হিটলারের নাম কারোরই অজানা নয়। কিন্তু তার পাশাপাশি এই এশীয় মহাদেশের আরেক খলনায়ক তার নিষ্ঠুরতার জন্য এশিয়ার হিটলার নামে পরিচিত। নাম তার হিদেকি তোজো

তোজো ১৮৮৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর টোকিওর কোজিমাসিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা তৎকালীন জাপানী সম্রাটের একজন লেফটেন্যান্ট ও তার মা একজন বৌদ্ধ পুরোহিতের কণ্যা ছিলেন। তোজোর আদি পুরুষগণ ছিলেন সামুরাই যোদ্ধা। তৎকালীন সময়ে জাপানী সাম্রাজ্য সামুরাই, কৃষক, কারিগর ও বণিক এই ৪টি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল । তাই ঐতিহ্যগত দিক থেকে হিদেকি তোজোর পরিবার বেশ সম্মানিত ছিল।

জাপানে শিক্ষা ব্যবস্থার অনেকটাই ছিল পুরুষদেরকে যোদ্ধা হিসেবে পরিণত করা, যা তোজোর ব্যক্তিজীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। তোজো বলতেন, “আমি প্রতিভাহীন কোন সাধারণ মানুষ নই। আমি যা কিছু অর্জন করেছি তা কঠোর শ্রমের মাধ্যমে, যা কখনোই ছেড়ে দেওয়া যাবে না।”

তোজো তার শিক্ষাজীবনের শুরুতে ভর্তি হয় আর্মির ক্যাডেট স্কুলে। এরপর কর্মজীবনের শুরুতে আর্মির লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯০৫ সালে পোর্ট সামাউথ চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ার সাথে জাপানের যুদ্ধের অবসানে তোজো অগ্রনী ভুমিকা পালন করে, যা অধিকাংশ জাপানীই মেনে নেয়নি এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের ভূমিকা জাপানীদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল সবসময়ই।

জাপানী সেনাবাহিনী সর্বদা জার্মান সেনাবাহিনীর দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ১৯১৮-১৯১৯ সালে তোজো রাশিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপের জন্য সাইবেরিয়াতে সেবার অংশ হিসেবে জাপানী সেনাবাহিনী প্রেরণ করে। এছাড়াও তোজোর মাধ্যমে জাপান-জামার্নী যুক্ত হয়ে একটি সর্বগ্রাসী ওয়েহার স্টেট (ডিফেন্স রাষ্ট্র বা সামরিক প্রতিরক্ষা রাষ্ট্র) গড়ে তুলতে চেয়েছিল। তোজো তার পারিবারিক ও কর্মজীবনে অতি উচ্চাভিলাসী ছিলেন। ১৯২৪ সালে তিনি জাপানী সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন ও সেনাবাহিনীর মান উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। এরপর ১৯৩৪ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন তিনি প্রধান জেনারেল, সেনাবাহিনী ও মন্ত্রীসভার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি ফ্যাসিবাদী, জাতীয়তাবাদী ও সামরিক ঘরানার শাসক ছিলেন। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্নতার কারণে তিনি সর্বদা রেজার (জাপানী কামসূরী) হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

১৯৩৬ এর পর তোজোর নেতৃত্বে জাপান চীনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। জুলাই ১৯৩৭-এ প্রথম অপারেশন চাহারের মাধ্যমে তিনি স্বাধীন মিক্সড ব্রিগেডের নেতৃত্ব দেন। ২য় চীন-জাপান যুদ্ধে মার্কো পোলো ব্রিজের ঘটনার প্রত্যক্ষ মদদদাতা ছিলেন তিনি। তোজো ১৯৪০ সালে জাপান সম্রাটের প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন। যার মাধ্যমে “গ্রেট ইস্ট এশিয়ান কো-প্রসপারিটি এসপিয়ার” এর অন্যতম একজন পরিকল্পনাকারী হিসেবে তোজো তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। এছাড়াও তিনি জাপান সম্রাট, নাজী জার্মানী এবং ফ্যাসিস্ট ইতালি ত্রি-পাক্ষিক চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন। তোজো মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন চীনের সাথে দ্বন্দ্ব কূটনৈতিক মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। আর আমেরিকার সাথে আপোষ হবে জাপানীদের দূর্বলতা। আর এভাবেই তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে জাপান ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে। তাইওয়ানে জাপানী সৈন্যরা ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ সহ নানা প্রকার ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও তৎকালীন সময়ে জাপান সম্রাট-সেনাবাহিনীর মধ্যে আত্মবিরোধীতা কাজ করে এবং ঐ সময়ের ঘটনার বিভিন্ন নথিপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এছাড়াও তোজো জাপান অস্ট্রেলিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন; অস্ট্রেলিয়ান নিউ গিনি; ব্রিটিশ ভারত (আধুনিক ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ); সিলন (আধুনিক শ্রীলংকা); নিউজিল্যান্ড; কানাডিয়ান প্রাদেশিক ব্রিটিশ কলাম্বিয়া এবং ইউকন টেরিটরি; আমেরিকান স্টেট ওয়াশিংটন এবং আলাস্কা ও হাওয়াই অঞ্চলের; ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, হন্ডুরাস, পানামা, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, নিকারাগুয়া, কোস্টারিকা, ব্রিটিশ হন্ডুরাস, কিউবা, জামাইকা, হাইতি এবং বাকি ওয়েস্ট ইন্ডিজ সহ চীন শাসিত জিংয়েইয়ের শাসনের অধীনের সমস্ত রাজ্য, পর্তুগাল থেকে ম্যাকাও এবং পূর্ব তিমুর এবং বার্মা, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, থাইল্যান্ড এবং মালায়ায় নতুন রাজ্য তৈরি করার পরিকল্পনা করেছিল!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা যখন জাপানী নৌবাহিনীকে প্রায় ধ্বংস করে তখন যুদ্ধে অক্ষমতার দায়ে তোজো জাপানী নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ওসামী নাগানোকে আগুনে নিক্ষেপ করেন। তিনি হিটলার এবং জোসেফ স্ট্যালিনের নীতিতে বিশ্বাসী থাকার সত্ত্বেও তিনি একটি স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন না। তিনি সম্রাটের নির্দেশেই দায়িত্ব পালন করতেন। 

১৯৪৫ সালে জাপানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর, মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাক আর্থার তোজোসহ চল্লিশ জন যুদ্ধাপরাধীর গ্রেফতারের আদেশ দেন। ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার সৈন্যদল তোজোর বাড়িতে ঘেরাও করতে গেলে তিনি একটি পিস্তল দিয়ে বুকের মধ্যে নিজে গুলি করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। তারপর তিনি সুস্থ হলে দুই জাপানী সাংবাদিক তার সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন। সাক্ষাতকারে তিনি বলেন,

“আমি খুবই দুঃখিত যে আমাকে মৃত্যু পর্যন্ত অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গ্রেট ইস্ট এশিয়ান কো-প্রসপারিটি এসপিয়ার ন্যায়সঙ্গত এবং ন্যায়নিষ্ঠ। জাতি ও সকলের জন্য আমি খুবই দুঃখিত বৃহত্তর এশিয়াটিক শক্তিগুলির ঘোড় দৌড়ে আমি পরাজিত। আমি ইতিহাসের ধার্মিক বিচারের জন্য অপেক্ষা করছি। আমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি…।”

তাকে আহত উদ্ধারের পর সুগুরা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্বের কর্মের জন্য আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালে তোজোকে বিচারের সম্মুখীন করা হয় এবং অন্যান্য আরও বিভিন্ন কারণে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। যার মধ্যে অন্যতম ছিল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধ; বিভিন্ন জাতির বিরুদ্ধে অসমর্থিত বা আক্রমনাত্মক যুদ্ধ; এবং যুদ্ধের বন্দীদের অমানবিক আচরণের আদেশ, অনুমোদন এবং অনুমতি প্রদান ইত্যাদি। ১৯৪৮ সালের ১২ নভেম্বর তোজোকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় এবং ১৯৪৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি জাপানের সামরিক বাহিনীর অত্যাচারের জন্য তার চূড়ান্ত বিবৃতিতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং জাপানী জনগণ দুটি পরমাণু বোমা হামলা সহ্য করেছে, তাই তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে অনুরোধ জানান।

– মো: এরফান রাশেদ,
জাপানীজ স্ট্যাডিজ বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

Comments
Spread the love