মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ, ঘুষ খাওয়া কখনোই নয়!

একটা ছবি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরের সামনে বৃষ্টিভেজা এক প্রেমিক যুগল চুমু খাচ্ছেন একে অন্যকে। অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন, কিন্ত মন্তব্যের ঘরে বেশিরভাগ মতামত দেখে হতাশা জন্ম নিলো। বেশিরভাগ মানুষ গালিগালাজ সহকারে ধুয়ে দিচ্ছেন ছেলে-মেয়ে দুটিকে। যেন প্রকাশ্য দিবালোকে একে অন্যকে চুমু খেয়ে রাষ্ট্র বা সমাজবিরোধী কোন কাজ করে ফেলেছেন তারা!

ধর্ম আর সামাজিকতা টেনে এনে সমালোচনা করা হচ্ছে এই যুগলের, ধর্ম এই ব্যাপারটা সমর্থন করে না বলে মত দিয়েছেন কেউ কেউ। তারা কি জানেন, ছবির সেই তরুণ-তরুণী কোন ধর্মের অনুসারী ছিলেন কি ছিলেন না? কেউ বলছেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে নাকি প্রকাশ্যে চুমু খাওয়াটা বেমানান! তাদেরকে আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, প্রকাশ্যে রাস্তায় নারীদের গায়ে হাত তোলাটা বাংলাদেশের সংস্কৃতির অংশ হয়েছে কবে থেকে? দুর্নীতি করে পুকুর চুরি করাটা আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ পরিণত হয়েছে কবে থেকে?

নচিকেতা হয়তো এই মানুষগুলোর জন্যেই অনেক বছর আগে গেয়েছিলেন- ‘প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ ঘুষ খাওয়া কখনোই নয়!’ আমি নিজেকে ওই ছেলেটা বা মেয়েটার জায়গায় কল্পনা করি। ওরা কাউকে খুন করেনি, কারো সম্পত্তি জোর করে দখল করেনি, কারো টাকা পয়সা মেরে দেয়নি, হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে কারো হাত পা ভেঙে দেয়নি, শিক্ষকের গায়ে হাত তোলেনি, রাজনৈতিক সমাবেশে যাওয়ার সময় ট্রাক থেকে কোন মেয়ের গায়ে পানি ছুঁড়ে মারেনি, বাসের ভেতরে কোন মেয়েকে মলেস্ট করেনি। তবুও কেন এত ঘৃণা কুড়াতে হচ্ছে ওদের? প্রকাশ্য দিবালোকে একে অন্যকে চুমু খেয়েছে বলে?

প্রথমত, চুমু খাওয়া, বা প্রকাশ্যে চুমু খাওয়াটা বাংলাদেশের দণ্ডবিধি আইনে কোন অপরাধ নয়, যতোক্ষণ না সেটা পাবলিক নুইসেন্স হচ্ছে। এমনকি চুম্বনরত যুগল যদি একই লিঙ্গের হয়, তাতেও কোন সমস্যা নেই, যদি না তারা প্রকাশ্যে সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স না করেন। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের আশেপাশের বেশিরভাগ মানুষই চুমু খাওয়াটাকে যৌনতার একটা অংশ বা প্রারম্ভিক অংশ বলে মনে করেন। সমস্যাটা এখানেই। একটা ছেলে বা মেয়ে যে একে অপরকে ভালোবেসে চুমু খেতে পারে, সেটা অনেকের মাথাতেই ঢোকে না। আপনি বলতে পারেন, এসব তো ইউরোপে হয়, আমেরিকায় হয়, বাংলাদেশে কেন হবে? বিশ্বায়নের এই যুগে ইউরোপ আমেরিকার সীমানা কতদূর বিস্তৃত হয়েছে, সেটা জানা আছে জনাব? সেজন্যেই চুমু খাওয়ার ভেতরে আপনারা শুধু অশ্লীলতাই খুঁজে পান, ভালোবাসাটুকু আপনাদের নজর এড়িয়ে যায়।

কেউ আবার ঘর আর বাইরের গল্প শোনাচ্ছেন। ঘরের কাজ নাকি বাইরে করতে নেই! ভালোবাসার প্রকাশের জন্যে দুটো মানুষকে চার দেয়ালের ভেতরে ঢুকতে হবে? এই সমাজই তো সেই রাস্তায় বাঁধ দিয়ে রেখেছে। স্বাবলম্বী না হলে একটা ছেলের বিয়ে করার ‘অধিকার’ নেই এখানে, সেসব কেচ্ছাকাহিনী টানতে গেলে লেখার মূল বিষয়বস্তুটাই নষ্ট হয়ে যাবে। যারা এসব অজুহাত দেখান, তারা চুমুর ভেতরে শুধু কামনাটাই দেখতে পান। কিস আর সেক্সের মধ্যে তারা পার্থক্য করতে পারেন না, তাদের কাছে ভালবাসা আর যৌনতা দুটোই একই অর্থ বহন করে সম্ভবত!

যারা এগুলো বলেন, তাদের আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, আপনাদের কাছে রাত-বিরাতে পর্ণ ভিডিও দেখাটা হালাল, রাস্তাঘাটে মেয়েদের টিজ করাটা হালাল, ভীড়ের মধ্যে একটা মেয়ের গায়ে হাত দিতে পারলে আপনারা বর্তে যান, ক্যাটরিনা কাইফের কোমর দোলানো দেখে আপনারা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, ঘুষের লেনদেন করতে হাত কাঁপে না আপনাদের, দুই নম্বরী ধান্দাবাজি হাসিমুখে করে যান আপনারা, শুধু দুটো ছেলেমেয়ে প্রকাশ্যে কেন চুমু খেল, সেটাই হারাম হয়ে গেল? অপরাধী হয়ে গেলেন তারা? অদ্ভুত এক হিপোক্রেসি!

ভালোবাসার প্রকাশভঙ্গী একেকজনের কাছে একেক রকমের। কেউ সবাইকে দেখিয়ে ভালোবাসার মানুষটাকে ‘ভালোবাসি’ বলে জানাতে চায়, কেউবা চুপিচুপিই জানায়। দুই গোত্রের কেউই পাপী নয়, কেউ ভুল নয়। আপনি কারো দিকে আঙুল তুলে কথা বলতে পারেন না ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না কেউ আপনার, সমাজের, বা দেশের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। প্রকাশ্যে চুমু খেয়ে এই যুগল কি অপরাধটা করেছে? আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে কিভাবে ভালোবাসার কথা জানাবো, কেমন হবে আমার প্রকাশভঙ্গি, সেটা আপনি কেন ঠিক করে দেবেন? তারা তো কাউকে জোর করেনি কোনকিছুতে। কারো ওপর চাপিয়ে দেয়নি কিছু। আপনাকে বাধ্য করা হয়নি তাদের দিকে তাকাতে। তাহলে কেন গালি দিয়ে নিজের বংশের পরিচয় জানাচ্ছেন আপনি?

এই দেশে মেয়েদের ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়, নববিবাহিত তরুণীকে তুলে নিয়ে ধর্ষন করা হয়, বাসের ভেতরে অসহায় একটা মেয়েকে ধর্ষণের পর ঘাড় মটকে মেরে ফেলা হয়। এসব ঘটনার শিকার হওয়া ভুক্তোভোগীদের কোর্ট-কাছারির চক্কর কাটতে হয় বছরের পর বছর, তবুও বিচার মেলে না। এদেশে সরকারী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যায়, সরকারের ছত্রছায়ায় থাকা লোকজন শেয়ার বাজারের শত শত কোটি টাকা মেরে দেয়, সেসবের কোনো বিচার হয় না, কোন মামলা মোকদ্দম হয় না। লোকজন এদের কথা মনেও রাখে না। যতো দোষ কেবল চুমু খাওয়ার বেলায়!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এলাকায় দিনের বেলায় মেয়েদের গায়ে হাত তোলা হয়, হাত ধরে হাঁটার অপরাধে সিনিয়রের গায়ে হাত তোলে জুনিয়রেরা! তাদের দম্ভ, তারা রাজনৈতিক দল করে! সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক ক্যাডারেরা একটা ছেলের পা ভেঙে দেয় হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে, সেটার কোন বিচার হয় না, উল্টো তড়িঘড়ি করে আহত ছেলেটাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ! রাজধানী শহরে মিছিল নিয়ে রাজনৈতিক সমাবেশে যাওয়ার সময় দেড়শো-দুশো টাকায় ভাড়া করে আনা কিছু অমানুষ ট্রাকের ওপর থেকে মেয়েদের গায়ে পানি ছুঁড়ে মারে, ময়লা ফেলে! মিছিলের মাঝখানে মেয়েদের হেনস্থা করা হয়, আর আপনারা বলেন চুমু খাওয়ার মতো অশ্লীল কাজ আর নেই!

আমি আপনাদের বলি, অশ্লীল কাজ কোনটা। শেয়ার বাজার লুট করাটা অশ্লীল কাজ, ব্যাংকের টাকা লাপাত্তা করে দেয়াটা অশ্লীলতা, হাতুড়ি দিয়ে সহপাঠির পা ভেঙে দেয়াটা অশ্লীলতা, বাসের ভীড়ে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়াটা অশ্লীলতা, সমাবেশে যাওয়ার পথে তরুণীর গায়ে পানি ছুঁড়ে মারাটা অশ্লীল কাজ। আইনের রক্ষক সেজে ভক্ষক হওয়াটা অশ্লীল কাজ, ক্ষমতায় আসার জন্যে বোমাবাজী করে আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানোটা অশ্লীল কাজ। চুমু খাওয়াটা অশ্লীলতা নয়, জগতের সবচেয়ে পবিত্র ব্যাপারগুলোর একটা। সেটা অনেকের গোবরপোরা মস্তিস্কে ঢুকবে না।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close