বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতির এই যুগে বিভিন্ন অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চ্যাটিং কিংবা মোবাইলে টেক্সটিং/মেসেজিং আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। এতে আমাদের জীবন আগের থেকে অনেক বেশি সহজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি কিছু সমস্যাও আমাদের প্রায়ই মোকাবিলা করতে হয়।

কারণ সামনাসামনি, কিংবা ফোনে কথা বলার সময়ে দুজন ব্যক্তির মধ্যে একটি সরাসরি যোগাযোগ থাকে, যার মাধ্যমে তারা একে অপরের অভিব্যক্তি সম্পর্কে আঁচ করতে পারে। কিন্তু চ্যাটিং বা টেক্সটিংয়ে সেটি সম্ভব হয় না। ফলে চাইলেই যে কেউ মিথ্যা কথা বলে দিতে পারে। এবং অপরপ্রান্তে থাকা ব্যক্তিটি সেটি বুঝতেও পারে না। আবার অনেক সময় এমন হয় যে অপরপ্রান্তে থাকা ব্যক্তিটি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকে যে সে যা পড়ছে, তা সত্যি না মিথ্যা। আর এই ধরণের কনফিউশনের ফলে আজকাল প্রায়ই অনেক সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্কেও ভাঙন দেখা দিচ্ছে।

এই সমস্যার বাস্তবধর্মী সমাধান লাভের প্রয়াসে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অবস্থিত কর্নেল ইউনিভার্সিটি হতে একটি সায়েন্টিফিক রিসার্চ পেপার প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে চ্যাটিং বা টেক্সটিং এর সময় মিথ্যা বলার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষভেদে কি ধরণের বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।

এজন্য গবেষকরা প্রথমে একটি অ্যান্ডয়েড অ্যাপ ডেভেলপ করেছিলেন, যেখানে প্রচুর সংখ্যক মেসেজ কনভার্সেশন স্যাম্পল হিসেবে সংগ্রহ করা হয়েছিল। সাতদিনে গবেষকরা মোট ১,৭০৩টি কনভার্সেশন জোগাড় করেন। এরপর তারা কনভার্সেশনগুলোকে দুইটি ভাগে ভাগ করেন। এক ভাগে ছিল এমন কনভার্সেশন যাতে একটিও মিথ্যা কথা ব্যবহৃত হয়নি। এ ধরণের কনভার্সেশনের সংখ্যা ছিল ৩৫১। বাদ বাকি সব কনভার্সেশনেই কম বেশি মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হয়েছিল।

সত্য ও মিথ্যার ভিত্তিতে কনভার্সেশনগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করার পর, গবেষকরা প্রতি ধরণের মেসেজে গড়ে কয়টি করে শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা বের করেছেন। পাশাপাশি লিঙ্গভেদে, এবং ছাত্র ও অন্যান্যব পেশাজীবী ভেদে কি ধরণের ভিন্নতা দেখা যায় তাও বের করেছেন। এছাড়া মেসেজগুলোতে শতাংশের ভিত্তিতে কি পরিমাণে আত্মকেন্দ্রিক শব্দ (আমি, আমরা), পরকেন্দ্রিক শব্দ (তুমি, তোমরা, সে) আর সম্ভাবনাসূচক শব্দ (হয়ত, বোধহয়, সম্ভবত) থাকে তাও নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই সব ধরণের গাণিতিক হিসাব নিকাশের মাধ্যমে গবেষকরা বেশ কিছু চমকপ্রদ সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এর মধ্যে প্রধান যেটি তা হলোঃ একটি মেসেজের বক্তব্য যদি সত্য হয়, তবে তাতে যে সংখ্যক শব্দ ব্যবহৃত হয়, তারচেয়ে মিথ্যা কথা বলতে একটি মেসেজে অপেক্ষাকৃত বেশি সংখ্যক শব্দ ব্যবহৃত হয়। গড়ে, একটি সত্যবাদী মেসেজে শব্দ থাকে ৭টি, আর একটি মিথ্যাবাদী মেসেজে শব্দ থাকে ৮টি।

তবে এটি নিছকই গড়পড়তা হিসাব। লিঙ্গভেদে আরও কিছু পার্থক্য দেখা যায়। গবেষকরা দেখেছেন, নারীরা সাধারণত পুরুষদের থেকে লম্বা ও বড় মেসেজ লিখে থাকে। তাদের একটি স্বাভাবিক মেসেজেই গড়ে ৮টি শব্দ থাকে। কিন্তু সেই মেসেজে যদি কোন মিথ্যা কথা বলতে হয়, তাহলে তারা একটি বেশি শব্দ ব্যবহার করে থাকে। তাই কোন নারী যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি শব্দ ব্যবহার করে মেসেজ লেখে, তাহলে সেখানে জোর সম্ভাবনা রয়েছে যে সে মিথ্যা কথা বলছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পুরুষদের ক্ষেত্রে সত্য ও মিথ্যাভেদে এ ধরণের কোন ফারাক চোখে পড়ে না। তারা সত্য কথা বললেও একটি মেসেজে গড়ে ৭টি শব্দ লিখে থাকে, এবং মিথ্যা কথা বললেও সমসংখ্যক শব্দই লিখে থাকে। আর তার ফলে একজন পুরুষ সত্য বলছে না মিথ্যা বলছে, তা ধরতে পারা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে।

গবেষকরা আরও উদঘাটন করেছেন যে, মিথ্যা কথা লেখার সময় সাধারণত আত্মকেন্দ্রিক সর্বনাম (আমি, আমরা) এর ব্যবহার বেড়ে যায়। এর একটি কারণ হতে পারে, মিথ্যা কথা লেখার সময় মানুষের মধ্যে নিজের অজান্তেই নিজেকে ডিফেন্ড করা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের একটি প্রবণতা চলে আসে। আর সেই প্রবণতা থেকেই তারা বারবার ‘আমি’ বা আমরা’-সূচক সর্বনাম ব্যবহার করতে থাকে।

তবে সর্বনাম ব্যবহারের এই হিসাবটিও সামগ্রিক। শুধু যদি নারীদের কথা বিবেচনা করা হয়, তাহলে আবার চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। গবেষকরা বলছেন, নারীরা সাধারণভাবেই আত্মকেন্দ্রিক সর্বনাম বেশি পরিমাণে ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু যখন তারা মিথ্যা কথা লিখতে যান, তখন তারা আত্মকেন্দ্রিক সর্বনামের বদলে পরকেন্দ্রিক সর্বনাম বেশি ব্যবহার করেন। এর একটি কারণ হলোঃ নারীরা যখন মিথ্যা কথা লেখে, তখন তারা শুধু আত্মপক্ষ সমর্থনই করে না, পাশাপাশি অন্য কারও ওপর দোষ চাপানোরও চেষ্টা করতে থাকে। আর সে কারণেই মিথ্যা বলার সময় তারা ‘তুমি’, ‘তোমরা’, ‘সে’, ‘তারা’-জাতীয় শব্দ তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যবহার করে থাকে।

আরও একটি মজার ব্যাপার হলো, যখন কেউ একজন মিথ্যা কথা লেখে, তখন নিশ্চয়তাসূচক শব্দের (অবশ্যই, নির্দ্বিধায়, নিঃসন্দেহে) চেয়ে সম্ভাবনাসূচক শব্দ বা শব্দগুচ্ছ (হয়তো, হতে পারে, চেষ্টা করে দেখব) বেশি ব্যবহার করে থাকে। তবে এখানেও নারী ও পুরুষে উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা বিদ্যমান। একজন পুরুষ যত সহজে নিশ্চয়তাসূচক শব্দ ব্যবহার করে ফেলে, একজন নারী তা কখনোই করে না। এমনকি যে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত, সেখানেও তারা আগে থেকে কোন প্রকার ‘কমিটমেন্ট’ প্রদর্শন করতে চায় না, আর তাই প্রয়োজনে হোক বা অপ্রয়োজনে – তারা সম্ভাবনাসূচক শব্দই বেশি ব্যবহার করে।

ডেইলিমেইল অবলম্বনে

Comments
Spread the love