অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

ইশ, এমন উদ্যোগ যদি বাংলাদেশেও কেউ নিতো!

অ্যাম্বুলেন্স নয়, অ্যাম্বুসাইকেল!

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা এক ধর্মঘটে আমরা এক নির্মম ঘটনা দেখলাম। ধর্মঘটের বাধায় এম্বুলেন্স আটকে থাকে রাস্তায়। সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় এম্বুলেন্সে থাকা শিশুটি মারা যায়। এটাকে মারা যাওয়া না বলে হত্যাকাণ্ড বলাই সমীচীন। এবং প্রত্যাশিতভাবেই, সেই ঘটনায় কারো বিচার হয়নি।

বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে এমন অনাকাঙখিত ঘটনা খুবই দুঃখজনক। প্রায়ই বিভিন্ন সংগঠনের এই সমাবেশ, সেই মিছিল- এসবের জন্য দীর্ঘসময় রাস্তাঘাটে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যহত হয়। ভিআইপিদের জন্য গোটা নগরী হয়ে পড়ে স্থবির, অবরুদ্ধ। অবশ্য স্বাভাবিক যান চলাচল অব্যাহত থাকলেও তাতেও খুব একটা স্বস্তি নেই। বিশেষত শহরগুলোতে রাস্তায় সারাদিনই যানজট লেগেই থাকে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ নাগরিকের কতগুলো কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে তা তো বলাই বাহুল্য, তারচেয়েও বড় দুশ্চিন্তার বিষয় যানজটের কারণে জরুরি সেবাগুলো জরুরি মুহুর্তে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মুমূর্ষু রোগীবাহী এম্বুলেন্সকেও যখন যানজটের বিড়ম্বনায় আটকে থাকতে হয়, সময়মতো হাসপাতালে না নিতে পারার ব্যর্থতায় রোগী আরো সংকটাপন্ন হয় তখন এর চেয়ে শোকের বিষয় আর কি থাকতে পারে! সময়ের মূল্য যেমন তেমন, জীবনের মূল্যটাও ঠিকঠাক দিতে পারি না আমরা।

শাজাহান খান, অবরোধ, অ্যাম্বুলেন্স, মৃত্যু

এখানে কাউকে দোষারোপ করেও লাভ নেই। শহরকেন্দ্রিক জীবন আমাদের, প্রতিদিনই শহরে মানুষ বাড়ছে৷ রাস্তা বাড়ছে কই। বরং পতিত জমি কমে শহর আরো ঘিঞ্জি হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে চাইলেও হুট করেও উত্তরণ সম্ভব নয়। যে অপরিকল্পনা লক্ষ্য করা যায় এই নগরকে ঘিরে, যে পরিমাণ অপরিকল্পিত নগরায়ন ঘটে গেছে সেটা নিয়ে শুধু কথা বলে কথা খরচ করে ফায়দা নেই। কিন্তু, এই সমস্যার মধ্যেও আমাদের কিছু কিছু ব্যাপারে বিকল্প বুদ্ধি থাকা দরকার, বিকল্প সেবা থাকা দরকার। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার মতো জরুরি একটি বিষয়ে আমাদের একটা ইমার্জেন্সি কোনো সার্ভিস সময়ের দাবি আসলে। রাস্তাঘাটে রোগীর এম্বুলেন্সকে সময়মতো হাসপাতালে নির্বিঘ্নে পৌঁছাতে কি করা যায়, এই প্রশ্নের একটা স্পষ্ট উত্তর যদি থাকে, অন্তত আমরা বলতে পারব রোগীকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা আমরা করতে পেরেছি। কিন্তু কি উপায়ে করা যাবে সেটা?

খুব সাধারণ উদ্যোগেও যে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান হয় সেটাই দেখিয়েছে ‘ইউনাইটেড হাটজালাহ’। রাস্তাঘাটে যানজট থাকবেই৷ অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা যেকোনো সময় তৈরি হতেই পারে। তাই বলে রোগী অকালে হার মানবে কেন? তারা দেখিয়েছে, রাস্তা বদলানো হয়ত সম্ভব নয়, যানজট কমানো হয়ত সম্ভব নয় কিন্তু যদি এম্বুলেন্সের ধরণটাই বদলে দেয়া যায় কেমন হয়? ইউনাইটেড হাটজালাহ নামক সংগঠনটি এম্বুলেন্সের নতুন একটি ধারণা দেখিয়েছে, ইতিমধ্যে এই সেবার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে প্রাণে বাঁচিয়েছে তারা।

কেমন সেই সেবার ধারা? ইউনাইটেড হাটজালাহ মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যারা বিনামূল্যে জরুরি মেডিক্যাল সার্ভিস দিয়ে থাকে, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এই সংগঠনটির উদ্যোক্তার নাম এলি বিয়ার। তিনি লক্ষ্য করেছেন, গতানুগতিক এম্বুলেন্স সার্ভিস সেবা যতটা দ্রুত হলে রোগীর পক্ষে ভাল, ততটা নয়। কেউ দূরবর্তী কোনো অঞ্চলে অসুস্থ হলে, তার কাছে এম্বুলেন্স পৌঁছাতেই অনেক সময় লাগবে। তারপর রোগীকে হাসপাতালে নিতে পথে পথে আরো কত বাধা, যানজট। এভাবে খুব দেরি হয়ে যায় কখনো কখনো, অনেকেই মারা যায় শুধু সময়মতো হাসপাতালে না নেয়ার কারণে।

এলি বিয়ার চিন্তা করলেন, কেন এমন হয়? তার ধারণা এম্বুলেন্সের যে সাইজ এটাই মূল সমস্যা। এই সাইজের একটা এম্বুলেন্স রাস্তায় জ্যামে পড়লেও শর্টকাটে বের হতে পারে না যদি না কেউ দয়া করে সাইড দেয়। তিনি ঠিক করলেন এম্বুলেন্সের সাইজই ছোট করে ফেলবেন। তাই, মোটরসাইকেলকেই তিনি বানালেন জরুরি এম্বুলেন্স সার্ভিস। যাকে তিনি বলেন, “অ্যাম্বুসাইকেল”!

এই কাজের জন্য এলি বিয়ার ভলান্টিয়ার রিক্রুট করেন। ভলান্টিয়ার যে কেউই হতে পারে, সাধারণ ছাত্র থেকে স্কুল, কলজের শিক্ষক, যে কেউ। যারা অন্যের জীবন বাঁচাতে চায় তারা সাদরেই এই কাজে যোগ দেয়। এই মানুষগুলোকে তারপর ট্রেইনিং দেয়া হয় প্রায় এক মাসব্যাপী। তারপর তাদেরকে মেডিক্যাল সাপ্লাইসহ এম্বুসাইকেল দেয়া হয়। তারা তখনই নিজেদের ট্রেইনিং আর এম্বুসাইকেল কাজে লাগায় যখন তাদের নিকটস্থ কোনো জায়গায় ইমার্জেন্সি সার্ভিসের দরকার হয়।

ইউনাইটেড হাটজালাহ’র বিশাল কল সেন্টার আছে। সেখানে কল দেয়ার তিন সেকেন্ডের মধ্যে কেউ না কেউ জরুরি ফোনটা ধরে এবং তিন মিনিটের মধ্যে নিকটস্থ ভলান্টিয়ার ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। এতটাই দ্রুতগতির সেবা দেয় এলি বিয়ারের ‘ইউনাইটেড হাটজালাহ’! ভলান্টিয়াররা ঘটনাস্থলে পৌঁছেই তাদের কাছে থাকা মেডিক্যাল সাপ্লাই থেকে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়৷ রোগীকে প্রাথমিক ট্রমা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করে। প্রয়োজনে বাইকে করেই হাসপাতালে নিয়ে যায়, নাহলে নিজেরা প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করে বড় এম্বুলেন্সকে খবর দেয়। এভাবেই তারা জীবন বাঁচানোর মহান ব্রত পালন করে যাচ্ছে!

বর্তমানে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির স্বাস্থ্যসেবা, যেটা কিনা আবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে! এই সংগঠন চলছে অবস্থাসম্পন্নদের ডোনেশনের অর্থে। বর্তমানে ৫০০০ রেজিস্টার্ড ভলান্টিয়ার কাজ করছে ইউনাইটেড হাটজালাহর হয়ে। সংগঠনটি ইসরায়েলভিত্তিক, কিন্তু এখানে কোনো ধর্ম নিয়ে ইস্যু নেই, রাজনীতি নেই, বিদ্বেষ নেই। এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে একজন ইহুদি ভলান্টিয়ার এক ফোন কলে ছুটে যাচ্ছে অপরিচিত কোনো মুসলিমকে বাঁচাতে, একজন মুসলিম ছুটে যাচ্ছে কোনো খ্রিস্টানকে বাঁচাতে। সত্যিকারের মানবধর্ম এই সংগঠনটি পালন করছে আসলে। ইসরায়েলে এমন একটি সংগঠন এরকম মহৎপ্রাণ একটা উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে ভেবে খানিকটা অবাকই লাগছে, যে ইসরায়েল প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অনেক যুদ্ধের উসকানিদাতা, সেই দেশেও কেউ কেউ আছে যারা যুদ্ধ না, মৃত্যু না, জীবনকেই সবচেয়ে বেশি মর্যাদা দেয়।

ইউনাইটেড হাটজালাহ, নাস ডেইলি

সংগঠনটিকে প্রশংসা করে এবং উৎসাহ দিতে সম্প্রতি নাস ডেইলি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মিডিয়াও এই সংগঠনের কাজকে এপ্রিশিয়েট করেছে। তবে এই এই সংগঠনের কার্যক্রম দেখে মনে হলো, আমাদের দেশে আসলে এই ধরণের উদ্যোগ খুব বেশি জরুরি, সেটা অনেক কার্যকরীও হবে, উপকৃত হবে অনেক প্রাণ। রাস্তায় কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়ার যন্ত্রণা, চেষ্টা করেও নিজের কাছের মানুষটাকে বাঁচাতে না পারার যন্ত্রণা তারাই ভাল জানে, যার হারিয়েছে কেউ।

বাংলাদেশে বাইককেন্দ্রিক অনেকগুলো স্টার্টআপ দাঁড়িয়ে গেছে, চাইলে বাইক কাজে লাগিয়ে মানুষকে এই নিঃস্বার্থ সেবা দেয়ার উদ্যোগটুকু কেউ নিতে পারেন। তরুণদের সাহায্য পাবেন নিঃসন্দেহে। সবচেয়ে বেশি পাবেন মানুষের ভালবাসা। ঢাকার মতো একটা শহরে, যেখানে যানজটের এই তীব্র রুপ, যেখানে “ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা যায়” টাইপ অবস্থা, সেই শহরে এমন একটা উদ্যোগ বড্ড বেশি জরুরি, খুব বেশিই দরকার।

*

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles