মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

তোমরা যারা ভর্তি কোচিং করতে ঢাকার বাইরে থেকে আসবে..

এইচএসসির পর ভর্তি কোচিং করতে ঢাকার বাইরে থেকে আসা ছেলেমেয়েরা প্রধান যে সমস্যাটার মুখোমুখি হয়, তা হচ্ছে অত্যধিক উত্তেজনা। এমন নয় যে তারা প্রথমবারই ঢাকায় আসছে। অনেকেই হয়ত ইতিপূর্বে বহুবার ঢাকায় এসেছে। এমনকি এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ কিংবা মাসের উপরও ঢাকায় থেকেছে। কিন্তু প্রথমবার ‘স্থায়ীভাবে’ ঢাকায় থাকতে শুরু করা, তাও আবার একদম ‘একা’, এই জিনিসটার ভাবই একদম আলাদা।

স্বীকার না করে উপায় নেই, ঢাকা শহরের এক দুর্নিবার আকর্ষন শক্তি আছে, সম্মোহনী শক্তি আছে। এবং সেসব শক্তির ফাঁদে পড়ে ১৮-১৯ বছরের ছেলেমেয়েদের ফোকাস নষ্ট হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

ভর্তি কোচিং এর এই তিন-চারমাস তাদের একমাত্র ফোকাস হওয়া উচিৎ ভালো করে পড়াশোনা করা, ভালো কোথাও চান্স পাওয়া। এবং প্রথম প্রথম কয়দিন বেশ উৎসাহ নিয়েই সবাই এটা করে।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় বিশ দিন বা এক মাস যাওয়ার পর। ‘ভালো জায়গায় চান্স পেতে ভালো করে পড়তে হবে’, এই উৎসাহটা হারিয়ে যেতে শুরু করে। আর তখন ফোকাস চলে যায় অন্যসব দিকের প্রতি।

আগেই বলেছি, ঢাকা শহরের আকর্ষনশক্তি অপরিসীম। তাই একটা পর্যায়ে এসে, ঢাকার বাইরে থেকে আসা অধিকাংশ ছেলেমেয়েকেই (সবাই নয়) দেখা যায় পড়াশোনার প্রতি আগ্রহটা কমে যাচ্ছে। তারচেয়ে বরং আজ বসুন্ধরা মল, কাল যমুনা ফিউচার পার্ক, সিনেপ্লেক্সে সবাই মিলে সিনেমা দেখা, বড় কোন রেস্তোরাঁয় গিয়ে ব্যুফে লাঞ্চ – এইসব ব্যাপারগুলোকেই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে।

হওয়াটাই স্বাভাবিক, কারণ বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই আগে এগুলোর স্বাদ পায়নি। কারণ জেলাশহরে তো আর এসবের উপায় ছিল না। এইসব নতুন ধরণের উত্তেজনা বা এডভেঞ্চারের হাতেখড়ি তো ভর্তি কোচিং করতে ঢাকায় আসার ওই সময়টাতেই।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, ভার্সিটি অ্যাডমিশন, কোচিং, ঢাকা

তার ওপর আবার প্রেম-ভালোবাসা ঘটিত ব্যাপারও আছে। স্কুল-কলেজ লাইফে হয়ত কো-এডুকেশন ছিল না। ভর্তি কোচিং করতে এসেই প্রথমবারের মত ছেলেমেয়ে একসাথে পড়া। তাই এ কারণেও ফোকাস নষ্ট হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর হলো নতুন পাওয়া বন্ধুত্ব বা সঙ্গ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছেলেমেয়েদের সাথে প্রথমবারের মত ইন্টারাকশান। তাই এসময়ে নিজেকে তাদের সামনে জাহির করাটাও তো খুবই জরুরি! কোন এক ‘বন্ধু’ কোচিং এর সামনে দাঁড়িয়ে আপনাকে বলল, ‘চল দোস্ত, আজ ক্লাস বাংক করি’, তাকে কি আর ‘না’ করা যায়? তাতে তার সামনে আপনার রেপুটেশন খারাপ হয়ে যাবে না? সে মনে করবে না যে আপনি ‘ফার্মের মুরগি’, পড়ালেখা ছাড়া আপনার আর কোন কাজ নেই? তাই ‘বন্ধু’র সামনে ‘সম্মান রক্ষা করতে’ আপনাকে বাধ্য হয়েই ক্লাস ফাঁকি দিতে হবে।

টাকাপয়সার কথাও ভুলে গেলে চলবে না। এতদিন বাবা-মায়ের সাথে থেকেছে যারা, তাদের সামনে এটাই প্রথম সুযোগ নিজ হাতে ইচ্ছামত টাকাপয়সা ওড়ানোর। এই সুযোগ কি কেউ ছাড়ে? তাই ‘ধুর, কি আছে জীবনে। টাকাপয়সা খরচ করব যত খুশি’, এরকম একটা মানসিকতাও চলে আসে। ফোন করে আব্বাকে টাকার কথা বললেই তো আব্বা টাকা পাঠিয়ে দেবে। সে তো আর দেখতে আসছে না এই টাকা আমি আসলেই বই কিনতে খরচ করছি নাকি বসুন্ধরা মলে গিয়ে ‘বন্ধু’দের সাথে ওড়াচ্ছি!

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, ভার্সিটি অ্যাডমিশন, কোচিং, ঢাকা

সুতরাং ভর্তি কোচিং এর এই কয়টা মাসের লড়াই শুধু ভালো করে পড়ালেখাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, নিজের সাথে নিজের লড়াইটাও বেশ ভালোভাবেই চলে। প্রথমবার ঢাকায় আসা ও তৎসংস্লিষ্ট অন্যান্য মোহ কাটিয়ে ওঠা যে ঠিক কতটা কঠিন, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এইসময় সবাই আপনাকে উপদেশ দেবে, ‘ফোকাস হারিও না, ফোকাস ঠিক রাখো’ – কিন্তু এই ফোকাস ঠিক রাখা যে কিরকম দুঃসাধ্য, যে এগুলো ফেস করে শুধু সে-ই জানে।

স্বভাবতই, শেষ পর্যন্ত ফোকাস ঠিক রাখার যুদ্ধে বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই হেরে যায়। নিজের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে পারে খুব সামান্য কয়জনই। আর পাবলিক ভার্সিটি বা মেডিকেলে সিটও ওই সামান্য কয়জনের জন্যই আছে। বাকিদের হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে, আর নয়ত যাদের বাবার সামর্থ্য আছে তারা প্রাইভেটে ভার্সিটিতে ভর্তি হবে। দিনশেষে এটাই সত্যি।

(আমার এই লেখায় কেউ অফেন্ডেড হলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত। যারা ন্যাশনাল বা প্রাইভেটে পড়ছেন, তাদেরকে ছোট করা কখনোই আমার উদ্দেশ্য না। আমি এই লেখার মাধ্যমে শুধু চেষ্টা করলাম যারা ভর্তি কোচিং করতে ঢাকায় আসছেন তাদেরকে আগে থেকে একটু সাবধান/সচেতন করার।)

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close