মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

টিএসসির বারেক মামারা কি শুধুই একেকজন চা বিক্রেতা?

এইতো কয় দিন আগেই নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল টিম টিএসসির চা বিক্রেতা মামাদের প্রতিদিন রাত ৮ টার মধ্যে তাদের দোকানপাট গুটিয়ে চলে যেতে বলেছিল। এ নিয়ে স্বপন মামা, বারেক মামা, শাহাবুদ্ধিন মামা, রুবেল ভাইদের যে কি পরিমান আক্ষেপ আর মন খারাপ! স্বপন মামা, বারেক মামা তো তাৎক্ষনিকভাবেই সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ৮ টার পর মামারা আর তার ভাগ্নে ভাগ্নিদের চা খাওয়াইতে পারবেন না সে আবার হয় নাকি!

তারও কিছুদিন আগে টিএসসিতে ত্রিকালদর্শী স্বপন মামার টিএসসিতে তার ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান পালন করা হয়। ভাগ্নে ভাগ্নিদের এই আয়োজনে মামা সেখানে সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন। ঐদিন ভাগ্নে ভাগ্নিরাই মামার দোকানে এসে সবাইকে চা বানিয়ে খাইয়েছেন। ক্যাম্পাসের অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হিসেবে বয়োজ্যেষ্ঠ মামাদের মধ্যে তো সেদিন বারেক মামাও এসেছিলেন স্বপন মামাকে অভিবাদন জানাতে। আর সামনে যে এরকম আরেকটি উৎসব আয়োজন বারেক মামারও প্রাপ্য তা নিয়ে সেদিনই অনেকে কথা বলছিল।

কিন্তু সেই সুযোগটা আর পাওয়া গেল কই? আমাদের ক্যাম্পাসের এই চা বিক্রেতা মামা, একজন চলমান ইতিহাসবিদ, একজন সার্বজনীন অভিভাবক যে গতকাল আনুমানিক রাত ১০ টায় আমাদের সবাইকে ছেড়ে সব ইহলৌকিক মায়া ত্যাগ করে পাড়ি দিয়েছেন অজানার পথে! এক না ফেরার দেশে!

হাফওয়ালে বসা একজন সার্বজনীন অভিভাবক

আমার বেশীরভাগ সময়ে স্বপন মামা আর রুবেল ভাইয়ের দোকানে চা খাওয়া হলেও বারেক মামার কাছেও যাওয়া হতো প্রায়। তবে এই চা খাওয়ার সাথে আমাদের ভালবাসার সম্পর্কের কোন দ্বৈরথ ছিল না। বরং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বর্ষে সদা হাস্যোজ্বল বারেক মামার হাসিমুখে ইতিহাস পাঠ শুনতেই ভালবাসতাম। তিনি তার সুখ দুঃখের গল্প বলতেন আমাদের সাথে। যার ফলে আমি বিশ্বাস করি যে গতকালকে বারেক মামার মৃত্যুসংবাদ টিএসসি কেন্দ্রিক সকলের কাছেই নিঃসন্দেহে কিছুক্ষণের জন্য হলেও সাম্প্রতিক সময়ের সকল ঘটনার ছাপ, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসেবকে ম্লান করে দিয়েছে। একটা মানুষ বছরের পর বছর কীভাবে কে কতটুকু চিনি খায়, কে মালটোভা চা পছন্দ করে, কে চিনি খায় না, কে টকঝাল চা পছন্দ করে তা মনে রাখতে পারে, তা এক বিস্ময় জাগানিয়া ব্যাপার! কিন্তু টানা তিন চার দিন তার কাছে চা খেতে গেলেই তা অনায়াসে মনে রাখতে পারতেন এই বারেক মামা। এক সময় তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল দুলাল। কিন্তু বারেক মামার সাথে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট দুলালের খুনসুটি ঝগড়া হতো ভাগ্নেদের এই ডিমান্ড মনে রাখা নিয়া, যে কারনে একসময় তিনি নতুন নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট আনা শুরু করলেন, কিন্তু বারেক মামা, বারেক মামাই। কোনো অ্যাসিস্ট্যান্ট তো আর তার মতো চা বানাতে পারবে না!

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন টিএসসির প্রখর, নিষ্প্রভ, দ্বিধাদ্বন্দ্বের, সাফল্যের, প্রেমের, একাকীত্বের, মিটিং করার, সেটিং দেবার, ম্যানিপুলেইট করার, ম্যানিপুলেইটেড হবার, রাগের-ক্ষোভের, ব্যর্থতার, হাফওয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকার দুর্বার দিন, কুয়াশার, ধোঁয়াশার, ঝড়-বৃষ্টি সবকিছুতেই সমাধান হচ্ছে বারেক মামার দোকানের সামনে বসে নিজেকে রাস্তার রাজা মনে করার সাথে চিনিছাড়া রং চায়ে চুমুক দেয়া। অথচ এই বারেক মামারে আমি খাওয়াই নাই কোনদিন, কিন্তু তিনি আমাদের হাজার হাজার চা খাওয়ায়ে গেছেন আমাদের হাজার হাজার মুখেরে।

নক্ষত্র আপুর প্রিয় ছিল ড্যানিশ দেয়া কেইক। আপুর ডিমান্ড অনুযায়ী চামচ দিয়ে বারেক মামাকে নিজের হাতে কেইকে কন্ডেন্সড মিল্ক মাখিয়ে দিতে হবে! একমাত্র মামার দোকানের ঐ কোণটাতেই একটা সিংহাসন সিংহাসন ব্যাপার আছে, পেছনের অশ্বত্থ গাছের বদলে যাওয়া যৌবনের উপস্থিতি আছে। আছে রাতে ঐ কুপির আলো!

নক্ষত্র আপুর সাথে বারেক মামা

বারেক মামার সাথে আপুর ছিল বেশ খাতির। বারেক মামার অসুস্থতা, শীতবস্ত্র নাই, হা-হুতাশ। এরিস্টোটোলের মতো আপু আর বারেক মামা বসে সর্বোচ্চ আক্ষেপ করেছে, নতুন ছেলেমেয়েরা উচ্ছন্নে যাইতাছে, কোনোকিছুই আগের মত নাই! ব্যক্তিগত কথা, কেন তাঁর ভাইগ্না দোকানে বসেছে, তাঁর ছেলে মুক্তার নাকি সিনেমায় নামছে, সিনেমার নাম “চলো প্রেম করি”, কিছুদিন পর মুক্তার আবার সোহরাওয়ার্দীতে আলুর চপ, বেগুনি, আবার টিএসসিতে দুনিয়ার সব ফল দিয়ে এই চা সেই চা বানানোর দোকান দিল! কিসের থেকে যে কি হইয়া গেল!

এই সারল্যতার জন্য এভাবেই একদিন মুক্তারের বাবা হয়ে উঠেছিলেন আমাদের পিতৃতুল্য সার্বজনীন অভিভাবক। তার কাছে পানি খেতে চাইলে কখনো বোতলের শেষ পানিটুক খেতে দিতেন না, ঐটুকু ফেলে দিয়ে নতুন পানি ভরে এনে দিতেন। ছুটির ক্যাম্পাস, দুপুরের টিএসসি; খা খা করছে চারিদিক, আমাদের সহায় হিসেবে ঠিকই আছেন এই বারেক মামারা।

একজন বালক ক্যান্টিনে কাজ করতে করতে মুক্তিসংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখলেন। প্রত্যক্ষ করলেন জাসদের উত্থান-পতন। স্বৈরাচারের ক্ষমতা দখল এবং প্রতিবাদী জনতার বিদ্রোহ দেখলেন যৌবনে। সাক্ষী হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্জীবতার, নিঃস্পৃহতার, বর্বরতার ও বিদ্রোহের। পড়তি বার্ধক্যে প্রত্যক্ষ করলেন ২০০৭ এর আগষ্টের ছাত্র বিদ্রোহের। ঋদ্ধ হয়েছেন শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায়- বিরক্ত হয়েছেন ক্ষমতাসীনদের আস্ফালনে। চা বানাতে বানাতে দেখেছেন কতশত মিছিল। বারেক মামা মানে টিএসসি, বারেক মামা মানে অনেক স্মৃতির ধূমায়িত ঝাপটা, বারেক মামা মানে কিছু আস্থা, বারেক মামা মানে জীবন যুদ্ধের মাঝে অমলিন হাসিটাকে ধরে রাখা। তাই এ ক্যাম্পাসকে জানতে বুঝতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এই বারেক মামারা। শেষ যেদিন মামার সাথে কথা হচ্ছিল মামা বলছিলেন তার দোকানের পাশে ইট সিমেন্টের বসার জায়গা বানাবেন!

Sketch by Shaktimohito Subir

সেই বারেক মামাও প্রকৃতির মাঝে বিলীন হলেন। এমন মৃত্যুহীন প্রাণ বেচে থাকবেন শতশত শিক্ষার্থীর স্মৃতিকাতরতায়। তারই প্রমাণ আজ সকালে টিএসসি চত্বর পার হয়ে আসার সময় বুকের ভেতরটা হঠাৎ হুহু করে উঠাটা। তাঁর ছোট্ট চায়ের দোকানখানিতে ভালবেসে ফুল দিয়ে গেছে কেউ। সব আছে আগের মতই। শুধু বারেক মামা নেই!

পরের জন্মে যদি আবার এ প্রাঙ্গনে আসা হয় তবে সেদিন আর কেটলি হাতে টিএসসির হাফওয়ালে নয়, বরং স্যুট টাই পড়া কাঁচা-পাঁকা বাবুদের মত আনুষ্ঠানিক অভিভাবক হয়েই ফিরে আসবেন আমাদের মাঝে। বাবা-মা’র কোল ছেড়ে আসা এই ছেলে-মেয়েগুলোকে আপনাদের মত করে আর কেউ কখনও বোঝেনি বারেক মামা! ঘোরলাগা এ সময়ে আপনাদের হাসি ও মমতামাখা চাহনীগুলো নির্ভেজাল পিতৃত্বেরই প্রতিরূপ।

টিএসসির সকল জায়গার সাথে কারণে অকারণে সকলের গ্যাঞ্জাম হয়েছে, এবং হবে। কিন্তু এইসব তীর্থস্থান কোনদিনও বদলাবে না। বারেক মামা নাই। আমাদের জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য পাতায় ছলকে পরা লিকারের দাগ পরে গেলো হঠাৎ। একদম চিনি ছাড়া!

আমাদের এই টিএসসির প্রতিটি ইট সাক্ষ্য দেয় শত ইতিহাস, শত প্রেম আর শত স্লোগানের। এখানে এসে বহু সুখ-দুঃখকথা বহু গল্পগাঁথায় আটকে যায় জীবন। সেই হিসেবে সদা হাস্যোজ্জ্বল বারেক মামা ছিলেন ইতিহাসেরই এক কিংবদন্তী, একজন দ্রষ্টা, একজন রাজসাক্ষী।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close