সিনেমা হলের গলি

থাগস অফ হিন্দুস্তান: সিনেমা, নাকি যন্ত্রণা?

মান্না’র ‘ধর’ সিনেমায় একটা ডায়লগ ছিল। ডিপজলের বিগবস মন্ত্রী, এইটা জানার পরে মান্নার প্রতিক্রিয়া ছিল- “ওস্তাদ, দেশের তো *য়ামারা সারা তাইলে!” থাগস অফ হিন্দুস্তান রিলিজের আগে আমির যখন বলেছিলেন, এই প্রথম কোন সিনেমার স্ক্রিপ্টের চাইতে ক্যারেক্টারটা তাকে বেশি আকর্ষণ করেছে, সেই ক্যারেক্টারের জন্যেই সে সিনেমাটা করছেন, তখনই বোঝা উচিত ছিল, সিনেমার *য়ামারা সেইখানেই সারা হয়ে গেছে। তবুও আমিরের সিনেমা বলে কথা, তার ওপর ওল্ড ওয়াইন অমিতাভ বচ্চন আছেন, এটা না দেখলে কি হয়? তাই ঝুঁকি নিয়ে দেখতে বসে গেলাম। আর ফলাফল? অশ্বডিম্ব চেনেন? সেই অশ্বডিম্ব।

বিটিভিতে এক কালে বাংলা সিনেমা দেখতাম। সেইসব সিনেমার কমন কিছু ফ্যাক্টরের একটা ছিল, নায়ককে ভিলেন আটকে রেখেছে কোন এক গুদামঘরে, নায়িকা এসে সেইখানে ঘাগরা-লেহেঙ্গা পরে নাচা শুরু করেছে গানের তালে তালে। বহু দিন বাদে সেই পুরনো নস্টালজিয়ায় ভোগার সৌভাগ্য আবার হলো থাগস অফ হিন্দুস্তানের কল্যানে। অমিতাভ বচ্চনকে ইংরেজরা গ্রেফতার করে আটকে রেখেছে, আর তাকে মুক্ত করতে এসে সেখানে ক্যাটরিনা-আমির-ফাতিমা সানা শেখ মিলে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে শুরু করেছেন তাণ্ডবনৃত্য! ইংরেজরা আবার সেটা উপভোগ করছে, সেইসঙ্গে অমিতাভ বচ্চনও! 

থাগস অফ হিন্দুস্তান, আমির খান, অমিতাভ বচ্চন, ক্যাটরিনা কাইফ, ঠগী, যশরাজ ফিল্মজ

আমির খানের বারোটা বাজানোর জন্যে বিজয়কৃষ্ণ আচার্য্যের মতো একটা ডিরেক্টরই যথেষ্ট। এতদিন ভাবতাম ‘ধুম-থ্রি’ বুঝি আমিরের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে কাজ, আজকের পর থেকে ধুম-থ্রি আমার কাছে মাস্টারপিস। স্ক্রীনপ্লে’র কোন বালাই নেই, স্টোরিটেলিং বলে যে একটা জিনিস থাকে, সেটা পরিচালক জানেই না বোধহয়। একটার পর একটা দৃশ্য শুধু জুড়ে দেয়া হয়েছে মনে হবে। এর মধ্যেও অমিতাভ বচ্চনের অভিনয় ভালো লেগেছে, তারচেয়ে অনেক বেশি ভালো লেগেছে তার ডায়লগ ডেলিভারি। একটা চিল/ঈগল/বাজপাখি আছে সিনেমায়, বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা রোলে। সে’ও বেশ ভালো অভিনয় করেছে। 

থাগস অফ হিন্দুস্তান, আমির খান, অমিতাভ বচ্চন, ক্যাটরিনা কাইফ, ঠগী, যশরাজ ফিল্মজ

ক্যামিও রোলে ক্যাটরিনা কাইফ শো-পিস হিসেবেই ছিল। স্বল্পবসনা হয়ে কোমর নাড়ানো ছাড়া তার আর কিছু করার ছিল না সিনেমায়, থাকলেও সে করতে পারতো বলে মনে হয় না। সিনেমায় ওই পাখির রোলও ক্যাটরিনার চাইতে বেশি ভাইটাল ছিল, টাইমিংও ছিল বেশি। ফাতিমা সানা শেখ কিছু জায়গায় বেশ ভালো, কয়েক জায়গায় বিরক্তিকর। জিশান আইয়ুবের মতো দারুণ অভিনেতার অতি অভিনয় দেখলাম প্রথমবার। অবশ্য যে সিনেমায় গল্প বলে কোন বস্তু নাই, সেইখানে অভিনয় দিয়ে কি হবে? আর আমির খানের অভিনয় নিয়ে বলবো- ‘কিছু কথা থাক না গোপন!’ 

থাগস অফ হিন্দুস্তান, আমির খান, অমিতাভ বচ্চন, ক্যাটরিনা কাইফ, ঠগী, যশরাজ ফিল্মজ

এমনিতেই বিশ্লেষকেরা দিনের শুরু থেকেই এই সিনেমা নিয়ে নিজেদের হতাশার কথা জানিয়েছিলেন। তবে বাকি সবাই এক দিকে, কামাল আর খান ওরফে কেআরকে একদিকে। এমনিতেই সিনেমার উল্টোপাল্টা রিভিউ দেয়ার ব্যাপারে তার সুনাম আছে। খারাপ সিনেমা হলে তো কথাই নেই, সেটাকে সার্ফএক্সেল দিয়ে ধুয়ে রোদে শুকাতে দেয়ার ব্যাপারে তার জুড়ি নেই। থাগসের রিভিউ দিতে গিয়ে তিনি বললেন, কাউকে ফ্রি টিকেট, ফ্রি কোল্ড ড্রিংকস, আর ফ্রি সমুচা দিয়েও এই সিনেমা দেখানো সম্ভব নয়! এরপরে আর কিছু বলার দরকার পড়েও না অবশ্য।

সম্রাট শাহজাহানের কথা উঠলে অবধারিতভাবেই তাজমহলের প্রসঙ্গ আসবে। কথিত আছে, তাজমহলের ডিজাইন যিনি করেছিলেন, তার হাত নাকি কেটে নিয়েছিলেন শাহজাহান, যাতে এরকম আরেকটা সৃষ্টি কখনও তৈরি করা না যায়। কামাল আর খানও দাবী জানিয়েছেন, থাগস অফ হিন্দুস্তানের মতো এমন অসাধারণ সৃষ্টির পরে পরিচালক বিজয়কৃষ্ণ আচার্য্যের দুই হাতও কেটে নেয়া দরকার, যাতে এমন কিছু বানানো সাহস তিনি আর না পান! এই দাবীর সঙ্গে ‘সহমত ভাই’ বলে একমত পোষণ করাই যায়! 

থাগস অফ হিন্দুস্তান, আমির খান, অমিতাভ বচ্চন, ক্যাটরিনা কাইফ, ঠগী, যশরাজ ফিল্মজ

পৌনে তিন ঘন্টার থাগস অফ হিন্দুস্তান এমনই একটা সিনেমা, যেখানে চাইলে কোটি কোটি ভুল ধরা যায়। এত ধৈর্য্য দুনিয়ার কোন বান্দার হবে না। এক বাক্যের রিভিউতে এটুকুই বলা যায়, ছাতার মাথা টাইপের একটা সিনেমা বানানো হয়েছে, এটাকে সিনেমা না বলে যন্ত্রণা বললেও ভুল হবে না।

কি ঘটছে, কেন ঘটছে, কোনকিছুর পেছনেই শক্ত কোন লজিক নেই। অতিরিক্ত টুইস্ট আনতে গিয়ে পুরো সিনেমাটাকে যাত্রাপালা বানানো হয়েছে শুধু। এই জিনিসকে তরন আদর্শ কিভাবে দুই স্টার দিলো বুঝলাম না। থাগসের মতো সিনেমাকে শূন্য দিলেও শূন্য আর আর্যভট্ট, দুইজনকেই অপমান করা হয়।

আরও পড়ুন- 

Comments

Tags

Related Articles