ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

যারা ট্যুরে যেতে চাইলে কেউ আটকাতে পারে না…

উদ্যোগটা শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। ছিলেন মাত্র দুইজন। ঢাকা মেডিক্যাল থেকেই পাশ করে বেড়িয়েছেন সাকিয়া হক এবং মানসি সাহা। এই দুই বান্ধবী মিলে শুরু করেন সাধারণ এক গ্রুপ, Travelettes of Bangladesh (ভ্রমণকন্যা)। এই গ্রুপের বিশেষত্ব হলো, এটা নারীদের ভ্রমণ গ্রুপ। ধীরে ধীরে এই গ্রুপ বড় হতে থাকে। এখন এই গ্রুপে আছেন প্রায় ২৫ হাজারেরও বেশি ভ্রমণকন্যা।

দেশে এখন ভ্রমণের অনেক গ্রুপ আছে অনলাইনে,অফলাইনে। তবে ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ বেশ ব্যতিক্রম। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এমন উদ্যোগ নারীদের জন্য বেশ আশাব্যঞ্জক। কারণ, দেখা যায় একটা মেয়ে যখন ঘুরতে যেতে চায়, দেখতে চায় কি আছে এই দেশের আনাচে-কানাচে, কত সৌন্দর্য নিয়ে প্রকৃতি অপরূপ মহিমায় অপেক্ষা করে আছে- তখনই সে বাধার মুখে পড়ে। পরিবার থেকে শুরু সমাজ সবাই ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। একলা একটা মেয়েকে অনুমতি এমনিতেই দিতে চান না পরিবার, তার উপর গ্রুপট্যুরে গেলে হাজারটা প্রশ্ন, ছেলে আছে কিনা, তারা কারা, নিরাপত্তার কি ব্যবস্থা। আর সমাজের বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন কানকথা তো থাকেই। আমাদের সামাজিক কাঠামোতে এই সমস্যাগুলো খুব প্রকট।

সাকিয়া হকরা বুঝতে পেরেছিলেন এই সমস্যার গভীরতা। নারীদের নিয়ে দলবেঁধে ভ্রমণ শুরু করা, নিজের দেশটাকে জানা, কিছুটা সময় একান্তই নিজের মতো কাটানোর সুযোগ এসব কিছুই সম্ভব যদি নারীরা একত্রিত হয়। তিনি শুরু করলেন সেই গ্রুপ, এখন সেটা প্রতিনিয়ত বাড়ছেই। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার নারীরা এই গ্রুপটিতে যুক্ত হচ্ছেন। এই গ্রুপ থেকে আয়োজন করা হয় দলগত ভ্রমণ।

প্রায় ৪০ টির মতো গ্রুপ ট্যুরের আয়োজন করা হয়েছে এপর্যন্ত এই গ্রুপের মাধ্যমে। সামনে আরো ইভেন্ট আছে। এই অদ্ভুত সুন্দর আয়োজন এখন নারীদের মনে এই ভাবনাটা ছড়িয়ে দিতে পারছে যে, তার ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করলে সে একা না আর, এখন তার সাথে যাওয়ার মতো আরো অনেকেই আছেন। অনেকেই মিলে একেকটা ট্যুর আয়োজন করা ফেলা যাবে। কোনো ব্যাপারই না। নারীরা এখন আর নিজেকে বঞ্চিত ভাববে না, তারাও চাইলে যেকোনো সময় গ্রুপে পোষ্ট করে ট্রাভেলমেট খুঁজে প্ল্যান করে ফেলতে পারেন একটি নতুন ট্যুরের!

গ্রুপটি শুধু যে ঘুরাঘুরি করে মনের খোরাক জোগায় তা নয়, তারা মানুষের মনকে উন্নত করবার কাজও করে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তারা গ্রুপের মাধ্যমে নতুন একটি কার্যক্রম শুরু করেন। “নারীর চোখে বাংলাদেশ”। এই কার্যক্রমে দুইটা স্কুটিতে চড়ে চারজন নারী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে যান। তবে মূল উদ্দেশ্য আরো বৃহৎ। এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য হলো, দেশের বিভিন্ন জেলার স্কুল কলেজে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণসচেতনতা গড়ে তোলা। বাল্যবিবাহ, নারীর ক্ষমতায়ন, আত্মরক্ষা, খাদ্যের পুষ্টিগুণ বিচার করে খাবার খাওয়া, বয়ঃসন্ধিকালীন সচেতনতা নিয়ে তারা আলোচনা করেন।

প্রতি পর্বেই থাকে আত্মরক্ষার উপর একটা করে ওয়ার্কশপ। মেয়েদেরকে জানান তাদের জীবনকে তারা যতটা সীমাবদ্ধ ভাবে, আসলে তা নয়। মনের দুয়ার খুলে দিলেই নতুনকে জানার, নিজেকে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। এই স্কুটি ভ্রমণ কার্যক্রম অনেক জেলা পৌঁছে গেছে এখন। সবচেয়ে বড় কথা, যেখানে স্কুটি এমনিতে রাস্তায় কোনো নারীকে চালাতে দেখলে মানুষ হা করে তাকিয়ে থাকে, টিটকারি করে, সহজভাবে মেনে নিতে পারে না, সেখানে স্কুটি নিয়ে শহরের বাইরের জেলায় ট্যুর দেয়া এবং মানুষকে শেখানো বড় সাহসের ব্যাপার! নারীর চোখে এভাবে সারা বাংলাদেশের নারীরা স্বপ্নবাজ হতে শিখবে একদিন, সেই স্বপ্ন দেখতে দেখতেই ছুটে চলছে স্কুটির চাকা।

ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশের ভ্রমণগুলো বেশ ইন্টেরেস্টিং হয়। একসাথে এক একটা ট্যুরে ৪০/৫০ জন নারী যাওয়া হচ্ছে। কখনো ছোট গ্রুপে যাওয়া হচ্ছে আবার কখনো ১০০ জন মিলেও ট্যুর হয়! প্রত্যেকটা ট্যুরের থাকে আলাদা গল্প। গত সেপ্টেম্বরেই আড়িয়াল বিল, পদ্মা রিসোর্টে গিয়েছিলেন ১০০ জন নারী! এত বড় ট্যুর প্রায় কোনো ঝামেলা ছাড়াই সমাপ্ত করা গেছে। এই ট্যুরের গল্প নিয়ে নারীরাই আবার লেখেন গ্রুপের ওয়ালে, আছে নিজেদের ম্যাগাজিন ভ্রমণকন্যা! শুধু নারীরাই লিখেন এই ম্যাগাজিনে, নারীদের গল্প, ভ্রমণের গল্প।

দেশকে তুলে ধরতে, দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা সৌন্দর্য তুলে ধরতে ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ গত বছর শিল্পকলায় তিনদিনব্যাপী ফটো এক্সিবিশন করেছিল। এবং গত বছরের শেষে ‘ভ্রমণকন্যার আত্মপ্রকাশ’ নামে একটি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ শিশু একাডেমীতে। এ বছরও সেই আয়োজন আবারও হতে যাচ্ছে নভেম্বরে। এই উপলক্ষ্যে যে কারো তোলা ছবি, নারীদের লেখা নিচ্ছেন তারা। দেশের দূর্যোগেও তারা নিজেদের প্রচেষ্টায় উদ্যোগ নিয়ে কিছু করার চেষ্টা করেন। বণ্যাদূর্গতদের সাহায্য করা, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া এই উদ্যোগগুলোও তারা নিয়ে থাকেন।

নারীরা এখন আর গৃহে বন্দী থেকে ভাবেন না, ভ্রমণ তাদের জন্য নয়। তারাও চাইলে পারেন। নারীর লালিত স্বপ্ন, অদেখা দেখবার ইচ্ছাগুলোকে পূর্ণতা দিতেই সকল ভ্রমণকন্যার ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম এই ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ! ভ্রমণ বিলাসিতা নয়, অপরাধ নয়, নারীদের জন্যেও ভ্রমণ একটা অধিকার! নারীরা দুই হাত মেলে পাহাড়ের চূড়ায় নিজের পায়ের ছাপ রেখে আসুক, সমুদ্রের বালুকাময় পথে নিজের পা ভিজিয়ে আসুক, পাখির মতো মুক্ত আকাশে ভাসুক নারীদের স্বপ্ন!

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close