সিনেমা হলের গলি

ভারতে বিক্রম বাত্রাদের নিয়ে শত শত সিনেমা বানানো হয়, আর আমাদের দেশে…

ভারতের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯৫। মাস্টার্সের ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হওয়া বিক্রম বাত্রা আর ডিম্পল চিমা’র বন্ধুত্বটা গভীর হচ্ছিল ক্রমশ। সেটা যে প্রেমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এটা বুঝতে পারছিল দুজনেই। বিক্রম হিমাচলের ছেলে, পাহাড়ে বড় হয়েছে সে। মনের কথা রাখঢাক করার স্বভাব নেই, সোজাসুজি এসে বলে দিল ডিম্পলকে। চণ্ডিগড়ের মেয়ে ডিম্পলেরও তাতে আপত্তি ছিল না। প্রেমের শুরুটা সুন্দর হবার কথা ছিল, কিন্ত নিয়তির লিখনে বিধাতা গল্পটা লিখেছিলেন একটু অন্যরকম করে। সপ্তাহখানেক পরেই বিক্রমের নামে চিঠি এল ভারতীয় সেনাবাহিনীর তরফ থেকে, লং-কোর্সের জন্যে মনোনীত হয়েছে সে।

ছোটবেলা থেকেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার অদম্য একটা বাসনা ছিল বিক্রমের। সমবয়েসী বন্ধুরা যখন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-পাইলট হতে চাইতো, বিক্রম তখন স্বপ্নে নিজেকে দেখতে পেতো বরফঢাকা কাশ্মিরের কোন এক পাহাড়চূড়ায়, সেনাবাহিনীর জলপাইরঙা পোষাকটা গায়ে জড়িয়ে ডিউটি করছে সে। সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটেই গ্র‍্যাজুয়েশনের পরে আর্মির ভর্তিপরীক্ষায় অংশ নেয়া। পরীক্ষার ফল আসার আগেই পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল বিক্রম।

পাঞ্জাব ছাড়তে হবে বিক্রমকে, ছাড়তে হবে প্রেয়সীর সঙ্গ। মনকে প্রবোধ দিতে কষ্ট হলো, জীবনের প্রথম প্রেম বলে কথা! কিন্ত সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার চাইতে বড় কোন প্রেম বিক্রমের জীবনে ছিল না। চণ্ডিগড় ছেড়ে দেরাদুনের পথে পা বাড়তে হলো বিক্রমকে, সাল ১৯৯৬। পেছনে ভালোবাসা আর স্মৃতির ভাণ্ডার নিয়ে পড়ে রইলো ডিম্পল। দুজনের কেউই হয়তো জানে না, ভালোবাসার গল্পের শেষের শুরুটা হয়ে গিয়েছিল তখনই।

১৯৯৯, কারগিল। উত্তপ্ত সীমান্ত, যুদ্ধের দামামা বাজছে, বাতাসে বারুদের গন্ধ পাওয়া যায়। পাহাড়ে হিমশীতল বরফের মাঝে মৃত্যুর হাতছানি। ওপাশে পাকিস্তান, এপাশে ভারত। মাঝখানে লাইন অফ কন্ট্রোল, এলওসি।

বিক্রম তখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন, কারগিলের সেই অশান্ত সময়টায় সেখানে ডাক পড়লো তার। জয়েনিঙের আগে বাড়িতে সবার সাথে দেখা করতে এসেছিল বিক্রম। ছেলেবেলার এক বন্ধুর সাথে বাড়ির পাশের নিউগাল ক্যাফেতে বসে কফি খেতে খেতে কারগিলের কথা হচ্ছিল। যুদ্ধ বাঁধতে পারে যেকোন মূহুর্তে, এটা মনে করিয়ে দিয়ে বিক্রমকে সেই বন্ধু বলেছিল, সাবধানে থাকিস। শুনে হাসতে হাসতে বিক্রম জবাব দিয়েছিল- “হয় বরফের ওপরে পতাকা উড়িয়ে আসবো, নইলে সেই পতাকা গায়ে জড়িয়ে আমার দেহ আসবে। পতাকার সঙ্গে আমি থাকবোই!”

১৩ নম্বর জুম্মু-কাশ্মির রাইফেলসে পোস্টিং হলো তার। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, দুই পক্ষের পদাতিক সৈন্যরা লড়ছেন নিজ নিজ দেশের হয়ে। কারগিলের উঁচু পাহাড় থেকে আক্রমণ চালাচ্ছে পাকিস্তানী সেনারা, ভারতীয় সেনাদের বাঙ্কারগুলো দখল করে সেখানে জুড়ে বসেছে তারা। বিক্রম বাত্রাকে দায়িত্ব দেয়া হলো এমনই একটা পাহাড় জয় করার। দশজন সঙ্গী নিয়ে অভিযানে নেমে পড়লেন তিনি খাড়া পাহাড়, বরফে ঢাকা। লুকিয়ে শেল্টার নেয়ার মতো জায়গা নেই, ওপর থেকে গুলি করলে সেটা হজম করে নেয়া ছাড়া আর কোন পথও খোলা নেই। রাতের আঁধারে দলের বাকীদের নিয়ে পাহাড়ে চড়ার মিশনে নামলেন বাত্রা, এরমধ্যে ওপর থেকে ছুটে আসছিল গুলি, তবে পজিশন জানা না থাকায় মিসফায়ারেই পরিণত হচ্ছিল সেগুলো।

আটঘন্টা একটানা চেষ্টার পরে চূড়া থেকে একশো ফুট নীচে এসে পৌঁছুলো ভারতীয় সেনাদের দলটা। খানিকটা বিরতি দিলেন সবাই, চারপাশ অদ্ভুত রকমের চুপচাপ। ভোরের আলো ফুটতেই বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাত্রা, পেছনে তার সঙ্গীরা। পাকিস্তানী সেনারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল, সেই বিস্ময় কাটার আগেই ওদের বুকে বিঁধে যেতে লাগলো বিক্রমের হাতের ধারালো ছুরির ডগা! মেশিনগান সহ একটা বাঙ্কার একাই উড়িয়ে দিলেন বিক্রম বাত্রা! দুটো গুলি হজম করলেন, কিন্ত ক্ষীপ্রতা কমলো না একটুও!

টাইগার হিলের এক নম্বর জাতীয় সড়ক, ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাশ্মির রেঞ্জের লাইফলাইন। এখান দিয়েই যাবতীয় অস্ত্র আর রসদ আসে। পাকিস্তানীরা চাইছিল সেটা ধ্বংস করে ভারতীয়দের কোণঠাসা করতে। পয়েন্ট ৪৮৭৫ তখনও পাকিস্তানীদের দখলে। সেটা ওদের হাত থেকে উদ্ধার করতেই হবে। বিক্রমের খোঁজ পড়লো আবার। ষোল হাজার ফুট উচ্চতার সেই পয়েন্ট-৪৮৭৫ দখলের জন্যে যাত্রা করলেন তিনি।

প্রায় আশি ডিগ্রি খাড়া ঢাল। তুষারে দেবে যাচ্ছে পা, কুয়াশায় দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। হিমশীতল বাতাস গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়। এরমধ্যেও পথচলা থামে না ওদের। পাকিস্তানী বাঙ্কারের সামনে আসতেই পড়তে হলো বাধার মুখে, ছুটে এলো গুলির বৃষ্টি। ওরাও পাল্টা জবাব দিলেন। থেমে থেমে চলতে লাগলো বন্দুকযুদ্ধ। দিন গড়িয়ে রাত এলো, রাত কেটে গিয়ে আবার সকালও হলো; কেটে গেল ছত্রিশটা ঘন্টা। এরমধ্যে হঠাৎ এক অফিসার আহত হলেন গুলির আঘাতে, তাকে উদ্ধার করতে গেলেন বিক্রম। কাভার থেকে সরে গিয়েছিলেন, সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে ভুল করেনি এক পাকিস্তানী সেনা। পেটে গুলি লাগলো বিক্রমের, আহত পেট চেপে ধরেই সঙ্গী অফিসারকে উদ্ধার করতে এগিয়ে গেলেন বিক্রম, গুলি ছুঁড়লেন পাকিস্তানীদের বাঙ্কার সই করে। বরফের আড়ালে লুকিয়ে তিন পাকিস্তানী সেনাকে একাই শেষ করলেন তিনি।

তবে আরও একজন যে রয়ে গেছে, সেটা হয়তো খেয়াল করেননি বিক্রম। উঠে দাঁড়াতেই আবার ছুটে এলো গুলি, শরীরটা বেঁকে গেল মূহুর্তেই, বরফের ওপর টাটকা রক্তের দাগ, সেই দাগটা বড় হচ্ছে ধীরে ধীরে। উষ্ণ রক্তগুলো জমাট বরফে রূপ নিচ্ছে। এক সেনা এগিয়ে এলো তাকে সাহায্য করতে। অস্ত্র তুলে বিক্রম শাসালেন তাকে, ‘ফিরে যাও, তোমার বাচ্চাকাচ্চা আছে’! চোখের সামনে দলের সবচেয়ে চৌকস সেনা অফিসার মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে, সেটা চেয়ে চেয়ে দেখা কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। দলের বাকীরা এবার ঝাঁপিয়ে পড়লো, সমানে কচুকাটা করলো পুরো পাহাড়ে থাকা প্রতিটা পাকিস্তানী সেনাকে। ভারতের তিনরঙা পতাকাটা উড়িয়ে দেয়া হলো সেখানে, বিক্রম বাত্রা তখন চিরতরে দুচোখ বন্ধ করেছেন!

মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে শেষবার বাড়িতে ফোন করেছিলেন বিক্রম। জানিয়েছিলেন, ভালো আছেন। ডিম্পলকে কি বলেছিলেন বিক্রম? দুজনে মিলে সুখের সংসারের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ওদের বিয়ে করার কথা ছিল কারগিলের ঝামেলাটা শেষ হলেই। কারগিল শান্ত হয়ে গেছে, বিক্রম আর ডিম্পলের বিয়ের পিঁড়িতে বসা হয়নি। বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া বিক্রমের দেহটা ফিরে এসেছিল হিমাচলে, ভারতের তিনরঙা পতাকায় মুড়ে। বিক্রম কথা রেখেছেন, পাহাড়ে পতাকা উড়িয়ে এসেছিলেন, নিজে পতাকা গায়ে জড়িয়ে এসেছিলেন!

এই গল্পটা কেন বললাম জানেন? বিক্রম বাত্রার মতো সাহসী বীর বিশ্বের অনেক দেশেই আছে, যারা নিজের দেশের জন্যে জন্যে জীবন উৎসর্গ করেছেন, হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছেন। তাহলে এই গল্পটার মধ্যে বিশেষ কি আছে? বলছি সেটা। ভারত বিক্রম বাত্রাকে স্মরণ করেছে কৃতজ্ঞ চিত্তে, দিয়েছে সম্মাননা। বিক্রম বাত্রাকে তার ব্যাচমেট আর কাছের আর্মি অফিসারেরা ডাকতেন ‘শেরশাহ’ নামে। প্রচণ্ড ক্ষিপ্র ছিলেন বলে বাঘের ক্ষিপ্রতার সাথে তুলনা করেই এই নাম দেয়া। সেই বিক্রম বাত্রাকে নিয়ে সিনেমা বানানো হয়েছে ভারতে, অনেক নায়কই বিক্রমের এই অবদানকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন রূপালী পর্দায়। এবার আসছে তার জীবনী নিয়ে বায়োপিক। করণ জোহরের প্রযোজনায় নাম ঠিক না হওয়া সিনেমাটাতে বিক্রমের ভূমিকায় অভিনয় করবেন সিদ্ধার্থ মালহোত্রা।

আমাদের গর্ব করার মতো মহান মুক্তিযুদ্ধ আছে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের দামে কেনা এই দেশটা, দুই লক্ষের বেশী মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া এই পবিত্র ভূমি। এই মাটির বুকে কত লক্ষ লক্ষ গল্প লুকিয়ে আছে, সেটা আমরা নিজেরাও জানিনা। আমাদের সাত বীরশ্রেষ্ঠ আছেন, সিলেটের শহীদ জগৎজ্যোতি দাস আছেন, পুরান ঢাকার নাদের গুণ্ডা আছেন, আছেন ক্র‍্যাকপ্লাটুনের শহীদ রুমী-বদীদের মতো দুঃসাহসী যোদ্ধারা, যারা দেশের জন্যে অকাতরে বিলিয়ে গেছেন প্রাণ। এই মানুষগুলোকে সেলুলয়েডে তুলে আনতে কেন আমাদের এত অনীহা? কেন আমরা ওদের বীরত্বগাঁথাগুলো নতুন প্রজন্মকে সিনেমার মাধ্যমে জানানোর পথটা বেছে নিচ্ছি না?

‘অস্তিত্বে আমার দেশ’ নামে একটা সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল অনেক বছর আগে, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের আত্মত্যাগের গল্প নিয়ে বানানো হয়েছিল সেটা। এটা ছাড়া আর কোন বীরশ্রেষ্ঠ বা মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বকে উপজীব্য করে এদেশে কোন সিনেমা নির্মিত হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে অনেক সিনেমা হয়েছে, কিন্ত সংখ্যার বিচারে সেগুলোর পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বাদই দিলাম, এক কারগিল যুদ্ধ নিয়েই ভারতে বানানো সিনেমার সংখ্যা শত শত। এমনকি একাত্তরের ৩-১৬ই ডিসেম্বরের পাক ভারত যুদ্ধ নিয়েও বলিউডে অজস্র সিনেমা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ হিসেবেও চালিয়ে দিয়েছে অনেকে। আমরা ফেসবুকেই প্রতিবাদ করেছি, প্রতিবাদটা সিনেমার মাধ্যমে করা হয়ে ওঠেনি কখনও।

ভারতের দিকে তাকান একটু, স্বাধীনতা সংগ্রামী ভগত সিং থেকে শুরু করে দৌড়বিদ মিলখা সিং, কিংবা বক্সার ম্যারি কম থেকে নীরজা ভানোত অথবা কুস্তিগীর মহাবীর সিং ফোগাত- ওদের দেশের জন্যে যারা অবদান রেখেছে, সবাইকে নিয়ে তারা সিনেমা বানিয়েছে, ভুলে যাওয়া চরিত্রগুলোকে হাজির করেছে সেলুলয়েডের পর্দায়। মানুষ বিনম্র চিত্ত্বে স্মরণ করেছে এই নায়কদের অবদান। তাহলে আমরা কেন পিছিয়ে আছি? আমাদের ইতিহাসে তো নায়ক-মহানায়কের অভাব নেই!

আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে নিয়ে একটা সিনেমা বানানো হবে, আকাশে ঝাঁকি খেতে থাকা টি-৩৩ বিমানের ভেতরের ধস্তাধস্তির দৃশ্যটা এদেশের একটা সিনেমা হলে বসে দেখতে দেখতে উত্তেজনায় শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাবে আমার। একদম মফস্বলের একটা সিনেমা হলে বসে একটা ছেলে জানবে শহীদ রুমী আর শহীদ বদির সাহস, দেশপ্রেম আর আত্মত্যাগের গল্পটা, একাত্তর আর দুই হাজার আঠারোর মধ্যে একটা সেতুবন্ধন রচিত হবে সিনেমার মাধ্যমে, এমন স্বপ্ন দেখতে আমার প্রচণ্ড ইচ্ছে হয়।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close