মনের অন্দরমহল

ফ্রেশার’সদের জন্য কয়েকটি কথা

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন নতুনদের পদধ্বনি!

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফ্রেশার’দের হয় খুব ভয় দেখিয়ে বলা হয় এবার বুঝবা ঠেলা, নাহয় তাদের বলা হয় এখন তোমাদের হানিমুন পিরিওড, ইনজয় করো। কোনোটাই আসলে সত্য না। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে নিজেকে আবিষ্কার করার জায়গা, এখানে ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। হানিমুন পিরিওড বলেও আসলে কিছু নেই। ইনজয় করার সংজ্ঞা এটা না,সময়গুলো জাস্ট অপচয় করে যাওয়া। ফার্স্ট ইয়ার কোনো কিছু শুরু করার আসলে শ্রেষ্ঠ সময়।

প্রথম ক্লাসে শিক্ষকরা ইন্ট্রোডাকটরি ক্লাসে সাধারণত সবার পরিচিতি শুনেন। কার কলেজ কোনটা, কোন জেলায় বাড়ি, সাবেক রেজাল্ট এসব কিছু। তারপর কোনো কোনো শিক্ষক প্রথম ক্লাস থেকেই আধিপত্য দেখানোর জন্য নিজের বানানো কিছু নিয়মের ওয়াজ শুনান। ছাত্রছাত্রীরা প্রথম ক্লাসেই ভয় পেয়ে যায় ও আসন্ন বিপদের গন্ধ টের পেয়ে হতাশ হতে শুরু করে।

শিক্ষকরা তাদের এক্সপেকটেশন শুনান, কত ভালো ছাত্র হতে হবে, কত ভালো এটেন্ডেন্স থাকতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।কোনো কোনো টিচার কি পড়াবেন, কি এসাইনমেন্ট, রিপোর্ট, প্রেজেন্টেশন এসব নিয়ে দিকনির্দেশনা দেন।

এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যেই কিছুটা সমস্যা আছে। প্রথমত,এই শিক্ষা প্রক্রিয়ার আসলে উদ্দেশ্য কি সে ব্যাখ্যাটা কেউ দেন না। ফলে যা হয়, ছাত্রছাত্রীরা এসাইনমেন্ট নকল করে, প্রেজেন্টেশনের ভয় বয়ে বেড়ায়, শিক্ষকদের সাথে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয় প্রথম থেকেই।

তাছাড়া, এই পরিচিতি পর্ব দিয়ে কি আসলে একটা ক্লাসের এতোজনের নাম মনে রাখা সম্ভব? সম্ভব না।এই পরিচিতি পর্বের মাধ্যমে আসলে স্টুডেন্টদের মধ্যে একটা বর্ণবাদ ঢুকিয়ে দেয়া হয়। কে ঢাকার স্টুডেন্ট, কে গ্রামের, কে নটরডেম, কে ভিকারুন্নেসা, কে চট্টগ্রাম, কে বরিশাল সব বিভাজন প্রথম ক্লাসেই স্পষ্ট হয়ে যায়। এটার সুদূরপ্রসারী প্রভাবটা আপাতদৃষ্টিতে খুব দৃশ্যমাণ না কিন্তু অবচেতন মনে এসব ব্যাপার খুব ভালো প্রভাব ফেলে দেয়।

মানুষকে জানার শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে তার স্বপ্নকে জানা। প্রতিটা মানুষের আলাদা স্বপ্ন আছে। প্রথম ক্লাসে সবার স্বপ্ন জানতে চাওয়া উচিৎ। ক্যারিয়ারের চিন্তা মাথায় না ঢুকিয়ে তাদেরকে সাহস দিয়ে যদি স্যার, ম্যামরা বলেন, তোমার স্বপ্ন পূরণ করার এখনই সেরা সময়। প্ল্যান বানাও। আগামী পাঁচ বছর পর অন্যরা যখন শুধু একটা সার্টিফিকেট নিয়ে বের হবে, তখন তুমি নিজেকে কি শুধু একজন সার্টিফিকেটধারী হিসেবেই দেখতে চাও নাকি চাও তোমার স্বপ্নের কাজই হবে তোমার সার্টিফিকেট?

বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা নতুন তাদের সাথে কিছু ব্যাপার শেয়ার করতে ইচ্ছে করছে।

আমাদের দেশে মানুষের মধ্যে পরিচয়কেন্দ্রিক হীনমন্যতা খুব প্রবল। কারো সাথে কথা বলতে গেলে নিজের বলার মতো কিছু খুঁজে পাই না। তখনই আমরা বিভিন্ন পরিচয়সূত্র দিয়ে নিজেকে হনু মনু বোঝাতে চাই। বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ “তুই আমারে চিনোস” সিন্ড্রোমে ভুগে। ইনিয়ে বিনিয়ে সবাই বোঝানোর চেষ্টা করে, “আই এম দ্যা বেষ্ট”।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কেউ কেউ এই কাজটা করে। প্রায়ই অনলাইনে বিভিন্ন পাবলিক-প্রাইভেট তর্ক হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এতোজন বিসিএস ক্যাডার হয়েছে তো ঐ বিশ্ববিদ্যালয় কেনো বিশ্বসেরার কোনো তালিকায় নেই কত রকমের টপিকে খুচরা স্বস্তা ঝগড়া। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট কোনো ঘটনা দিয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঢালাও ভাবে আক্রমণ করা, কোনো মেডিক্যালের ভুল ত্রুটির জন্য সমগ্র মেডিক্যালের ছাত্রছাত্রীদের এক কাতারে নামিয়ে গালাগাল করা, ন্যাশনালের কেউ আইবিএ কিংবা বিসিএস এর কোনো গ্রুপে কিছু জানতে চাইলে হাসাহাসি করা এই কাজগুলো খুব প্রতিনিয়ত ঘটছে।

প্রথমবর্ষে কিছুটা আবেগ বেশি কাজ করে বলে অনেক ফ্রেশার’স এইসব তর্কযুদ্ধে নেমে পড়ে। নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রতি ভালবাসা থাকাটা খুবই চমৎকার একটি ব্যাপার, কিন্তু অন্য কাউকে আক্রমণ করে ছোট করা উচিৎ নয়। তুমি যখন কাউকে ছোট করবে সে যদি ছোটও হয়, তবুও তুমি তার কাছে হেরে গিয়েছো। কারণ, সে ছোট হলেও তোমার এবং তোমার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা যে তোমাকে বড় করতে পারেনি সেটা সে জেনে গিয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অনেক তর্ক করতে করতে একসময় তুমি ক্লান্ত হয়ে আবিষ্কার করবে তোমার নিজের কিছুই করা হলো না এতোদিনেও। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তোমার যে আবেগ এবং বিশ্বাস তাতে একসময় ভাটা পড়লেও পড়তে পারে। অস্বাভাবিক না। কিন্তু, যদি তুমি ভেবে থাকো সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয় তোমাকে সব দুয়ার খুলে দিবে, অনেক কিছু শিখাবে – সবসময় এমন নাও হতে পারে।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুব বেশি কিছু আশা করা উচিত না। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে সমুদ্র, যেখানে সাঁতার তোমার নিজেকেই কাটতে হবে, কতদূর সাঁতরে কত অচেনা পথ তুমি এক্সপ্লোর করবে, কত ঝড় মোকাবেলা করে তুমি টিকে থাকবে সেটি তোমার উপরই নির্ভর করে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুষ্ঠানগুলো দেখে থাকলে খেয়াল করবে এখানে অতিথি হয়ে আসে সাবেকরাই। কারণ, তারা নিজেদের অনুকরণীয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। একবার চিন্তা করে দেখো, তারাও তোমার মতো সাধারণ ছাত্র ছিলো, তোমার মতো ঘুরতো ফিরতো। এখন তারা তোমার সামনে এসে গল্প শুনাচ্ছে। এর কারণ কি জানো? তারা তাদের সমমনাদের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশায় বসে ছিলো না। তারা সবার এইম ইন লাইফ কপি পেস্ট করেনি, নিজের মতো করে যে পথ বেঁছে নিয়েছে সেখানে তারা সেরা হয়েছে। যা কিছুই করো সেটার বস হও। স্টিভ মার্টিনের একটা উক্তি আছে, Be soo good , they can’t ignore you. ম্যাচিউরড হওয়ার জন্য সিনিয়র হওয়ার অপেক্ষা লাভ হয় না, প্রথম বর্ষ থেকে ম্যাচিউরড চিন্তা ভাবনা করো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই শত শত সেলফি তুলে হুট হাঁট “উই আর ফ্যামিলি” ক্যাপশন দেয়া ফ্রেশার’সদের একটি প্রিয় অভ্যাস। বাস্তবতা হচ্ছে, ছবির মানুষগুলো পাল্টাতে খুব বেশি সময় নেয় না। প্রথম বর্ষের একটা ছয়জনের এসাইনমেন্টের গ্রুপ শেষ বর্ষে আসতে আসতে ছয় টুকরা হয়। যাদের অতিরিক্ত গ্রুপিং করার মনোভাব থাকে তারাই এসব জটিলতায় বেশি পড়ে। কেউ মানুক আর না মানুক, বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই তোমার বন্ধু না। এখানকার বন্ধুত্ব এক বিচিত্র বিষয়। গ্রুপিং মনোভাবটা যেনো জন্ম না নেয়। কেউ আসলে এতো খারাপ না, আমরা মানুষকে দূর থেকে জাজ করতে পছন্দ করি বলে একটা দূরত্ব সবসময় থেকে যায়। এই দূরত্বগুলো পরে গিয়ে আর কমানো যায় না।

শিক্ষকদের ব্যাপারেও তাই। আমরা শিক্ষকদের যত খুঁত বের করি, তাদের ক্লাস নিয়ে যত কথা বলি আসলে তারা কিন্তু ক্লাসের বাইরে খুবই অসাধারণ মানুষ। ক্লাসের কথা বাদ দিচ্ছি কারণ, একেকজন ক্লাসে একেক প্যাটার্ণে চলতে পছন্দ করেন। কিন্তু ব্যাক্তিগত ভাবে যদি তুমি তাদের সাথে কথা বলে দেখো, তাহলে তারা কখনো নিরাশ করবে না। তারা তোমাকে পথ দেখাবে যত কঠিন সমস্যাই হোক।

মানুষকে সম্মান দিতে শিখো। যে ছেলেটাকে মনে হচ্ছে গেরাইম্যা খ্যাত বিশ্বাস করো সে ছেলেটার মধ্যেও এমন গুণ আছে যা তুমি আবিষ্কার করতে পারলে লজ্জিত বোধ করবে। প্রত্যেকটা মানুষ আলাদারকমের প্রতিভাবান। আমরা নতুন কোথাও গেলে, নতুন কাউকে দেখলেই জাজমেন্ট করতে শুরু করি নিজের মতো। এই কাজটা যদি না করে মানুষের আসল সত্তাকে চিনতে পারো দেখবে প্রতিটা মানুষ কি অসাধারণ।

সিনিয়রদের সম্মান না দেও কিন্তু ছোট করো না। আমি দেখেছি, ইদানিং ফ্রেশার’স ওভারস্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে প্রথম দেখাতেই তুমি তুমি করে বলে ফেলে। আবার না জেনেই কোনো সিনিয়রকে ব্যাচম্যাট ভেবে ফেলে। কেউ যদি বয়সে ছোটও হয় তাকে আপনি করে বললে জাত চলে যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমি প্রথম বর্ষ মানে তোমার চেয়ে জুনিয়র এখানে কেউ নেই, তাই অপরিচিত কাউকে দেখলে তাকে তুমি করে বলাটা অশোভন। আর সিনিয়রদের সাথে সম্পর্ক রাখলে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কতটা আনন্দদায়ক হতে পারে সেটা টের পাবে তুমি যখন সিনিয়র হবে তখন। আমি এমন কোনো সিনিয়র দেখিনি যার কাছে কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে বা সাহায্য চাইলে মানা করেছে, সবসময় কোনো না কোনো উপায় বাতলে দিয়েছে তারা।

প্রথমবর্ষের অনেকেই একসাথে অনেকগুলো ক্লাবের ফর্ম তুলে, আবার কেউ কেউ কোনো ক্লাবের কাজকে একদমই কেয়ার করে না। ক্লাবের সাথে জড়িত থাকলে আসলে অনেক অভিজ্ঞতা হয়। একটা প্রতিষ্ঠান কিভাবে চলে, একটা ইভেন্ট কিভাবে প্ল্যানিং হয়, কিভাবে এক্সিকিউট হয়, মানুষের সাথে কিভাবে মিলে মিশে একটা টিমওয়ার্ক করতে হয় ইত্যাদি বিষয় এখান থেকে জানা যায়। স্যোসাল ওয়ার্ক করার সুযোগ সবার ভাগ্যে থাকে না। তবে, জ্যাক অব অল ট্রেড মাস্টার অব নান হয়ে আসলে লাভ নেই। যেই জায়গাগুলোতে তোমার আগ্রহ কাজ করে ওইরকম দুই তিনটা ক্লাবে যোগ দেয়া উচিৎ। অনেক ক্লাবের মেম্বারশীপ নিয়ে কোনোটাতেই সময় না দিতে পারা কোনো ভ্যালু এড করে না আসলে।

ডিপার্টমেন্টের মধ্যে যে ফুটবল ক্রিকেট খেলাগুলো হয় এগুলোতে না পারলেও অংশ নেয়া উচিৎ। এর মাধ্যমে সবার সাথে পরিচয় হয়। খেলা মানুষকে যেভাবে একত্রিত করে, যেভাবে ইমোশনালি এটাচ করে আর কোনো কিছু এভাবে একত্রিত করতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আনন্দদায়ক হয়ে যাবে খুব সহজেই যদি ডিপার্টমেন্টের মানুষদের সাথে খুব সহজেই মিশে যেতে পারো।

কিছু স্কিল শুধু বিশ্ববিদ্যালয় না সব জায়গাতেই কাজে লাগবে। দেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানা, শুদ্ধ ইংরেজিতে লিখার ক্ষমতা, আন্তজার্তিক পরিবর্তনগুলো কেনো হচ্ছে তা এনালাইসিস করার ক্ষমতা, সবার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস, ভালো স্লাইড বানানোর আইডিয়া, গুগল ব্যবহার করার টেকনিক জানা ইত্যাদি। এসব ছোটখাটো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মানুষ তা-ই তোমাকে সাজেশন দিবে যার বাইরে সে নিজে কল্পনা করতে পারে না। একশোজন মানুষের কাছে যদি তুমি জিজ্ঞেস করো ৯৫ জনই গৎবাধাঁ রাস্তা দেখাবে, সমস্যা দেখাবে। তাই স্বপ্নবাজ মানুষের সাথে মেশার চেষ্টা করো। মনে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার আগে অনেকে বলতো, অনেক কঠিন চান্স পাওয়া, এই সেই কত আলাপ। এরকম মানুষ সব জায়গাতেই আছে। এদের কথায় কান না দিয়ে নিজের মনের কথা শুনো। মন কখনো ভুল পথে নেয় না।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close