খেলা ও ধুলা

এই ‘কামলা’দের কারণেই দুবাই হয়ে গিয়েছিল মিরপুর!

ম্যাচ চলাকালীন সময়ে ক্রিকইনফোর লাইভ কমেন্ট্রির মাঝখানে একজন মন্তব্য লিখলেন- শেষবার বাংলাদেশ যখন আরব আমিরাতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিল, শ্রীলংকা তখনো বিশ্বকাপ জেতেনি, বিল ক্লিনটন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং বাংলাদেশের এই এশিয়া কাপ টিমের মেহেদি হাসান মিরাজ, মোসাদ্দেক, নাজমুল হাসান অপু এবং আবু হায়দার রনি তখনো জন্মাননি…! 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাঠে বাংলাদেশ দলের অনভিজ্ঞতার ব্যাপারটাই ফুটে উঠেছিল সেই মন্তব্যে। অচেনা দেশ, একদমই অপরিচিত পরিবেশ। কিন্ত দুবাইয়ের ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ গতকাল খেলেছে স্বাগতিক দল হিসেবে। গ্যালারীতে হাজির হাজার হাজার বাংলাদেশী দর্শক আর তাদের গলাফাটা চিৎকার শুনে এক মূহুর্তের জন্যেও মনে হয়নি, খেলাটা দেশের বাইরে হচ্ছে। বরং টিভিতে খেলা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, মিরপুরেই বুঝি শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে মাশরাফির দল! 

এশিয়া কাপ, বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা, মাশরাফি বিন মুর্তজা, প্রবাসী শ্রমিক, সমর্থক, আমি নোমান থাকি ওমান, কামলা
মাঠে বাংলাদেশ দল, গ্যালারী হাজার হাজার দর্শক। দুবাই যেনো কাল মিরপুর হয়ে উঠেছে!

শুরুর বিপর্যয়ে বাংলাদেশ যখন বেসামাল, দুবাইয়ের গ্যালারী তখনও পুরোপুরি ভরে ওঠেনি। ছুটির দিন হওয়ায় ধীরে ধীরে দর্শকের আনাগোনা বেড়েছে, আর তাদের বেশিরভাগই ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশী। দেশের জায়গা-জমি বিক্রি করে টাকা জমিয়ে দালাল বা এজেন্সির হাতে তুলে দিয়ে সুখী একটা ভবিষ্যত গড়ার আশায় যে মানুষগুলো হয়তো দুবাইতে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তারাই নিজের দেশের খেলোয়াড়দের অকুণ্ঠ সমর্থন দিতে মাথায় লাল সবুজ পতাকা বেঁধে গতকাল হাজির হয়েছিলেন স্টেডিয়ামে। 

সময়ের সাথে বাংলাদেশের ইনিংস এগিয়েছে, মুশফিক-মিঠুনের জুটিতে বড় স্কোরের দিকে এগিয়েছে দল। সেই সঙ্গে গ্যালারীতে বেড়েছে চিৎকারের মাত্রা। হুট করে দেখলে মনে হবে, মিরপুরের হোম অফ ক্রিকেটেই বুঝি খেলছে বাংলাদেশ! একেকটা বাউন্ডারির পরে কি উন্মাদনা তাদের! আরব সাগরের ঢেউয়ের গর্জন যেন ছিটকে বেরিয়ে আসছিল তাদের কণ্ঠ থেকে! আহত হাত নিয়ে তামিম যখন ব্যাটিং করতে মাঠে নামলেন আবার, তখন তো দর্শকদের চিৎকারে কান পাতা দায়! বাংলাদেশের প্রতি দর্শকদের এমন অকুণ্ঠ সমর্থন দেখে অবাক হয়েছেন ধারাভাষ্যকারেরা, বিস্ময় ঘিরে ধরেছিল শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারদেরও। 

এশিয়া কাপ, বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা, মাশরাফি বিন মুর্তজা, প্রবাসী শ্রমিক, সমর্থক, আমি নোমান থাকি ওমান, কামলা
মাঠে ছুটে এসেছেন প্রবাসীরা, দেশের খেলা বলে কথা!

গতকাল যারা স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছেন, সেসব বাংলাদেশীদের সিংহভাগই প্রবাসী শ্রমিক। পেটের দায়ে আরব আমিরাতে পাড়ি জমিয়েছেন। দেশ ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা এই মানুষগুলোর মাথায় সারাক্ষণ হয়তো চেপে বসে থাকে দেশে রেখে আসা পরিবার আর আপন মানুষগুলোর চিন্তা, দুটো টাকা বাড়তি আয়ের জন্যে সারাদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে একটুও দ্বিধাবোধ করেন না যারা। মাথাভর্তি বিদ্যা নেই তাদের, পকেটে ক্রেডিট কার্ডের বালাই নেই, তবে বুকভর্তি ভালোবাসা আছে দেশের জন্যে, বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জন্যে। ছুটির দিনে খানিকটা অবসর পেয়ে তাই তারা ছুট লাগিয়েছিলেন স্টেডিয়ামের দিকে, তামিম-সাকিব-মুশফিক-মাশরাফিদের জন্যে চিৎকার করে গলা ফাটাবেন বলে! 

এসব প্রবাসী শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রম আর ঘামে সচল রয়েছে আমাদের অর্থনীতি, তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের টাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশীক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড ছুঁয়েছে! কিন্ত এতসব অবদানের প্রাপ্য সম্মানটা তো তারা কখনোই পান না। নিজের দেশের এয়ারপোর্টে এদেশের মানুষজনই তাদের হেনস্থা করে, ফেসবুকে তাদের নিয়ে ট্রোল বানানো হয় ‘আই অ্যাম দুবাই’ বা ‘আমি নোমান থাকি ওমান’ নামে, যদিও ওমানে থাকা নোমান নামের সেই ভদ্রলোক কখনও কারো বাড়া ভাতে ছাই দেননি। এই মানুষগুলোকে আমরা ‘কামলা’ বলে অবজ্ঞা করি, সেই কামলারাই গতকাল দুবাইয়ের ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে মিরপুর বানিয়ে ফেলেছিলেন! 

এশিয়া কাপ, বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা, মাশরাফি বিন মুর্তজা, প্রবাসী শ্রমিক, সমর্থক, আমি নোমান থাকি ওমান, কামলা
বিশ্বকাপ ফুটবলে এসব কাজ জাপানকে করতে দেখা গিয়েছে, কাল দেখা গেলো বাংলাদেশের দর্শকদের!

এই মানুষগুলোর জন্যেই প্রথমবারের মতো দুবাইয়ে খেলতে যাওয়া বাংলাদেশের এই দলটার খেলোয়াড়দের একবারও মনে হয়নি তারা দেশের বাইরে অপরিচিত কোন জায়গায় খেলছেন। শুধু তা’ই নয়, ম্যাচ শেষ হবার পরে নিজেদের গরজেই স্টেডিয়ামের গ্যালারি পরিস্কার করেছেন এই ‘কামলা’ মানুষগুলো, যাদের আমি-আপনি অশিক্ষিত বলে গাল দেই সবসময়। চিপসের প্যাকেট, জুসের ক্যান কিংবা কফির কাপ, সবকিছুই তুলে এনে গ্যালারী পরিস্কার করেছেন তারা! বিশ্বকাপ ফুটবলে এমনটা করেছিল জাপানের সমর্থকেরা, এবার এশিয়া কাপ ক্রিকেটে সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রবাসী এই বাংলাদেশীরা। এরপর থেকে এই মানুষগুলোকে যারা অশিক্ষিত বলবেন, তাদের চেয়ে বড় নির্বোধ আর কেউ দুনিয়ায় নেই। 

বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাও ম্যাচশেষে সমর্থকদের ঋণ স্বীকার করে নিয়েছেন অকুণ্ঠ চিত্তে। ম্যাচ প্রেজেন্টেশনের সময় মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ভরা গ্যালারীর দিকে তাকিয়ে বাংলা ভাষাতেই তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে দুর্দান্ত এই জয় উৎসর্গ করে বলেছেন- “আপনারা প্রবাসী ভাইয়েরা সবাই বিভিন্ন জায়গা থেকে কষ্ট করে এসেছেন এইজন্য ধন্যবাদ। ইনশাল্লাহ ভবিষ্যতেও এভাবে আমাদের সাথেই থাকবেন, আজকের এই জয়টা আপনাদের জন্য!” 

এশিয়া কাপ, বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা, মাশরাফি বিন মুর্তজা, প্রবাসী শ্রমিক, সমর্থক, আমি নোমান থাকি ওমান, কামলা
ম্যাচ শেষে প্রবাসী বাংলাদেশী দর্শকদের মাঠে এসে সমর্থন জানানোয় অভিবাদন জানাচ্ছে বাংলাদেশ দল।

আপনি তাদের নিয়ে ট্রোল করুন, অশিক্ষিত কামলা বা আরও খারাপ কিছু বলুন, তাতে তাদের কিচ্ছু আসবে যাবে না। মাশরাফির দেয়া ধন্যবাদটাই তারা মনে রাখবেন, আপনার-আমার কটুক্তিগুলো নয়। এভাবেই তারা নিজেদের কাজটা করে যাবেন, দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যাবেন, দেশের বাইরে বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচ হলে কাজ ফেলে এসে গলা ফাটিয়ে সমর্থন দেবেন। আর দেশের জন্যে যাদের বিন্দুমাত্র অবদান নেই, তারাই সময়ে অসময়ে বিনা কারণে তাদের গালি দিয়ে যাবেন, তাদের নিয়ে ট্রোল করবেন… 

আরও পড়ুন– 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close