ওমানপ্রবাসী এক ভদ্রলোক— যিনি আমাদের মতো স্নাতক বা স্নাতকোত্তর নন, ডক্টর অব ফিলোসফি বা মাস্টার অব ফিলোসফি নন, যিনি ফেসবুকে আমাদের মতো দৈনিক তিনবেলা তিনটে বিপ্লব প্রসব করেন না, যিনি আমাদের কোনো ধরনের অনুভূতিকে আহত বা নিহত করেন না, যিনি আমাদের সাতেও বা পাঁচেও নেই, যিনি আমাদের মতো বিছানা-বিপ্লব না ঘটিয়ে কায়িক শ্রমে অর্জিত টাকা দেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছেন; তাকে আমরা ফেসবুক থেকে উৎখাত করেছি, এতে আমাদের বিরাট বিজয় অর্জিত হয়েছে।

ভদ্রলোকের আইডির নাম— আমি নোমান থাকি ওমান। ব্যস, এটুকুতেই আমরা মঙ্গলজয়ের পুলক বোধ করেছি, তার টাইমলাইনের সর্বশেষ পোস্টে যাচ্ছেতাই কমেন্ট করেছি, ব্যঙ্গবিদ্রূপে জর্জরিত করে তাকে ভারাক্রান্ত-ভীতসন্ত্রস্ত করেছি, হাজার-হাজার লাইক-শেয়ার দিয়ে তাকে ভড়কে দিয়েছি। তার ইনবক্সে উদ্ভট-উদ্ভট মেসেজ পাঠিয়ে আমরা আবার বীরদর্পে সেগুলোর স্ক্রিনশট বাজারজাত করে বাহুর পেশি ফুলিয়ে বীরত্ব দেখিয়েছি। ভদ্রলোকটি যেখানে কোনো পোস্টেই পনেরো-কুড়িটির বেশি লাইক বা চার-পাঁচটির বেশি কমেন্ট পেতে কিংবা কাউকে বিদ্রূপ করতে বা কারো দ্বারা বিদ্রূপের শিকার হতে অভ্যস্ত নন, সেখানে এক পোস্টে পাঁচ হাজার লাইক আর ইনবক্সে পিঁপড়ার দঙ্গলের মতো মেসেজ কিলবিল করতে দেখে হতচকিত হয়ে তিনি তার আইডিটি ডিঅ্যাক্টিভেট করতে বাধ্য হয়েছেন। আইডি ডিঅ্যাক্টিভেট করেই যে তিনি আমাদের থাবা থেকে রেহাই পেয়েছেন, তা নয়; এই মুহূর্তে ফেসবুকে শোভা পাচ্ছে ‘আমি নোমান থাকি ওমান’ নামে অজস্র ফেইক আইডি এবং একাধিক পেজ!

প্রাত্যহিক অমানবিক শ্রমের ফাঁকে যে ফেসবুক আইডিটি ছিল শ্রমিক নোমানের নিঃশ্বাস ফেলার বা দেশে অবস্থানরত স্বজনদের সাথে যোগাযোগের ছোট্ট একটি জানালা; শিস দিয়ে, সিটি বাজিয়ে, ঢিল মেরে, পাথর ছুড়ে তার সেই জানালাটা আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা একবারও ভাবলাম না যাকে এমন বড় মাত্রার বিদ্রূপ আমরা করছি, তা ধারণ করার ক্ষমতা আদৌ তার আছে কি না; দেখেই মজা নিয়ে আমরা যেখানে চুপ করে থাকতে পারতাম, সেখানে অহেতুক একটা ব্যাপারকে ভাইরাল করে আমরা একজনের ব্যক্তিজীবনকে ব্যাহত করলাম। এই আমরাই আবার বড়গলায় ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলি, প্রাইভেসি-রক্ষার কথা বলি, টিজিংয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই! আমাদের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু আছে বলে মনে হয় না। এক যুগ ফেসবুকিং করেও আমরা অদ্যাবধি জানলাম না কোন জিনিশটাকে ভাইরাল করা উচিত, আর কোনটাকে করা উচিত না! আমাদের জীবনে বিনোদনের এতই অভাব পড়েছে যে, এ রকম ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাপারেও ছ্যাবলামো করে আমাদের বিনোদন লুটতে হয়!

যে জাতি রাস্তায় কাউকে পড়ে গিয়ে আহত হতে দেখলে সোল্লাসে তালি দেয়, শ্রমিকদেরকে রাস্তা খুঁড়তে দেখলে পঞ্চাশ জন একযোগে দাঁড়িয়ে গিয়ে খৌঁড়কর্ম দ্যাখে, ঘুমন্ত বেড়ালের মাথা ইট দিয়ে ছেঁচে দেয়, কুকুরের গায়ে গরম তেল ঢেলে সর্বাঙ্গ ঝলসে দেয়, জ্বলন্ত সিগ্রেটের পরিত্যক্ত পাছা ‘পাগল’-এর গায়ে ছুড়ে মারে; সে জাতি ‘আমি নোমান থাকি ওমান’ নামক ফেসবুক আইডি দেখেই গূহ্যদ্বার ঊর্ধ্বমুখী করে নাঙ্গা নাচ নাচবে, এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই।

Comments
Spread the love