আচ্ছা, গতকাল এয়ারপোর্ট রোডে মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ফুয়াদ নামে যে টেলিকম কোম্পানীর কর্মকর্তা পাঠাও রাইডে যাবার পথে বিআরটিসি বাসের চাপায় মাথাটা রাস্তায় পিষে গিয়ে নিহত হয়েছেন, তার মৃত্যুটা যে নিতান্তই অবহেলা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ফলে হয়েছে সেটা কেউ খেয়াল করেছেন? না, আমি শুধু বাসের খুনী ড্রাইভারের কথা বলছি না, আমি পাঠাও বাইকারের কথাও বলছি। রাইড শেয়ারিং পদ্ধতিতে চলাচলের অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে বাইকার যাত্রীকে একটা হেলমেট দেবেন। এটা স্রেফ নিয়ম বা প্রথা নয়, রীতিমত আইন। কিন্তু ফুয়াদকে তার বাইকার কোন হেলমেট দেননি। হেলমেট পরা থাকলেই যে ফুয়াদ বেঁচে যেতেন, সেটা বলছি না, কিন্তু মাথায় হেলমেট অন্তত তার মাথাটা রাস্তার সাথে পিষে গিয়ে মস্তিষ্কটা থেঁতলে বেরিয়ে যেত না। হয়তো বড়জোর খুব বাজেভাবে আহত হতেন, কিন্তু বেঁচে থাকার সম্ভবনাও থাকতো! কিন্তু হেলমেট ছাড়া বাইকে ওঠার অর্থই হচ্ছে এক্সিডেন্টে মুহুর্তের মধ্যে স্পটডেড হবার শর্তে লিখিত চুক্তি করা। যেটা আমাদের, সাধারণ যাত্রীদের করতে হয় প্রতিনিয়ত।

জানি এখন অনেকেই যাত্রীদের উল্টো দোষ দিয়ে বলবেন, হেলমেট ছাড়া আপনারা বাইকে চড়েন কেন? কেন কমপ্লেইন করেন না? মজার ব্যাপারটা হচ্ছে যারা এমন পাল্টা অভিযোগ করবেন, তারা সকালে কিংবা বিকালে কখনো অফিস টাইমে প্রবল জ্যামে আটকে থেকে কিংবা ঘন্টার পর ঘন্টা বাস না পেয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বা এক ইঞ্চি ফাঁকা নাই এমন ভিড় বাসে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করেও না উঠতে পারার মত অবস্থায় পড়েন নাই। পড়লে হয়তো কখনই এই পাল্টা যুক্তি দিতে আসতেন না।

পাঠাও, উবার, বাইক রাইড, হেলমেট, দুর্ঘটনা

এই সময়গুলোতে অফিসে যাওয়ার তাড়া থাকায় স্রেফ হেলমেটের জন্য একটা পর একটা রাইড ক্যান্সেল করার সুযোগ থাকে না, কিংবা যেখানে আধা ঘন্টা-পৌনে একটা ঘণ্টা ধরে রাইড সার্চ করেও শেষ পর্যন্ত একটা ফাঁকা রাইড পাওয়া যায় এবং ফোন দিয়ে শুনি যে তিনি এক্সট্রা হেলমেট আনেননি। তবুও আমি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাই, একটার পর একটা রাইড ক্যান্সেল দেই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সময়ে না কুলানোয় আর না পেরে হেলমেট ছাড়াই যেতে হয়। মাঝে মাঝে সপ্তাহ-দুই সপ্তাহে হুট করে কোন রাইডারকে হেলমেট সহ পেয়ে গেলে সেটাকেই অতি আশ্চর্য মনে হয়। এটা স্রেফ পাঠাও না, উবার, সহজ, থেকে শুরু করে সকল রাইড শেয়ারিং অ্যাপেই একই অবস্থা! এক্সট্রা হেলমেট না থাকাটাই যেন এখানে স্বাভাবিক!

পাঠাও যদিও তাদের রাইড শেয়ারিং শেষে বাইকার হেলমেট দিয়েছেন কিনা জিজ্ঞেস করার অপশন রেখেছে, কিন্তু সেটা যে মোটেও কাজ করছে না তার প্রমাণ হেলমেট পাওয়াটাই অস্বাভাবিক হয়ে ওঠা। এখন আমাদের যাত্রীদের কি করা উচিত? একটা কাজ করতে পারি আমরা, যে রাইডারকেই ফোন দিয়ে হেলমেট পাবো না, তার ব্যাপারে সরাসরি কমপ্লেইন করতে পারি অফিসে গিয়ে, বিটিআরসিতেও যেতে পারি। কিন্তু এভাবে কয়দিন? আমার চেনাপরিচিত অসংখ্য মানুষ অনেকবার কমপ্লেইন জানিয়েছেন অফিসে গিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজ হবার রেট খুবই কম। এখন যেখানে এই অ্যাপগুলো আমাদের ব্যবহার করতে হচ্ছে প্রতিদিন, সেখানে এদের কি যাত্রীদের প্রতি বিন্দুমাত্র দায়বদ্ধতা নেই? রেজিস্ট্রেশন করলেই একেবারে শিক্ষানবীশ কিংবা নতুন বাইকারদের নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে রাস্তায়। আনাড়ি এবং বেপরোয়া লোক নেহাত কম নয়।

পাঠাও, উবার, বাইক রাইড, হেলমেট, দুর্ঘটনা

এই লেখাটা বেশ কয়েকটা উবার ও পাঠাও ইউজার্স গ্রুপে পোষ্ট করবার পর পাওয়া গেল বিচিত্র সব ফিডব্যাক! প্রথমেই বেশ কিছু রাইডার এলেন, যারা সরাসরি কটাক্ষ করলেন যে হেলমেট বাইকার কেন দেবে, এতো দরকার লাগলে যাত্রীরা যেন নিজেই হেলমেট কিনে নেয়, এটা নাকি ছোটলোকি আচরণ! বেশ কয়েকজন বাইকার তো হাইজিন তত্ত্বও নিয়ে আসলেন। যে অনেকবার ব্যবহার করা হেলমেট নাকি অস্বাস্থ্যকর, মোটেও ভালো না, তাই যাত্রীদের উচিৎ নিজেদের হেলমেট কিনে ব্যবহার কড়া। তাদের দায় এড়াবার এমন বিচিত্র সব যুক্তি দেখে বিস্ময়ে হতবাক হবার আগেই বেশ কিছু যাত্রী জানালেন আরো উদ্ভট কিছু তথ্য। পাঠাও-উবারের পক্ষ থেকে নাকি রাইডারদের  হেলমেট দেওয়া হয়েছিল যাত্রীর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে, কিন্তু পরবর্তীতে অনেক রাইডার নাকি সেই হেলমেটগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন গুলিস্তানসহ নানা মার্কেটে।

এমনকি অনলাইনে বিক্রয়.কম ও অন্যান্য অনলাইন সেলিং ওয়েবসাইটেও নাকি এখনও উবার-পাঠাওয়ের হেলমেট বিক্রির বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়। কোম্পানীগুলো থেকে হেলমেট বাইকাররা নিয়মিত যাত্রীদের দিচ্ছে কিনা সেটা কড়া মনিটর না থাকায় এই প্রবণতা আরও বেড়েছে! এমনিতেই সচরাচর বাইকাররা যাত্রীদের জন্য যেসব হেলমেট দেন সেগুলো বাজারের সবচেয়ে সস্তা হেলমেটের চেয়েও নিকৃষ্ট মানের হয় থাকে, এক্সিডেন্ট হলে এই হেলমেটে মাথা বাঁচবে না সেটা দেখেই বোঝা যায়, তবুও তো যাত্রীর মধ্যে একটা সেফটি অ্যাসিউরেন্স তৈরি হয় হেলমেট পেলে। সেই হেলমেটও যখন দুর্লভ হয়ে ওঠে, কোম্পানি থেকে দেওয়া হেলমেট বাজারে বিক্রি করে দেওয়ার খবর পাওয়া যায়, তখন আসলে যাত্রী হিসেবে এই অ্যাপ সার্ভিসের উপর আস্থা ভরসা পুরোপুরি উঠে গেলেও দোষ দেওয়া যাবে না।

পাঠাও, উবার, বাইক রাইড, হেলমেট, দুর্ঘটনা

আমার সেই পোষ্টের নীচে এক ভুক্তভোগী যাত্রী এই মন্তব্যটি করেছিলেন। প্রাসঙ্গিক হওয়ায় মন্তব্যটি তুলে দিচ্ছিঃ

পাঠাও,উবার কোন অভিযোগই আমলে নেয় না। কাস্টমার কেয়ারের ওরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে অনেক মোবাইল বিল তুলে দিয়ে শেষ পর্যন্ত অভিযোগ গ্রহণ করার একটা ভাব করে এবং মিষ্টি মিষ্টি ছেলেভুলানো কথা বলে, কিন্তু সমস্যার কোন সমাধান কখনোই করে না। আরেকটা সমস্যা হল, আমার পিক আপ পয়েন্ট থেকে (যেখান থেকে রিকোয়েস্ট সেন্ড করি) অনেক দূরে থাকা অবস্তায় রাইডাররা রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করে। যেমন আপনার বাসা শ্যামলীর বেশ ভিতরে, গাবতলি থেকে রিকু এক্সেপ্ট করে, রাইডার ফোনে বলে- আসতেছি;তারপর আর আসেনা, এক-দেড় ঘন্টা। ক্যান্সেলও করে না রাইড। আমি ক্যান্সেল করলেই নেগেটিভ পয়েন্ট,অথচ সমস্যা তাদের। সেদিন এক রাইডার পিক আপ পয়েন্টে না এসেই ‘স্টার্ট জার্নি’ চালু করে দিয়েছে অনেক দূর থেকে (এক ঘণ্টা দূরত্ব থেকে)। আমি রাইড ক্যান্সেলের অপশনও পাচ্ছিলাম না তখন,মে বি অ্যাপের নিয়ম এইটা, তাই। একটু পরে সে কি মনে করে এন্ড রাইড দিয়ে দিল দয়া করে, ততক্ষণে ১০০ টাকা বিল। জরুরী দরকার ছিল ওইদিন একজায়গায় তাড়াতাড়ি যাওয়ার। সাথে সাথে বোনের মোবাইল দিয়ে রিকোয়েস্ট দিলে একই লোক রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করে, একই ভাবে ভাবে রাইড স্টার্ট করে একটু পরে, এবারো একটু পরে এন্ড রাইড দিল সে, ১০০ টাকা বিল আমাদের এই মোবাইলেও।

তারপর অনেক কষ্টে এই দুই আইডির ২০০ টাকা ওয়েভ করাইছি ওদের কাস্টমার কেয়ারে ফোন দিয়ে, ফোন বিল গেছে অন্তত ৫০ টাকা। সি এন জি তেই যাওয়া লাগছে পরে, অনেক লেট হইছি সেদিন এই চক্করে।এ  শুধু আমার একদিনের ভোগান্তি, পাঠাও আর উবারের গ্রুপে এমন রোজ শত শত অভিযোগ আসে, সমাধান হয় কি ১০% এর ও? মনে হয় না। তাহলে একই অভিযোগ পরের দিন আবার আসত না। আমার মনে হয় সরকার যদি কঠোরভাবে এদের আইন মানাতে না পারে,তো এই সার্ভিস গুলা অফ করে দেয়াই বেটার। সরকারের উচিৎ আরো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নামানো রাস্তায়।আরো কত কিছুই উচিতের ভেতরে হয়তো এই উচিৎটাও হারিয়ে যাবে,রয়ে যাবে আমাদের সাধারণ মানুষের কপালের ভোগান্তিগুলো শুধু.. 

অবশ্যই এই রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলো অজস্র মানুষের কর্মসংস্থান এবং বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করেছে, অসাধারণ অবদান রাখছে বেকারদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে, কিন্তু প্রশিক্ষণ ছাড়াই, হেলমেট ক্যারি করার কড়াকড়ি ও বাধ্যবাধকতা ছাড়াই বাইকারদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে তারা যে যাত্রীদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছেন, এতে যাত্রীদের আস্থার জায়গাটা যে নষ্ট হচ্ছে, এতে আল্টিমেটলি ক্ষতিগ্রস্ত কারা হবে? অ্যাপ সার্ভিসগুলোকে বাইকারদের প্রপার ট্রেনিং দেওয়া এবং হেলমেট রাখার আইন মানতে বাধ্য করার উপায় কি? আমরা যাত্রীরা কি চিরকালই এভাবে ভিক্টিম হতে থাকবো?

No Helmet,say no to app sharing rides
#Safety_First

Comments
Spread the love