এপিডার্মোডিসপ্লাশিয়া ভেরুসিফরমিস বিরলতম জেনেটিক রোগগুলোর মধ্যে একটা। আবুল বাজনদার নামের ব্যাক্তি- যিনি ট্রি ম্যান বা বৃক্ষমানব নামেই বেশি পরিচিতি পেয়েছেন, তার কল্যানে আমরা প্রায় সবাই এই রোগটি সম্পর্কে শুনেছি। জেনেটিক রোগগুলোর মধ্যে এটি অটোসোমাল রিসেসিভ সাব টাইপের মধ্যে পড়ে। বংশগতিবিদ্যার মেন্ডেলিয়ান থিয়োরি অনুযায়ী রিসেসিভ (ডমিন্যান্ট নয়, এমন) জিনের ত্রুটির কারনে যেসব জেনেটিক রোগ হয়, সেগুলো শুধুমাত্র তখনই সন্তানের মধ্যে হবে যখন বাবা ও মা দুজনেই জিনটির বাহক হবেন; এবং সেই সাথে সন্তানের এলিলের দুইটি জিনই আক্রান্ত জিন হবে। অর্থাৎ, বাবা ও মা, দুজনেই এই রোগের জিন এর বাহক হলেই শুধু সন্তানের এ রোগ হতে পারে। তবে বাহক বাবা ও মায়ের সব সন্তানই এ রোগে ভুগবে না, বাহক যুগলের যে কোন সন্তানের রোগটিতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা শতকরা পচিশ ভাগ। নিচের ছবিটিতে রিসেসিভ ইনহেরিটেনস এর একটা ইলাস্ট্রেশন দেয়া হলো বোঝার সুবিধার জন্য-

কি ঘটে আসলে এই রোগে? জেনেটিক রোগ হলেও এই রোগের আসল কালপ্রিট হলো হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচ পি ভি)। এই ভাইরাসে আক্রান্ত স্থানে ছোটখাট আচিল তৈরি হয়। এমনিতে প্রায় শতকরা আশিভাগ মানুষের দেহেই এই জীবানু থাকলেও ট্রি ম্যান ইলনেসে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের ক্ষেত্রে জীবানুটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যাবস্থা থাকে না। মানুষের দেহে সতের নম্বর ক্রোমোজোমের সাথে ইভিইআর ১ এবং ইভিইআর ২ নামের দুটি জিন থাকে। ভাইরাল প্রোটিনের জন্যে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান জিংক, যা ভাইরাস আমাদের দেহের কোষের নিউক্লিয়াস থেকে গ্রহন করে। উপরোক্ত জিন দুটি ভাইরাল প্রোটিনকে আমাদের কোষের জিংক ব্যাবহার করা থেকে ঠেকায়, ফলে ভাইরাস তেমন বড় মাত্রার ইনফেকশন তৈরি করতে পারে না। কিন্তু এপিডার্মোডিসপ্লাশিয়া ভেরুসিফরমিস এ আক্রান্তদের  জিনদুটি মিউটেশনের ফলে নিষ্ক্রিয় থাকে বলে ভাইরাস দেহের রিসোর্স ব্যবহার করে পরিপুষ্ট হতে এবং সংখ্যাবৃদ্ধি করতে থাকে। ফলে অনিয়ন্ত্রিত রকম এইচ পি ভি ইনফেকশনে  আক্রান্ত স্থানগুলোতে আইশের মত আচিল গজাতে থাকে। এটি সাধারনত হাত ও পায়ে বেশি হয় এবং অসংখ্য আচিল একের উপর এক হতে থাকায় দেখতে গাছের মত দেখায়।

এখন পর্যন্ত এরকম দুইশ এর বেশি কেইস লিপিবদ্ধ হয়েছে। বিরল এই রোগের ব্যাপারে বিস্তারিত গবেষনা এখনো সম্ভব হয় নি বলে চিকিৎসার ব্যাপারেও খুব বেশি অগ্রসর হওয়া যায় নি। প্রাথমিকভাবে যে মেডিসিনগুলোর কার্যকারিতা পাওয়া গেছে সেগুলো হলো এসিট্রেটিন, সিমেটিডিন, ক্যালসিট্রিয়োল ইত্যাদি। ইন্টারফেরন এবং সেই সাথে রেটিনয়েডস ব্যাবহার করেও সুফল পাওয়া গেছে। কসমেটিক ইম্প্রোভমেন্ট আর স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্যে হাত ও পায়ের এক্সিশনাল এন্ড রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি একমাত্র উপায়। হাই প্রোফাইল কেইস গুলোর মধ্যে আমাদের আবুল বাজনদার একজন, সম্প্রতি সালমা নামের আরেকটি আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে। ইয়োন টোডার নামের একজন রোমানিয়ান নাগরিক ২০০৭ সালে রোগ নির্ণীত হন এবং ২০১৩ সালে তার অস্ত্রোপচার করা হয়। এখন পর্যন্ত ছোট দু একটি পুনরাবৃত্তি ছাড়া তিনি মোটামুটি সুস্থ আছেন। ইন্দোনেশিয়ার একজন রোগী ২০০৭ সালেই নির্ণীত হন এবং তাকে তিনটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মোটামুটি আচিলমুক্ত করা সম্ভব হয়। কিন্তু বারবার সেগুলো ফিরে আসতে থাকায় তিনি এক পর্যায়ে চিকিৎসা নিতে অসম্মতি জানান এবং নানাবিধ জটিলতায় ভুগে মারা যান। ২০১৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবুল বাজনদারের চিকিৎসা শুরু হয়। প্রায় এক বছর ধরে মেডিক্যাল এবং সার্জিক্যাল  চিকিৎসার পর তিনি এখন অনেকটাই সুস্থ। বিশেষ করে রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারিগুলোর সাফল্যের কারনে তার কসমেটিক কন্ডিশন এখন প্রায় স্বাভাবিক। তবে রোগটি খুবই বেশিমাত্রায় রিকারিং বা পুনরাবৃত্তিমুলক বলে তার আচিলগুলো আবার ফিরে আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। তাছাড়া রোগটির সাথে স্কিন ক্যানসারের ঝুকি অনেক বেশি, তাই এই ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে হবে এবং নিয়মিত মনিটরিং চলতে হবে।

আপাতত আবুল বাজনদার তার পরিবারের সাথে স্বাভাবিক সময় কাটাচ্ছেন। তার চিকিৎসক তাকে চাষাবাদ ও ঘর তৈরির জন্যে ছয় লক্ষ টাকা দিয়েছেন। যদিও পত্রিকাগুলো এই কথাটা সযত্নে এড়িয়ে গেছে। কেন, সেটা আন্দাজ করা সোজা। তবে যদি এবং যখন তার রোগটি আবার ফিরে আসে, তখন পচিশটা চ্যানেল আর  ত্রিশটি পত্রিকা একযোগে প্রচার করতে ভুল করবে না যে তার ভুল চিকিৎসা হয়েছে। স্রষ্টা সহায় হোন, এমন কি এরকম শিরোনামও দেখতে হতে পারে, “ভুল চিকিৎসার শিকার বাজনদার, সামান্য নখের ইনফেকশন সারাতে গিয়ে রোগীর ক্যানসার বাধিয়ে দিলেন বিশেষজ্ঞ!” অতীতে বহুবার তাই হয়েছে।

ছবি কৃতজ্ঞতা- বিডিনিউজ২৪.কম  

Comments
Spread the love