ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ঘূর্ণিঝড়ের সময় এদেরকে উপকূলে বেঁধে রাখা যায় না?

দুই-তিন ধরে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ঢাকা শহরে এক ধরণের শিথিলতা এসেছে আবহাওয়ায়। তীব্র তাপদাহ কমে গিয়ে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিপাত, সাথে হিম হাওয়া বইছে। এবারের ঘূর্ণিঝড়ের নাম তিতলি। ঘূর্ণিঝড় আসছে এই খবরের পর উপকূলীয় এলাকায় মানুষরা অস্থিরতায় আছেন ভীষণভাবে। প্রতি বছরই যখন এসব প্রাকৃতিক দূর্যোগময় অবস্থার সৃষ্টি হয়, তখন তারাই হন সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। প্রত্যেকবার একেকটা ঘূর্ণিঝড় আসে, সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ঝড়ে, বাড়িঘর সব ভেঙ্গে পড়ে। তারপর এই মানুষগুলা যখন আবার গুছিয়ে উঠার চেষ্টা করেন, একটু একটু করে ভাঙ্গা বাড়ি ঠিক করেন তখন আবারো পড়তে হয় তাদের ঘূর্ণিঝড়ের কবলে, নাহয় অন্য কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগে।

কিন্তু, এবার সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। গিয়েছিলাম সুনামগঞ্জে। নেটওয়ার্কের বাইরে, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ক’টা দিন দূরে ছিলাম। ঢাকায় এসে যখন পত্রিকা হাতে নিলাম, ফেসবুকে প্রবেশ করলাম, সব কিছু কেমন অচেনা লাগছিল। বুঝতে পারছিলাম না এখন কী হচ্ছে। দেখলাম কিছু কিছু মানুষ ব্যাপক উৎসবের মেজাজে আছে। কারণটা কি? কারণ ঘূর্ণিঝড় আসছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘূর্ণিঝড় নিয়ে ট্রল দেখে বোকা হয়ে গেলাম। মানুষ এত খুশি কেন? এটা কি আসলেই প্রাকৃতিক দূর্যোগ নাকি আসন্ন কোনো উৎসব? সবচেয়ে বেশি ট্রল হয়েছে ঘূর্ণিঝড়ের নাম নিয়ে। এবারের ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘তিতলি’। ঘূর্ণিঝড়ের নাম তিতলি কেন, এটা যেন বিরাট গবেষণার বিষয়। এটা নিয়ে দেদারসে হাসাহাসি হচ্ছে ফেসবুকে। কেউ কেউ বলছেন, মেয়েরা ঘূর্ণিঝড়ের মতো, তাই ঘূর্ণিঝড়ের নাম সব সময় মেয়েদের নামে হয়।

তিতলি, ঘূর্ণিঝড় তিতলি

ফেসবুক এখন এসব আনকালচার্ড লোকজনে ভরে গেছে। এরা যেকোনো বিষয় নিয়ে নিজের সর্বোচ্চ ক্রিয়েটিভিটি দেখিয়ে ট্রল করতে পছন্দ করেন। কয়েকটা লাইকের আশায় নিজের যাবতীয় হীনমন্যতা, মূর্খতা প্রকাশ করেন সবার সামনে। চার দেয়ালের নিরাপদ আবাসে বসে ঘূর্ণিঝড় নিয়ে তারা এরকম হাসাহাসি করবেন, ট্রল করবেন এটাই তো স্বাভাবিক। এর চেয়ে বেশি আর কি আশা করা যায়?

এগুলো করে তারা কি মজা পান কে জানে। চার নাম্বার সতর্ক সংকেতের মধ্যে, বাড়ি উড়িয়ে নেয়া শোঁ শোঁ বাতাস আর প্রবল বৃষ্টিপাতের মধ্যে একবার তাদের উপকূলীয় এলাকায় ছেড়ে দিলে বোঝা যেত তাদের কত তেল। এই শহরের এক চিপায় বসে হাতে একটা স্মার্টফোন নিয়ে নিজের সর্বোচ্চ ক্ষেতন্যাস প্রমাণ করার মধ্যেই যেন তাদের যাবতীয় স্মার্টনেস। তারা কি করে বুঝবেন ঘর হারানো মানুষের বেদনা? তারা কি করে জানবেন সহায় সম্বল হারানো মানুষের হাহাকার? এই ঘরের কোনায় বসে তারা কি করে অনুধাবন করবেন ঘূর্ণিঝড়ের সময় কিভাবে সেই মানুষগুলর একেকটা মুহূর্ত হয়ে যায় এক এক যুগ?

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া আছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের সোশ্যাল ভ্যালুজগুলো দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই শহর আমাদের জগতটাকে ছোট করে দিয়েছে। ঢাকার বাইরের জগতটা, সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা কতটা কঠিন এগুলো সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই। আমরা তাদের ক্ষ্যাত বলি, উত্তরবঙ্গের মঙ্গাপীড়িত অঞ্চলের লোকদের মফিজ বলি কিন্তু আমরা জানিই না আমরাই সবচেয়ে বড় মফিজ, আমরাই আসলে ক্ষ্যাত। আমরাই মূর্খ, শিক্ষা থাকলেই কি সবাই শিক্ষিত, স্মার্টফোন থাকলেই কি সবাই স্মার্ট, ট্রল বানাতে পারলেই কি সবাই ক্রিয়েটিভ?

আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় যে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল বিগত দশ বছরে, তার নাম সিডর। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর এই ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ধবংস হয়ে যাওয়া উপকূলীয় অঞ্চলে এখনো স্বাভাবিকতা আসেনি পুরোপুরিভাবে। এখনো তারা সেই আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সাড়ে তিনহাজার মানুষ মারা গিয়েছিল সেবার। কি অসহায় অবর্ণনীয় পরিস্থিতি হয়েছিল বলার মতো না। ঢাকায় থেকেই সেবার সেই ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াল রুপের খানিক ছোঁয়া পাওয়া গিয়েছিল। যারা মনে করতে পারেন, তাদের নিশ্চয়ই মনে থাকবে। সুন্দরবনের দুবলার চরের দুলাল ফরাজি বিবিসির কাছে সেই অনুভূতির কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন, “সেদিন রাত নটা বা দশটার দিকে সিডর আঘাত হানছিল। তখন মনে হচ্ছিল যেন আজই পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে। আমি একটা গাছের সাথে নিজেকে শক্ত করে বেঁধে রেখেছিলাম।”

ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার তিনদিন পর তিনি ফিরে যান তার ভিটেবাড়িতে৷ সেখানে গিয়ে অবশিষ্ট ছিল না কিছুই, এমনকি দুইটা ছেলেও। তারা মারা যায় সিডরের প্রলয় আঘাতে।

এটা কেবল একজন দুলাল ফরাজির গল্প না, হাজার হাজার মানুষের গল্প যারা সিডরে মা, বাবা কিংবা সন্তান হারিয়েছেন। হারিয়েছেন ভিটেবাড়ি, বাড়িঘর, বাড়িতে পেলেপুষে বড় করা গরু, বাছুর। এখনো সেই ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেননি, সেবার যারা স্বাক্ষী হয়েছিলেন সেই প্রলয়ঘন্টার।

তাই ঘূর্ণিঝড়কে তারা ভয় পান, ভীষণ ভয়। যখনই আবহাওয়া অফিস থেকে বার্তা আসে, সতর্ক সংকেত আসে তারা উৎকণ্ঠায় থাকেন, তারা জানেন না, এবারের ঘূর্ণিঝড়ে তারা কি সারভাইব করতে পারবেন কি না?

আমাদের কাছে ঘূর্ণিঝড়ের নামটা হাসির, ট্রলের বিষয়, কিন্তু তাদের কাছে এটা এক আতঙ্কের নাম। তারা ভাবেন না, গবেষণার সময় পান না ঘূর্ণিঝড়ের নাম তিতলি কেন। তারা জানেন না, শহরের কিছু ‘শিক্ষিত’ লোক তাদের উপর আঘাত হানতে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের নাম নিয়ে ট্রল করে যাচ্ছে। সেই ‘শিক্ষিত’দের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই কি হতে যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে, কেমন কাটবে উপকূলীয় মানুষের জীবন।

যারা খুব ট্রল করছেন তারা শুনে নিশ্চয়ই ‘খুশি’ হবেন ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে শাহপরীর দ্বীপে ৫০টিরও বেশি বসতবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। ৫০ সংখ্যাটা কম মনে হতে পারে, কারণ যারা ট্রল করে তাদের তো আবার গণ্ডারের মতো মোটা চামড়া। হাজার হাজার লাশ না পড়লে, হাজার হাজার মানুষ বিপদে না পড়লে তাদের টনক নড়ে না, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয় না।

যারা ট্রল করছেন, সেইসব ‘শিক্ষিত’ ‘ক্রিয়েটিভ’দের বলি, এই ঘূর্ণিঝড়ের নাম আপনার মতো ছ্যাকা খাওয়া, কোনো মেয়ের প্রতি বিরক্ত, অনুরক্ত কারো দেয়া না। আপনি জীবনে কিছু করতে পারেননি, কোনো নারীর প্রতি আপনার সম্মান নেই, সব নারীকে আপনার ঘূর্ণিঝড়ের মতো মনে হয়, আপনি জীবনভর নারীদের কাছে বঞ্চনার শিকার বলে হা হুতাশ করে বেড়াচ্ছেন, আপনি লাইফলেস লোক- সব ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে আপনার খুশি হওয়ার কোনো কারণ নেই। আপনি ভেবে বসবেন না, আপনার হীনমন্যতাকে কেউ বুঝতে পেরে, আপনার পুরুষালি অনুভূতির প্রতি কেউ সহানুভূতি দেখিয়ে এই ঘূর্ণিঝড়গুলোর নাম দেয়।

ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের লোকজন গত কয়েকশো বছর ধরে আটলান্টিক মহাসাগর এলাকা থেকে উৎপত্তি হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের নাম দিয়ে আসছে। প্রথমদিকে নিজেদের অঞ্চলের নামে নামকরণ হতো ঘূর্ণিঝড়গুলোর। পরে ১৯৪৫ সাল থেকে শুরু হয় ঝড়ের আনুষ্ঠানিক নামকরণ। মূলত, বর্তমানে ঝড়ের নামকরণের ক্ষেত্রে প্রত্যেক দেশের পাঠানো নামের তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে নামকরণ করা হয়। বিভিন্ন দেশের প্রস্তাবিত নামের তালিকা থেকে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যানেল নামকরণ চূড়ান্ত করে থাকে।

আমাদের এই অঞ্চলের জন্যেও নামকরণের প্যানেল আছে। উপমহাদেশ কিংবা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আট দেশ বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং থাইল্যান্ড থেকে আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নাম প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবিত নাম নিয়ে ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের বৈঠকে ৬৪টা নাম চূড়ান্ত করা হয়। তারপর সেখান থেকেই পর্যায়ক্রমে নামকরণ করা হয় এই অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়গুলোর।

তাই, যাদের তিতলি নাম শুনেই অরগাজম হয়ে যাচ্ছে, মনে পড়ে যাচ্ছে আজ রবিবার নাটকের তিতলি চরিত্রের কথা, যাদের এই ঘূর্ণিঝড়কে নারী ভেবে কাল্পনিক সুখ পেতে ইচ্ছে হয়েছে তারা এবার সামলান নিজেকে। এত হীনমন্যতা কোত্থেকে আসে আপনাদের! নিজেদের ক্রিয়েটিভিটি একটু অন্য জায়গায় কাজে লাগান। চিন্তাশক্তিগুলো একটু তাদের জন্যেও খরচ করেন, তাদের কথাও এবার একটু ভাবেন, যারা এই ঘূর্ণিঝড়গুলোতে অসহায় অবস্থায় কুঁকড়ে যান। যাদের প্রতিবারই জীবনটাকে শুন্য থেকে শুরু করতে হয়। কারণ, একেকটা ঘূর্ণিঝড় সারভাইভ করা তো একেকটা নতুন জীবন পাওয়াই!

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close