়ে রিলায়েবল গার্ডিয়ান আর কে হতে পারে? সুতরাং এই জায়গা থেকেও এই ঘটনার কোন বিশ্বাসযোগ্যতা নেই!

তারপর যদি কেউ এই ঘটনাটা নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করতেন গুগলে, তাহলে এক্তা বড়সড় ধাক্কা খেতেন। কারণ বৃদ্ধা মহিলার যে ছবিটা এই লেখায় ব্যবহার করা হয়েছে, সেই ছবিটা আসলে একটা ভারতীয় ডকুমেন্টরী থেকে নেওয়া, ২০১৫ সালের ১৩ই জুন এই ডকুমেন্টরীটি পাবলিশ হয়েছিল ইউটিউবে। এই বৃদ্ধা আসলে বৃন্দাবনের এক আশ্রমের বাসিন্দা।

মজার ব্যাপারটা হচ্ছে যে ব্যারিস্টার এস এম ইকবাল চৌধুরীর ফেসবুক আইডি থেকে এই মিথ্যাচার করা হয়েছে, এই নামে এখন পর্যন্ত কোন ফেসবুক আইডি পাওয়া যায়নি। তার মানেটা কি দাঁড়াল? যে ঘটনা নিয়ে এতো হইচই, বিসিএস ক্যাডার আর ম্যাজিস্ট্রেটদের অকথ্য ভাষায় গালাগালির উৎসব চললো, সেটা আসলে পুরোটাই একটা ভয়ংকর মিথ্যাচার। সচবেয়ে হাস্যকর হচ্ছে, চিঠিটার ভেতরে একটা লাইনে “সে তোমাকে মেনে নিতে চাই না” যে বানান ভুল হয়েছে, একজন অর্ধশিক্ষিত মানুষও সেই ভুল করবে না। এই ভুলটা দেখেই অতি মাত্রায় মেলোড্রামাটিক দুকূল উপচানো আবেগ দেখেই বোঝা দরকার ছিল, এই চিঠির লেখক কোন হিন্দি সিরিয়ালের দর্শক।

অথচ আমরা বেশিরভাগ মানুষ এই চিঠি, এই ঘটনার সত্যমিথ্যা যাচাই না করেই লাইক-শেয়ার-কমেন্টে ছড়িয়ে দিলাম সোশ্যাল মিডিয়ায়, এমনকি দুটো প্রথম সারির সংবাদপত্র পর্যন্ত হুবহু একই জিনিস ছাপিয়ে হিট সিক করার চেষ্টা করলো। কি অসুস্থ, জঘন্য আমাদের এই লাইক-শেয়ারের বুভুক্ষতা, কি নিদারূন জঘন্য আমাদের বিবেচনাবোধ, কমনসেন্স!

অথচ এই সমাজেই এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটে যেখানে সারা জীবন ধরে কষ্ট করে সন্তানকে লালনপালন করার পর বড় করার পর সেই সন্তান ভালো একটা চাকরী পেয়ে বাবা-মাকে ভুলে যায়! আজো দেশের অজস্র অসহায় মা-বাবা তাদের আদরের ধন, বুকের মানিক বিখ্যাত ধনী টাকাপয়সাওয়ালা শিক্ষিত অমানুষ সন্তানদের কাছ থেকে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আর অবহেলা সহ্য করতে করতে একটা সময়ে তাদের আশ্রয় হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে, যেখানে জীবনের শেষদিন গুলো প্রবল হতাশা আর আক্ষেপে একটু একটু করে কষ্ট পেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছেন তারা। এমন ঘটনা আজও এই সমাজে অজস্র। কিন্তু সামান্য লাইক-কমেন্ট-শেয়ারের আশায় আমরা যারা এই ঘটনাগুলো নিয়ে মিথ্যাচারের ব্যবসা ফেঁদে বসছি, তারা অজান্তেই নষ্ট করে দিচ্ছি বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গাটা, ফলে কাল যদি সত্যিই এমন কোন অমানুষ নরাধমের মাকে রেলস্টেশনে রেখে আসার ঘটনা ঘটে, তাহলে দেখা যাবে আজ এভাবে প্রতারিত হওয়ায় কাল অনেকেই সত্যি বাস্তবটা আর বিশ্বাস করছে না। এই প্রতারণা শুধু যে পাঠকের সাথে প্রতারণা, তাই না, বরং অকৃতজ্ঞ বেইমান সন্তানদের কাছ থেকে শেষ বয়সে অবহেলার শিকার বাবা-মার প্রতি জঘন্য নোংরা এক বিদ্রুপও! স্রেফ কয়েকটা সস্তা লাইক শেয়ারের আশায় বৃদ্ধাশ্রমে থাকা অসহায় মা-বাবাদের প্রতি নির্লজ্জ টিটকারী!

আর এই টিটকারীটা গতকাল দিয়েছি আমরা। শুধু যে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা বাবা-মার প্রতি নোংরামি করেছি, তাই নয়, খুব সুকৌশলে বিসিএস ক্যাডার বিশেষ করে আমাদের সমাজে অন্যতম মর্যাদার সরকারী চাকরী হিসেবে স্বীকৃত অ্যাডমিন ক্যাডারের ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতি অযাচিত ভয়ংকর ঘৃণা আর নোংরামি উগরে দেওয়ার একটা উৎসবও করেছি আমরা গতকাল। ব্যাপারটা যেন এমন যে, পাইছি একটা সুযোগ ম্যাজিস্ট্রেটদের গালাগালি করার, কইরা নেই। অথচ আমি এমন এক বিসিএস ক্যাডারকে চিনি, যিনি তার অসম্ভব ভালোবাসার মানুষটিকে, তার অনেক বছরের প্রেমিকার সাথে সম্পর্কের ইতি টেনেছিলেন কারণ তার প্রেমিকা তার বাবা-মাকে অসম্মান করেছিলেন, অপদস্থ করেছিলেন, বাজে ব্যবহার করেছিলেন। এবং এর জন্য তার বুকটা ফেটে গেলেও তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরেননি, এতো বছরের ভালোবাসার সম্পর্ক ছেড়ে আসতে এক বিন্দু দ্বিধা করেননি। কিছু কুলাঙ্গার আছে, থাকবে, কিন্তু বাবা-মার সম্মানটা সবকিছুর উপরে, সবকিছুর চেয়ে বেশি। আর ঠিক সেই সম্পর্কটা নিয়েই কুৎসিত নোংরা এই মিত্থ্যাচার ছড়িয়ে যারা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সরকারী কর্মকর্তাদের সাধ মিটিয়ে গালাগালি করে নিলেন, তারা ব্যক্তিজীবনে যে চরমভাবে ব্যর্থ এবং লুজার, সেটা খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে।

জাতি হিসেবে আমরা দিন দিন আরো অসুস্হ আর নির্লজ্জ হচ্ছি। মিথ্যাচার আর অপপ্রচারে বিশ্বাস করাটা, মিথ্যাচার আর নোংরামি ছড়িয়ে লাইক-শেয়ার কামানোটাই আজ জনপ্রিয়তার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমরা মিথ্যা খাচ্ছি, মিথ্যায় ঘুমাচ্ছি আর নোংরামি ছিটিয়ে বেড়াচ্ছি যেখানেসেখানে, মেতে উঠছি অসুস্থ অপপ্রচারের উৎসবে। আর জাতির আয়না বলে স্বীকৃত সংবাদমাধ্যম/সংবাদপত্র, নিউজপোর্টালগুলো আমাদের এই অধঃপতনে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করা তো দূরে থাক, বরং আরো আগ্রহ আর উল্লাসে আমাদের চেয়ে আরো কয়েক ধাপ নীচে নেমে আমাদের পথ দেখাচ্ছে নোংরামি আর অন্ধকারের দিকে। কোথায় গিয়ে থামবো আমরা? আদৌ কি থামবো?

*

”আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে চাইলেও আমরা অনেক সময় সশরীরে গিয়ে অনেক তথ্য যাচাই করার সুযোগ পাইনি। সেক্ষেত্রে দেশীয় নানা ‘প্রতিষ্ঠিত’ সংবাদমাধ্যমের প্রতি আমাদের আস্থা রাখতে হয়েছে, এবং তারই প্রেক্ষিতে আমরাও তিনবার এমন ‘ধরা’ খেয়েছি। ভুল স্বীকার করতে আমাদের কখনোই দ্বিধা নেই, কারণ আমরা একদমই নবীশ প্ল্যাটফর্ম, অজস্র সীমাবদ্ধতা আমাদের। তবে সেই ভুল আর নয়। এমন ভাইরাল কন্টেন্ট আমাদের দরকার নেই, যা সম্পূর্ণ বানোয়াট, কল্পনাপ্রসূত। এ কী করলেন অমুক, দেখুন ভিডিওসহ- এসব করে অন্যান্যরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, হচ্ছে। আমরা না হয় এমন ‘ছোটখাটো’ অল্টারনেট মিডিয়াই হয়ে রইলাম!”

-সম্পাদক

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-