মাঝে মাঝে কিছু ঘটনা ঘটে যেগুলো ঘটার সম্ভাবনা এতটাই কম আর অসম্ভব মনে হয় যে আমরা সেগুলোর নাম দেই কাকতালীয় ঘটনা। ইতিহাসের এমন কিছু অবিশ্বাস্য অদ্ভুতুড়ে কাকতালীয় ঘটনা নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন-

১. দুর্ভাগা কাকে বলে

মেজর সামারফোর্ডকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগা মানুষ। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করছিলেন। হঠাৎ আকাশ থেকে বজ্রপাত হয় এবং তিনি ঘোড়ার উপর থেকে ছিটকে পড়ে যান এবং উনার কোমর থেকে নিচের অংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেন এবং সেনা বাহিনী থেকে অবসর নিয়ে ভ্যাংকুবার চলে আসেন স্বাস্থ্য উদ্ধার করতে। সেখানে। ১৯৪৪ সালের কোন এক দিন তিনি লেকের পাড়ে গাছের নিচে বসে মাছ ধরছিলেন, এমন সময় আবার বজ্রপাত হয়, তিনি যে গাছের নিচে বসে ছিলেন সেটার উপর। এবার সামারফোর্ড সাহেবের ডান পাশের পুরোটাই অবশ হয়ে যায়!

 

যাই হোক, ছয় বছর পর তিনি আবারো সেরে উঠেন। একদিন তিনি পার্কে হাঁটতে বের হলেন। ঠিক তখনই আবার- হ্যাঁ, আবারো উনার উপর আকাশ থেকে আচমকা বিদ্যুৎ আক্রমণ! এবার আর উনি রক্ষা পেলেন না- দুই বছর প্যারালাইজড হয়ে পড়ে থাকার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ঘটনা এতটুকুতে শেষ হলেই যথেষ্ট কাকতালীয় হত। কিন্তু বজ্রপাত যার নিয়ন্ত্রণে, তার রাগ সম্ভবত তখনও শেষ হয়নি বেচারা সামারফোর্ডের উপর। মৃত্যুর চার বছর পর তাকে যে সেমিটারিতে কবর দেওয়া হয় তাতে আবারো বজ্রপাত হয় এবং তাঁর কবরের ফলক ভেংগে টুকরো হয়ে যায়!

২. কপালের লিখন

১৮৯৩ সালে, হেনরি জিগল্যান্ড নামে এক লোক তার প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদ করে। সেই কষ্ট মেনে নিতে না পেরে মেয়েটা আত্মহত্যা করে বসে। আর সেই খবর পেয়ে মেয়েটার ভাই জিগল্যান্ডকে খুঁজতে শুরু করে প্রতিশোধ নেবার জন্য। জিগল্যান্ডকে পাওয়ার পর মেয়েটার ভাই তার মুখে গুলি করে এবং জিগল্যান্ড মারা গিয়েছে ভেবে নিজেও আত্মহত্যা করে। কিন্তু জিগল্যান্ড মরে নি। গুলি তার মুখ ছুঁয়ে পিছনের এক গাছে গিয়ে লাগে। সে যাত্রা প্রানে বেঁচে যায় জিগল্যান্ড। এর ঠিক বিশ বছর পর সেই গাছটাই কোন কারণে কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় জিগল্যান্ড। কুঠার দিয়ে খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে জিগল্যান্ড সিদ্ধান্ত নেয় ডায়নামাইট দিয়ে গাছটা উড়িয়ে দিবে! গাছটা ঠিকই ডায়নামাইটের বিস্ফোরণে উৎপাটিত হলো, কিন্তু একই সাথে ২০ বছর ধরে গাছের ভিতর অপেক্ষা করতে থাকা গুলিটা বিস্ফোরণের ধাক্কায় গিয়ে লাগলো জিগল্যান্ডের মাথায় এবং সে সেই গুলির আঘাতেই মারা গেলো!

৩. জীবন-মৃত্যুর কারবারি

সিভিল ওয়ার চলার সময় আব্রাহাম লিংকনের ছেলে, রবার্ট লিংকন হার্ভার্ড থেকে ছুটিতে ট্রেনে করে ফিরছিলো। যাত্রা পথে বিরতিতে রবার্ট ট্রেন থেকে নেমে ট্রেনের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, হঠাৎ প্লাটফর্মে মানুষের হুড়োহুড়িতে এবং ট্রেইন নড়ে উঠায় সে প্লাটফর্ম এবং ট্রেইনের মাঝের জায়গায় পড়ে যেতে থাকে যেটা তার মৃত্যু ঘটাতে পারতো! কিন্তু ভিড়ের মধ্যেই কেউ একজন তার কলার ধরে তাঁর জীবন বাঁচায়। রবার্ট সাথে সাথে ঐ লোককে চিনতে পারে- সেই সময়ের বিখ্যাত একজন অভিনেতা- এডউইন বুথ! যদিও তার কোন ধারণাই ছিলো না সে কার জীবন বাঁচিয়েছে। কয়েক মাস পর সে একটা চিঠি পায়- প্রেসিডেন্টের ছেলেকে বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে। সেই চিঠির মাধ্যমে সে বুঝতে পারে সে কাকে বাঁচিয়েছে। এর কিছুদিন পর, এডউইনের আপন ভাই, জন উইকস বুথ পিছন থেকে মাথায় গুলি করে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে হত্যা করে!

৪. ধূমকেতু যাত্রী

বিখ্যাত মার্কিন সাহিত্যিক মার্ক টোয়াইনের জন্ম ১৮৩৫ সালের ৩০ নভেম্বর, ঠিক যে বছর হ্যালির ধূমকেতু পৃথিবীর আকাশে দেখা দিয়েছিলো। বিখ্যাত এই ধূমকেতুটি ৭৫ বছর পরপর পৃথিবীর কাছে ফিরে আসে। ১৯০৯ সালে, হ্যালির ধূমকেতু মার্ক টোয়াইনের জন্মের পর ফিরে আসার ঠিক এক বছর আগে টোয়াইন এক অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণী করেন- “আমি ১৮৩৫ সালে হ্যালির ধূমকেতুর সাথে এসেছিলাম। এটি আগামী বছর ফিরে আসছে এবং আমি আশা করছি আমি এটার সাথেই চলে যাবো। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অতৃপ্তির ব্যাপার ঘটবে যদি আমি এটার সাথে না যাই!” ১৯১০ সালের ১০ই এপ্রিল, পৃথিবীর উত্তর আকাশে হ্যালির ধূমকেত দেখা দেওয়ার ঠিক পরদিন এই মহান কথা সাহিত্যিক হার্ট এটাকে মৃত্যু বরণ করেন- তার ইচ্ছা পূরণ হয়!

৫. প্রথম এবং শেষ সৈন্য

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ বৃটিশ সৈন্য মারা গিয়েছিলো। তবে যাকে দিয়ে এই মৃত্যুর মিছিল শুরু হয় তাঁর নাম জন পার, ১৯১৪ সালের ২১শে আগস্ট তিনি নিহত হন। বেলজিয়ামের এক সেমিটারিতে তাকে দাফন করা হয়। তারপর কেটে যায় চার বছর, লক্ষ লক্ষ মানুষের হতাহত হবার পর, ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর, যুদ্ধ থামার ঘোষণা দেবার কয়েক ঘন্টা আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ বৃটিশ সৈন্য হিসেবে নিহত হয় জর্জ এলিসন। খুবই কাকতালীয়ভাবে, তারও কবর হয় বেলজিয়ামের সেই গোরস্থানে, জন পারের কবরের কয়েক গজ সামনে, মুখোমুখিভাবে!

৬. স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন

১৮৩৮ সালে বিখ্যাত রহস্য গল্প লেখক এডগার এলান পো এর একমাত্র উপন্যাস “দা ন্যারেটিভ অফ আর্থার গর্ডন পিম অফ নানটাকেট” প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের কাহিনীতে দেখা যায়, ঝড়ের কবলে পড়া এক জাহাজের বেঁচে যাওয়া ৪জন নাবিক ক্ষুধার যন্ত্রণায় নিজেদের বাঁচাতে তাদের ভেতর থেকে রিচার্ড পার্কার নামের একজনকে ছুরির আঘাতে হত্যা করে ও তার শরীর ভক্ষণ করে। এই উপন্যাসের তখন খুব সমালোচনা হয় অবাস্তব হিসেবে। ৪৬ বছর পর, মিনিওনেট নামক এক সত্যিকারের ইয়ট ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ঝড়ের কবলে পড়ে সেইটা ডুবে যায়, চারজন ক্রু একটা লাইফ বোটে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে যায়। খাদ্যাভাবে যখন তারা বুঝে মৃত্যু আসন্ন তখন বাকি তিন বয়স্ক নাবিক মিলে কম বয়সী কেবিন বয়কে মেরে ফেলে এবং তাকে খেয়ে ফেলে। সেই কেবিন বয়ের নাম? রিচার্ড পার্কার!

এরকম আরও অদ্ভুত সব কাকতালীয় ঘটনা নিয়ে সামনে আবার হাজির হবো। এগিয়ে চলো সাথেই থাকুন!

Comments
Spread the love