পাঠক, শুরুতেই বলে রাখি, এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল এনটিটি বা ভিনগ্রহী আছে কি নেই তা নিয়ে চাইলে আমি সারাদিন তর্ক করতে পারবো। বিগত চার/সাড়ে চার বছরের অভিজ্ঞতা অনুসারে যেটা জেনেছি, যতটুকু রিসার্চ করেছি, যতটুকু বিশ্বাস করি সেগুলো নিয়েও চাইলে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করা সম্ভব। বিশ্বাস, অবিশ্বাস সম্পূর্ণ নিজের কাছে। আমি কেবল আজ জানাতে চাই বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় রহস্য, যা মহাকাশ নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনা অনেকখানিই বদলে দিয়েছিলো। বাকিটা পাঠকের ইচ্ছে বিশ্বাস করবেন কি না।

১৩ জুন মধ্যরাত, ১৯৪৭। ইউনাইটেড স্টেটস এর নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের ছোট শহর রজয়েলের দক্ষিণ পশ্চিমে মরুভূমি ঘেঁষে গড়ে ওঠা কোন একটি কৃষি খামার। নাম ফস্টার র‍্যাঞ্চ। খারাপ আবহাওয়া, তার উপর গ্রীষ্মের মাঝামাঝি হওয়ায় মাঝে মাঝেই ধুলা, বৃষ্টি ঝড়ের কবলে পড়তে হয় এই এলাকার মানুষগুলোকে। সেরকমই ঝড় হচ্ছিলো সন্ধ্যার পার থেকে। আর র‍্যাঞ্চ মালিক উইলিয়াম ম্যাক ব্রাজেল মাঝরাতে ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ তীব্র শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো তার। যেন কিছু একটার বিস্ফোরণ ঘটেছে বাইরে। লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসলেন ব্রাজেল। তার এক ছেলে এবং ছোট মেয়েটারও ঘুম ভেঙ্গে গেছে। বাইরে তখনও ঝড় হচ্ছে। রাতে আর বের না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন ব্রাজেল।

১৪ জুন সকাল। র‍্যাঞ্চ থেকে বাইরে বের হলেন ব্রাজেল। পশ্চিমে তাকিয়ে তার চোখ ছানাবড়া! র‍্যাঞ্চের সীমানার ভেতরে এবং বাইরে মরুভূমির অন্তত ৩০ মাইল অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে একটি এয়ারক্রাফট এর ধ্বংসাবশেষ। শুরুতে দেখে প্লেন মনে হলেও পরবর্তীতে ব্রেজেল বুঝতে পারলেন এটা আসলে প্লেন নয়। অন্য কিছু একটা আছড়ে পড়েছে মরুভূমির মাটিতে।

অফিশিয়াল রিপোর্ট এবং নিউজপেপারে টাইমলাইন নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। অনেকে বলেন ইউএফও ক্র্যাশ করেছিলো ১৪ জুন ঠিকই, তবে ব্রাজেল তা কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন অন্তত ২/৩ সপ্তাহ পর। আবার অনেকে বলেন ব্রাজেল এর দেরীতে বলার কারণ হচ্ছে তিনি আসলে বোঝার চেষ্টা করছিলেন যে এটা কি ধরণের এয়ারক্রাফট এবং এয়ারক্রাফটে থাকা মানুষগুলো কোথায় গেলো! যেহেতু ৫০ এর শতক তখন আসলে পশ্চিমা অঙ্গরাজ্যগুলো তে এত বেশি মানুষ ছিলো না। খুবই ছোট ছোট শহরে অল্প কিছু মানুষ বসবাস করতেন তাও একে অন্যের থেকে দূরে। যার কারণে খুব বেশি মানুষ ঘটনাটি জানতে পারেন নি।

যাই হোক, অফিশিয়াল রিপোর্টস বলে, জুলাই এর ৪ তারিখ ব্রাজেল মূল ক্র্যাশ সাইট খুঁজে পান তার র‍্যাঞ্চ থেকে ২৫ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে। জুলাই এর ৭ তারিখ তিনি ছোট কিছু ধ্বংসাবশেষ নিয়ে রজওয়েল পুলিশ ডিপার্টমেন্ট শেরিফ জর্জ উইলকক্স এর সাথে যোগাযোগ করেন। উল্লেখ্য, রজওয়েলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত একটি ছোট মিলিটারী এয়ারবেস ছিলো। এই এয়ারবেইস থেকেই আকাশে উড়েছিলো বিখ্যাত ৫০৯ বমবার্ডমেন্ড স্কোয়াড, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে জাপানের হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে এটম বোমা ফেলেছিলো। তবে রজওয়েলের ঘটনার সময় সেখানে ইউএস এয়ারফোর্স এর কর্ণেল বুচ ব্ল্যানচার্ড দায়িত্ব পালন করছিলেন।

শেরিফ উইলকক্স বুচ ব্ল্যানচার্ডের সাথে ক্র্যাশটির ব্যাপারে সংবাদ দিতে যোগাযোগ করেন। ব্ল্যানচার্ড পরবর্তীতে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জেনারেল রজার রেমি কে ব্যাপারটি অবহিত করেন এবং এয়ারবেইস এর ইন্টেলিজেন্স অফিসার মেজর জেসি মার্সেলকে ঘটনাটির তদন্ত দায়িত্ব দেন। মেজর মার্সেলো ক্র্যাশ সাইট ঘুরে এসে সেদিনই তার তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করেন।

জুলাই এর ৮ তারিখ সকালে ব্ল্যানচার্ড এয়ারবেইস এর লেফটেন্যান্ট ওয়ালটার হল্টকে নির্দেশ দেন একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার যেখানে ব্ল্যানচার্ড পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করতে বলেন যে রজওয়েল এয়ারবেইস একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত চাকতি বা ডিস্ক শেইপড এয়ারক্রাফট খুঁজে পেয়েছে, এবং সেইসাথে এয়ারক্রাফটের ধরণ সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকায় ব্ল্যানচার্ড এটিকে Unidentified Flying Object বা UFO বলে উল্লেখ করতে নির্দেশ দেন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাওয়ার সাথে সাথেই রজওয়েল এর লোকাল নিউজপেপার রজওয়েল ডেইলি রেকর্ড তাদের পত্রিকার প্রথম পাতায় বিশাল করে রজওয়েলে ফ্লাইং সসার পাওয়ার নিউজ ছাপেন।

সবাই যখন বিষ্ময়ে হতবাক, একই দিন সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই নিজেদের বিজ্ঞপ্তি পরিবর্তন করে ফেলে এয়ারফোর্স। জেনারেল রজার রেমি সবাইকে নির্দেশ দেন যাতে ক্র্যাশ সাইটের সকল ধ্বংসাবশেষ যত দ্রুত সম্ভব তার কাছে নিয়ে আসা হয় কারণ তিনি নিজে সেগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে চান।

পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর, জেনারেল রজার রেমি আগের প্রেস রিলিজটি বাতিল করে নতুন করে প্রেস রিলিজ ইস্যু করেন যেখানে বলা হয় ধ্বংসাবশেষটি আসলে একটি ওয়েদার বেলুনের ধ্বংসাবশেষ যেটি ঝড়ে দিক হারিয়ে মরুভূমিতে ক্র্যাশ করেছে। সেই সাথে র‍্যাঞ্চার ব্রাজেলকে এয়ারফোর্সে ডেকে নেয়া হয়। পরবর্তীতে র‍্যাঞ্চার প্রেস এর কাছে জানান যে তিনি আসলে কিছু টিন ফয়েল, শক্ত এক ধরণের পাতলা এলুমিনিয়ামের লাঠি ছাড়া তিনি তেমন কিছু খুঁজে পাননি।

পত্রিকাতে ব্রাজেলের এই কথা ছাপা হওয়ার পর বাইরের বিশ্ব আস্তে আস্তে ভুলে যেতে থাকে রজওয়েলের ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন আসলে থেকেই গিয়েছিলো যে কি ঘটেছিলো সেদিন মধ্যরাতে? যদি ওয়েদার বেলুন হয়েই থাকে, এত বিশাল অংশ জুড়ে একটি ওয়েদার বেলুন এর ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে থাকা কতখানি বিশ্বাসযোগ্য?

সেই প্রশ্নের সূত্র ধরেই ৩০ বছর পর, ইউএফও রিসার্চার স্ট্যানটন ফ্রাইডম্যান ইন্টারভিউ নেন ততদিনে অবসরপ্রাপ্ত সেই ইন্টেলিজেন্স অফিসার মেজর জেসি মার্সেলের। সেই ইন্টারভিউতে মার্সেলের বক্তব্যে গোটা বিশ্ব আবার নড়ে চড়ে বসেন। মার্সেল জানান যে তিনি যেই ক্র্যাশসাইট আর যেসব ধ্বংসাবশেষ দেখে এসেছেন সেগুলো আর যাই হোক কোন ওয়েদার বেলুন নয়। কেবলমাত্র উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তার এবং তার সুপিরিয়র কর্ণেল ব্ল্যানচার্ডকে চুপ থাকতে হয়। তবে অন্য একটি ইন্টারভিউতে মার্সেল ক্র্যাশসাইটে খুঁজে পাওয়া রহস্যময় ধাতব বস্তু নিয়ে বলেছিলেন–

“আপনি যখন জিনিসটি হাতে নেবেন, আপনার কাছে জিনিসটি এতই হালকা মনে হবে যেন হাতে কিছুই নেই। আর সিগারেটের প্যাকেটে যে ফয়েল পেপার দেখবেন জিনিসটি প্রায় সেরকমই পাতলা। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আপনি আপনার শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে এটিকে বাঁকাতে পারবেন না। এমনকি স্লেজহ্যামার বা অন্য যেকোন লোহা পেটানো হাতুড়ি দিয়েও আপনি এই ধাতব পাতের কিছু করতে পারবেন না। আমি নিশ্চিত যে আমি আমার জীবনে এমন কোন ধাতব বস্তু দেখিনি। এবং আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, এটি এই পৃথিবীর কোন বস্তু নয়, কারণ একজন এয়ারফোর্স অফিসার হিসেবে এয়ারক্রাফট এবং ওয়েদার বেলুনে ব্যবহৃত যে কোন ধাতু সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখি।”

মার্সেলের পর এই ঘটনার সাক্ষী আরো অনেকের ইন্টারভিউ নেন ফ্রাইড ম্যান। যারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছিলেন যে এটি যাই হোক, কোন ওয়েদার বেলুন হওয়া অসম্ভব। সেই সাথে র‍্যাঞ্চের মালিক ব্রাজেলকে যে আসলে জোর করে ওয়েদার বেলুন খুঁজে পেয়েছেন বলে স্বীকার করানো হয়েছিলো এটা নিয়েও স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তখনকার মিলিটারীবেইসে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের অনেকে। তবে এটি সম্পূর্ণই করা হয়েছিলো সরকারী নির্দেশ অনুযায়ী।

সবচাইতে যে ঘটনাটি সবাইকে নাড়া দিয়েছিলো সেটি হচ্ছে একজন আর্মি অফিসার নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে স্বীকার করেছিলেন যে সেই ক্র্যাশ সাইট থেকে অন্তত তিনটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিলো যাদের কেউই হিউম্যান নয়। পরবর্তীতে তাদেরকে কন্টেইনড ভ্যাকুয়াম বক্সে করে এয়ার বেইসে নিয়ে আসা হয়। এরপর একটি প্লেন মৃতদেহ গুলো নিয়ে উড়ে যায় নেভাডায়। যেখানে রয়েছে সিক্রেট মিলিটারী বেইস, বিখ্যাত এরিয়া ৫১।

রজওয়েল এর এই ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বড় সরকারী ধামাচাপা দেয়ার ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত। কসমিক ওয়াটারগেট নামের এই কন্সপিরেসি এখনো গোটা বিশ্বের অসংখ্য ইউএফও রিসার্চারদের জন্য অনেক বড় একটি অধ্যায়। যা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা এখনো শেষ হয় নি। কভার আপ এর ব্যাপারে দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর কোন মুখ খোলে নি ইউএস মিলিটারী। সর্বশেষ, ১৯৯৪ সালে ইউএস আর্মি স্বীকার করে যে এটি আসলেই কোন ওয়েদার বেলুন ছিলো না, ছিলো একটি টপ সিক্রেট মিলিটারী অপারেশন। এবং এই ব্যাপারে কোন তথ্য জানাতে অপারগতা জানায় তারা।

এতে মন ভরে নি এই রহস্যের পেছনে দিনরাত শ্রম দেয়া মানুষ গুলোর। সেই ১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই ৭০ বছরে ইউএফও রিসার্চার আজও চেষ্টা করছেন সত্য উদ্ঘাটন করার। চেষ্টা করছেন যাচাই করে নেয়ার, আসলেই কোন মিলিটারী অপারেশন ছিলো? নাকি সত্যিই কোন ভিনগ্রহী অস্তিত্বের সাথে যোগাযোগ ঘটেছে আমাদের?

উত্তর হয়তো জানা যাবে একদিন, নয়তো রহস্যই রয়ে যাবে আজীবন।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-