বয়স হয়েছে, শরীরে সবকিছু আর কুলোয় না এখন। হাঁটাচলাটাও করতে হয় খুব সাবধানে, শরীরের দুশো ছ’খানা হাড় যেন প্রতিবাদ করে ওঠে সময়ে সময়ে। বিছানা থেকে নামলেন বেশ কষ্ট করেই। শীতের এই ভোরবেলা বাথরুমে যাওয়াটা অত্যাচারের সমান, ডায়বেটিকস’টাও শরীরে বাসা বেঁধেছে অনেক বছর আগে, তাই প্রকৃতির ডাক অগ্রাহ্য করা যায় না এখন। দরজাটা ভেজানো ছিল, আচমকাই কোনকিছু পতনের আওয়াজ ভেসে এলো ভেতর থেকে।

বাথরুমের মেঝেতে মানুষটা পড়ে আছেন, চোখদুটো আধবোজা। বিরাশি বছরের দেহখানা আর কত ধকল নেবে? শরীরে একরত্তি শক্তি নেই। মেয়ে সোমা আর কাজের মহিলাটা তার অচেতন শরীরটাকে ধরে বের করে আনলেন, বিছানায় শুইয়ে দেয়া হলো তাকে। মোবাইলের স্ক্রীনে তখন ঝড়, জরুরী তলব করা হয়েছে পারিবারিক ডাক্তারকে। সুপ্রিয়া সেসব শুনতে পাচ্ছেন না, তিনি তখন যাত্রা করেছেন অন্য এক ভূবনের পানে, অনন্ত সে যাত্রা! দূরে কোথাও খানিকটা আলোর রেশ দেখা যায়, সেই আলোর ঝলকানির মাঝেই একটা পরিচিত মুখ আবছামতোন দেখতে পান সুপ্রিয়া। তার বুকের রক্ত ছলকে ওঠে! লোকটার সঙ্গে তার দেখা হবে অবশেষে! কত অভিমান জমে আছে তার মনে, কত না বলা কথা, তিনযুগের জমানো গল্পের ভাণ্ডার… সুপ্রিয়ার বুক থেকে একটা ভারী পাথর নেমে যায় যেন। পার্থিব এই পৃথিবীতে তখন হইচই পড়ে গেছে, ডাক্তার ছুটে এসেছেন, পালস দেখে হাতটা আলতো করে নামিয়ে রাখলেন তিনি, মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দিলেন, সব শেষ হয়ে গেছে!

উত্তম কুমার, নামটা শুনলেই আরেকটা নাম অটোমেটিক জিভের ডগায় এসে যায় না? সুচিত্রা সেন? খানিকটা হ্যাঁ, তবে পুরোপুরি নয়। টালিগঞ্জের রোমান্টিক সিনেমার সংজ্ঞাটাই পাল্টে দিয়েছিল এই জুটি। এখনও কলকাতার সিনেমার ইতিহাসে জুটির তালিকা করতে বসলে সবাই দুই নম্বর থেকে সিরিয়াল ধরে, সবাই জানে, এক নম্বরে অবিসংবাদিতভাবে মহানায়ক আর মহানায়িকার আসন। কিন্ত সে তো সেলুলয়েডের ফ্রেমে, বাস্তব জীবনে তো নয়। পর্দায় উত্তমের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন সুচিত্রা, কিন্ত লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের বাইরের দুনিয়ায় উত্তম কুমার সেই ভালোবাসার পুরোটাই তুলে রাখতেন আরেকটা মানুষের জন্যে। তার নাম সুপ্রিয়া চৌধুরী, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাকে সুপ্রিয়া দেবী নামে চেনে।

উত্তম কুমার, সুপ্রিয়া দেবী, বসু পরিবার, মেঘে ঢাকা তারা

অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় তখনও উত্তম কুমার নামে পরিচিতি পাননি সেভাবে। ফিল্ম নামের কল্পরাজ্যে আনকোরা এক তরুণ তিনি। সুপ্রিয়া দেবী তখন একুশের চপলমতি তরুণী। দুজনের দেখা ‘বসু পরিবারে’র সেটে। লাভ এট ফার্স্ট সাইট ব্যপারটা ঘটেনি, ওসব ফিল্মি কাজকারবার, গল্পেই হয়ে থাকে বোধহয়। এরপর উত্তম এগিয়ে গেছেন সমানে, সুপ্রিয়া চৌধুরীও নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন হুটহাট, তবে অনিয়মিত। ঋত্বিক ঘটক দেখেছেন, সুপ্রিয়া কত ভালো অভিনেত্রী। মেঘে ঢাকা তারা’র নীতা, কিংবা কোমল গান্ধারের আনস্যু- ওই সময়ের দর্শকেরা জানেন, অতি সাধারণ থেকেও সবটুকু আলো কিভাবে নিজের দিকে কেড়ে নিতেন সুপ্রিয়া। আধুনিক সময়ের দর্শকেরা যারা মীরা নায়ারের ‘দ্য নেমসেক’ দেখেছেন, তারা মনে করতে পারবেন সুপ্রিয়াকে। মেঘে ঢাকা তারায় তার মুখে ‘দাদা আমি বাঁচতে চাই!’ সংলাপটা শুনে চোখের কোণে অশ্রু জমেনি কোন পাষাণের বলতে পারেন?

আরও পড়ুন- মহানায়কের মহাকাব্য! 

শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে তিনি চন্দ্রমূখী, উত্তম কুমার সেখানে দেবদাস। অথচ জীবনের উপন্যাসে তিনি তো উত্তমের পার্বতীই হয়েছিলেন! তাতে লাভ কি হলো? উত্তমকে তো পাওয়া হলো না চিরতরে। নাহ, পেয়েছিলেন তো, হয়তো খানিকটা সময়, তবুও তো দুজনে হাতে হাত রেখে কাটিয়েছিলেন খানিকটা সময়। বালিগঞ্জ থেকে পার্ক সার্কাস কিংবা হাওড়া ব্রীজের এলোমেলো বাতাসের বুক চিরে চলতে থাকা সেডান কারে ড্রাইভিং সিটে বসা উত্তমের হাতটা তো রাখা ছিল তার কোলে। উত্তমের জন্যে তিনি স্বামী-সংসার ছেড়েছিলেন, তার জন্যে উত্তম ছেড়েছিলেন ঘর! শুনতে কি অদ্ভুত শোনায় না? মিডিয়ার মানুষজন সম্পর্কের দাম দিতে জানেনা বলে একটা কথা প্রচলিত আছে, এখানে সম্পর্ক নাকি গড়াই হয় ভাঙার জন্য, সেই মিডিয়ার সবচেয়ে আলোচিত তারকাদের দুজনে চারহাত এক করলেন ভালোবেসে, সবকিছু ছেড়ে এসে, অতীতকে ফেলে এসে!

উত্তম কুমার, সুপ্রিয়া দেবী, বসু পরিবার, মেঘে ঢাকা তারা

উনিশশো আশিতে উত্তম চলে গেলেন তাকে একা ফেলে রেখে। উত্তমের চলে যাওয়ায় ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি হলো অবশ্যই। তবে টালিগঞ্জে একজন সৌমিত্র ছিলেন, বিশ্বজিত ছিলেন, আগে পরে আরও তো তারকারা এসেছেন, সিনেমা হয়েছে, উত্তমের অনুপস্থিতিতে কোনকিছু থেমে থাকেনি। কিন্ত সুপ্রিয়া? সুপ্রিয়ার জীবনটা তো থেমে গিয়েছিল। ভেঙে পড়েছিলেন সুপ্রিয়া, ভীষণভাবে। যে লোকটা তাকে ভালোবাসা শিখিয়েছিল, স্বপ্ন দেখিয়েছিল, নিজের আত্মাটাকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার তাগিদে যার হাত ধরে বেরিয়ে পড়েছিলেন, সে মানুষটা হুট করে এভাবে গায়েব হয়ে গেল!

বাকীটা জীবন উত্তমের স্মৃতিকে সঙ্গী করেই পার করে দিয়েছেন সুপ্রিয়া। দুজনের প্রেম যখন দানা বাঁধছে, কাছের মানুষেরা এই জুটিকে ‘উত্তমপ্রিয়া’ নামে ডেকে ক্ষ্যাপাতেন। দর্শকদের জন্যে এসেছে চৌরঙ্গী-আলেয়া-সন্ন্যাসী রাজা কিংবা বাঘবন্দী খেলা- রঙিন পর্দায় দুজনের ফ্রেমেবন্দী মূহুর্তগুলো আরও বেশী রঙিন হয়ে আছে ভালোবাসার স্পর্শে। উত্তমপ্রিয়া’র উত্তম চলে গেছেন আটত্রিশ বছর আগে, গত ডিসেম্বরের এক শীতল ভোরে সুপ্রিয়াও চলে গেলেন, উত্তমের কাছে, যে জগতে গত সাঁইত্রিশটা বছর ধরে মহানায়ক অপেক্ষায় ছিলেন তার জীবনের নায়িকার জন্যে। 

আরও পড়ুন- তিনি ছিলেন, তিনি আছেন, তিনি থাকবেন!

তিনি নায়িকা ছিলেন, সিনেমার, জীবনেরও। তারচেয়ে বেশী ছিলেন একজন মা, প্রেমিকা, বন্ধু, কিংবা বোন। শর্মিলা ঠাকুর যেমন বেনুদী বলতে অজ্ঞান, তার অনেকগুলো গয়নাই নিজের পছন্দে ডিজাইন করে বানিয়ে দিয়েছিলেন সুপ্রিয়া। পেশাদারিত্ব বা কাজের বাইরে সময় বের করে উত্তমকে যত্ন করা, নিজে রান্না করে খাওয়ানো- সবকিছুই শর্মিলার নিজের চোখে দেখা। সমসাময়িক আরেক নায়িকা মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কাছে নায়িকা সুপ্রিয়ার চেয়ে মানুষ সুপ্রিয়া অনেক বেশী প্রিয়। হয়তো উত্তম-মাধবী সিনেমা করছেন, শুট চলছে, সুপ্রিয়া ঠিকই বাড়ি থেকে নিজের হাতে রান্না করে নিয়ে এসেছেন দুজনের জন্যে। তিনি থাকতে উত্তম বাইরের খাবার খাবে, এটা যে হতেই পারে না!

উত্তম কুমার, সুপ্রিয়া দেবী, বসু পরিবার, মেঘে ঢাকা তারা

বালিগঞ্জের ময়রা স্ট্রিটের বাড়ীটা বছরে বছরে কত রঙ দেখে ফেললো। বাইরের শুনশান রাস্তায় এখন সারাদিনমান গাড়ির ভীড়, মানুষের আনাগোনা; শান্ত নিরিবিলি এলাকাটা তিন দশকে কেমন জনারণ্যে পরিণত হয়ে গেল। বাড়ির খোলনলচেও পাল্টেছে টিকে থাকার তাগিদে, কিন্ত বদলাননি সেই বাড়ির একটা মানুষ। উত্তমের সুপ্রিয়া, কিংবা উত্তমপ্রিয়া। উত্তম কুমারের জন্যে ভালোবাসার অভাব হয়নি তার কখনও, উত্তম বেঁচে থাকার সময়ে তো না’ই, তিনি চলে যাবার পরেও না। প্রতিটা আড্ডায়, প্রতিটা সাক্ষাৎকারে ‘তোমাদের দাদা’ বলেই মানুষটার কথা স্মরণ করতেন সুপ্রিয়া, কোথাও না থাকা লোকটাকে ভালোবাসার অদৃশ্য শক্তিতে টেনে আনতে চাইতেন নিজের পাশে।

আরও পড়ুন- ‘অভিনয়ের খিদেটাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে’

সেটার আর দরকার হবে না কখনও। সুপ্রিয়া চলে গেছেন উত্তমের কাছে, চিরতরে। সেই জগতেও হয়তো আরেকটা হাওড়া ব্রীজ আছে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আছে, গড়ের মাঠও আছে হয়তোবা। তার পাশে একটা সেডান গাড়ি পার্ক করা থাকে হয়তো আজকাল। কালো সানগ্লাসে চোখ ঢাকা সুদর্শন এক মধ্যবয়স্ক যুবকের পাশে চল্লিশোর্ধ্ব এক শাড়ি পরিহিতা নারীকে হয়তো দেখা যাবে রোজ। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে দুজনে, বাতাসে উড়ছে সুপ্রিয়ার শাড়ির আঁচল, প্রিয়তমার অবাধ্য চুলগুলোকে উত্তম খুব যত্ন করে গুঁজে দিচ্ছেন ওর কানের পাশে- এমন দৃশ্যের সাক্ষী নিশ্চয়ই রোজই হচ্ছেন স্বর্গের বাসিন্দারা। এই দৃশ্যটা নিজের চোখে দেখার জন্যে হলেও তো স্বর্গে যেতে ইচ্ছে করে! এমন অপার্থিব ভালোবাসার সন্ধান তো এই ভূবনে মেলে না!

তথ্য ও ছবি কৃতজ্ঞতা- আনন্দবাজার পত্রিকা।

Comments
Spread the love