আমাদের সবার ফেসবুকে থমথমে শোক।

সেই শোকের সাথে সবার প্রশ্ন, কেন এমন হলো? কার দোষ ছিলো? এটা কি ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের সমস্যা, যান্ত্রিক গোলযোগ, পুরনো বিমানের সমস্যা, নাকি পাইলটের ভুল?

ফেসবুকের কল্যাণে ইতিমধ্যে সম্ভবত সবার কাছে পৌছে গিয়েছে কাঠমান্ডুর এটিসি টাওয়ারের সাথে পাইলটদের শেষ কথপোকথন। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েও ফেলেছেন, দোষ টাওয়ারের কন্ট্রোলারদেরই। অনেকে আবার দেখলাম পুরনো বিমান কেন এখনো চলছে, এটার জন্যই এতো দুর্ঘটনা– এই সিদ্ধান্তে অনড়। বিশাল বিশাল পোস্ট, হাজার হাজার হাইপোথিসিস, লক্ষ লক্ষ কনফিডেন্ট থিওরি।

অনেকেই ইনবক্সে জানতে চাচ্ছেন, কেন হল এই দুর্ঘটনা?

বিশাল এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে আমি খুবই ক্ষুদ্র একটা অবস্থানে চাকরি করি। এতোটাই ক্ষুদ্র যে, আমিও আপনাদের মতই শুধু অনুমান করতে পারি। আমার বয়স, জ্ঞান অথবা অভিজ্ঞতা এতোটা হয়নি যে আমি কোন মন্তব্য করতে সক্ষম হবো। কিন্তু যেটুকু হয়েছে তা থেকে আমি একটা জিনিস নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এতো তাড়াতাড়ি, পুরা ঘটনা না জেনে, ব্ল্যাকবক্সের ডাটা ভেরিফাই না করে, নিশ্চিতভাবে কারো ওপর দোষ চাপানো সম্পূর্ণ অনুচিত।

একটা বিমান দুর্ঘটনা ঘটে অনেকগুলো ভুলের সমষ্টিগত ফলাফল হিসেবে। কখনো এই ভুল পাইলটের হয়ে থাকে, কখনো টেকনিশিয়ানের হয়ে থাকে, কখনো কন্ট্রোলারের হয়ে থাকে, কখনো সুপারভাইজারের হয়ে থাকে আবার কখনো প্রতিষ্ঠানের হয়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় যে, সবারই কিছু না কিছু ভুলের ফলাফল হয়ে থাকে একটা বিমান দুর্ঘটনা। ফেসবুকে বসে, নিউজ পোর্টালের ‘সাংঘাতিকের’ মনগড়া টিআরপি বাড়ানো খবরে হয়তো খুব জলদি একটা সিদ্ধান্তে পৌছে যাওয়াই যায়, কিন্তু দুর্ঘটনার আসল কারণ উদঘাটন একটা সময়সাপেক্ষ এবং জটিল প্রক্রিয়া। এটা একদিনে সম্ভব নয়, সম্ভব হওয়া উচিতও নয়।

আমরা মোটামুটি সবাই ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে এয়ার ক্রাশ ইনভেস্টিগেশন অনুষ্ঠানটি দেখেছি। এ্যানিমেশন আর ইন্টারভিউতে ভরা এই অনুষ্ঠানের এক একটি এপিসোড এক একটি থ্রিলার গল্পের মত। এই অনুষ্ঠানগুলি দেখে আমাদেরও ধারণা হওয়া খুব স্বাভাবিক, আমরা অনেক বেশি বুঝি এসব বিষয়।

আসলে আমরা কিছুই বুঝি না।

এক একটি সফল ইনভেস্টিগেশনের পেছনে থাকে একদল মানুষ। প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে যারা বিশারদ। যারা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত খুজে বের করার চেষ্টা করেন, আসলে কি ঘটেছিল সেদিন, যার জন্য বিমানটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। তারা মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর এই তদন্ত চালাতে থাকেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সন্তোষজনক একটা সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারেন। কখনো কখনো তাও পারেন না। মালয়েশিয়ার এয়ারলাইন্সের কথাই ধরুন।

এবার আপনিই বলুন, আপনি এই সিদ্ধান্ত দেবার কে?

মানুষকে দোষারোপ করা সহজ, বোকারা সেটা করেও! কান নিয়ে গেছে চিলে শুনে কানের পেছনে দৌড়ানোও সহজ। কিন্তু, শুধুমাত্র লাইক, শেয়ার, কমেন্টের আশায় নিজের অল্পবুদ্ধিপ্রসূত ‘মতামত’ জাহির করে নিজেকে নির্বোধ বানানো, এবং অন্যকে নির্বোধ হতে উৎসাহিত করা– এই দুঃখের সময় দেখতে দেখতে ভীষণ বিরক্ত লাগছে।

দয়া করে নিজেকে ন্যাটজিওর এয়ার এ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেটর ভাবা বন্ধ করুন।

সাট দ্যা ফাক আপ!

Comments
Spread the love