সিনেমা হলের গলি

থাগস অফ হিন্দুস্তান, নাকি বলিউডি পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান?

২০১৮ সালটা বলিউডপ্রেমীদের জন্যে দুর্দান্ত যাচ্ছে। বছরের প্রথম নয় মাস কেটে গেছে, এরমধ্যেই দারুণ কিছু সিনেমা নির্মিত হয়েছে। ভালো সিনেমাগুলো বক্স অফিসেও সাফল্য পাচ্ছে। আর সবচেয়ে ভালো ব্যাপার যেটা, গল্প বা কাহিনীনির্ভর সিনেমাগুলোকে দর্শক গ্রহণ করছে দারুণভাবে। আবার তারকানির্ভর উদ্ভট কাহিনীর সিনেমাকে ছুঁড়ে ফেলতেও তারা দ্বিধা করছে না একটুও। বলিউডে এখন পালাবদলের একটা স্রোত বইছে, সময়ের সাথে সাথে সেই স্রোতের জোর বাড়ছেই। 

২০১৮ সালের শুরুতে বলিউডের দর্শকদের কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হতো যে, এই বছরের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত সিনেমা কোনটা, সিংহভাগ মানুষই একবাক্যে ‘থাগস অফ হিন্দুস্তান’- এর নাম বলতেন। যশরাজ ফিল্মজের প্রযোজনায় আসছে দিওয়ালি উপলক্ষে ৮ই নভেম্বর মুক্তি পাবে সিনেমাটা। এই প্রথমবারের মতো একসঙ্গে সিলভার স্ক্রিন শেয়ার করছেন অমিতাভ বচ্চন এবং আমির খান। সঙ্গে আছেন ক্যাটরিনা কাইফ এবং ফাতিমা সানা শেখ। বিগ বাজেটের এই সিনেমা নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশার পাল্লা আকাশচুম্বী হওয়াটাই স্বাভাবিক। 

থাগস অফ হিন্দুস্তান, আমির খান, অমিতাভ বচ্চন, ক্যাটরিনা কাইফ, ঠগী, যশরাজ ফিল্মজ

গত কয়েক বছর ধরে আমির খানের সিনেমা মানেই বিশেষ কিছু। আগ্রহের পারদটা বাড়িয়ে দিচ্ছে সিনেমার বিষয়বস্তু। থাগস শব্দটার উৎপত্তি ঠগী থেকে। সতেরশো, আঠারোশো আর উনিশ শতকে এই ঠগীদের তৎপরতা ছিল ভারতবর্ষ জুড়ে। বিশেষ করে মধ্য ভারত আর বাঙলায় এদের দাপট ছিল বেশি। লোক ঠকানো, চুরি, ডাকাতি, জোচ্চুরি, এমন কোন কাজ ছিল না যেটা এরা করতো না। আমির খান এবার পর্দায় আসছেন সেই ঠগী সেজেই।

সিনেমার গল্প নেয়া হয়েছে ফিলিপ মেন্ডজ টেইলরের ১৮৩৯ সালে রচিত ‘কনফেশন অফ এ থাগ’ বইটা থেকে। ১৭৯০ থেকে ১৮০৫ সালের মধ্যবর্তী সময়কার গল্প বলা হবে থাগস অফ হিন্দুস্তানে। সিনেমায় আমিরের চরিত্রের নাম হচ্ছে ফিরিঙ্গি মাল্লার, নিজেকে যিনি ‘বাস্টার্ড’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন দর্শকদের সামনে। 

দুইদিন আগে মুক্তি পেয়েছে বিজয় কৃষ্ণ আচার্য্য পরিচালিত থাগস অফ হিন্দুস্তানের ট্রেলার। সেই ট্রেলার আবার মিশ্র প্রতিক্রিয়া কুড়িয়েছে। অনেকে যেমন ট্রেলার দেখে মুগ্ধ হয়েছেন, তেমনই অনেকে আবার এটাকে বিখ্যাত হলিউডি সিনেমা ‘পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান’- এর ভারতীয় সংস্করণ বলতেও দ্বিধা করছেন না। কেউ কেউ তো এককাঠি বাড়িয়ে থাগস অফ হিন্দুস্তানকে ‘গরীবের পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান; বলেও নাম দিয়েছেন! কানে দুল, লম্বা চুল, জাঁদরেলি গোঁফ; সব মিলিয়ে আমিরের গেটআপ যেন অদ্ভুত একটা প্যাকেজ! 

থাগস অফ হিন্দুস্তান, আমির খান, অমিতাভ বচ্চন, ক্যাটরিনা কাইফ, ঠগী, যশরাজ ফিল্মজ

ট্রেলারে যে সময়টা দেখানো হয়েছে, সেটা ১৭৯৫ সাল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতে এসেছিল ব্যবসা করতে, কিন্ত হরেক রকমের কূটকৌশলে এখানকার নবাব আর শাসকদের পরাজিত করে বিশাল এই অঞ্চলটা শাসন করতে শুরু করে তারা। শাসন না বলে বরং শোষণ বলাটাই ভালো হবে। সেই সময়ে আজাদ(অমিতাভ বচ্চন) নামের একজন ঠগী রুখে দাঁড়ালেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে, মুখোমুখি সংঘাত হলো দুইপক্ষের। ইংরেজদের মাথাব্যথার নাম হয়ে উঠলেন ঠগী আজাদ আর তার বাহিনী। কোনভাবেই যখন আজাদকে বাগে আনা যাচ্ছিল না, তখন ধুরন্ধর ইংরেজরা অন্য পথ ধরলো, তারা খুঁজতে শুরু করলো আজাদের মতোই একজন ধূর্ত ঠগীকে, কাঁটা দিয়ে যাতে কাঁটা তোলা যায়! 

ইংরেজদের চাহিদামতো তেমন একজনকে পাওয়া গেল। ফিরিঙ্গি মাল্লার, টাকার জন্যে যে কিনা নিজের মা’কে বিক্রি করে দিতেও দ্বিধা করে না! ইংরেজদের সঙ্গে পরামর্শ করে আজাদকে শায়েস্তা করার জন্যে তার বিশ্বস্ততা অর্জন করে আজাদের দলে ভিড়ে গেলেন ফিরিঙ্গি মাল্লার। এরপরে কি হবে? ফিরিঙ্গি মাল্লার কি আজাদকে শায়েস্তা করতে পারবে? নাকি আজাদের দলে ভিড়ে গিয়ে সে রুখে দাঁড়াবে ইংরেজদের বিপক্ষে? নিজেকে আধা ফিরিঙ্গি(ইংরেজ) দাবী করা ঠগী ফিরিঙ্গি মাল্লার কি ডাবল ক্রস করবে তার নিয়োগকারীদের বিপক্ষে? 

ট্রেলারে আজাদরূপী অমিতাভ বচ্চনকে দেখা গেছে যুদ্ধজাহাজ নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। পুরো ট্রেলারে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন সত্তরোর্ধ্ব এই ‘বৃদ্ধ’ মানুষটাই। তার গমগমে গলায় ছুঁড়ে দেয়া একেকটা ডায়লগ শুনলেও যেন গায়ে কাঁটা দেয়। আমিরের চরিত্রটার কয়েকটা আলাদা ফেজ আছে, সেটা ট্রেলার দেখেই বোঝা গেছে। ফাতিমা সানা শেখকে দেখা গেছে যোদ্ধানারীর চরিত্রে, তীর-ধনুক নিয়ে তার স্ট্যান্টও ছিল প্রশংসা করার মতো। সব মিলিয়ে বলিউডের পাল্লায় মাপলে থাগস অফ হিন্দুস্তানের সোয়া তিন মিনিটের ট্রেলারটা প্রশংসা পাবার যোগ্য। 

থাগস অফ হিন্দুস্তান, আমির খান, অমিতাভ বচ্চন, ক্যাটরিনা কাইফ, ঠগী, যশরাজ ফিল্মজ

কিন্ত প্রশ্ন উঠছেই। একটা হচ্ছে পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ানের সঙ্গে তুলনা। সাজসজ্জা বা যুদ্ধের দৃশ্যগুলোর সঙ্গে হলিউডি এই সিনেমাটার সাদৃশ্য আসলেই চোখে পড়ার মতো। সিনেমার গল্পটা উপমহাদেশীয় হলেও, উপস্থাপনের জন্যে হলিউডি একটা সিনেমার ছায়া কেন অবলম্বন করতে হলো, এই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছেন নেটিজেনরা। তার ওপরে অষ্টাদশ শতকের ঠগীদের বেশিরভাগই ছিলেন ডাঙার ডাকাত, তারা যুদ্ধজাহাজ কোথায় পেয়েছিলেন, এই প্রশ্নটাও এসেছে। এমনকি আমিরের ‘ফিরিঙ্গি মাল্লার’ চরিত্রটা নাকি পাইরেটস অফ দ্যা ক্যারিবিয়ানের জ্যাক স্প্যারো’র চরিত্রের আদলে বানানো- উঠেছে এমন অভিযোগও। তবে যেহেতু বিজয় কৃষ্ণ আচার্য্য পুরোপুরি সত্যি কোন ঘটনা অবলম্বনে সিনেমা বানাননি, বানিয়েছেন একটা বইয়ের আদলে, সেহেতু তিনি তার মতো করে গল্পটাকে সাজিয়েছেন, এবং সেই স্বাধীনতা তার আছে। 

কিছু অভিযোগ নাহয় আমরাও তুলি। ইতিহাস বলছে, ঠগীরা ছিল বর্বর ধরনের ডাকাত। মানুষজনের ধনসম্পদ লুট করে তাদের হত্যা করাটাই ছিল ঠগীদের কাজ। সিনেমায় সেই ঠগীদের কয়েকজনকে ইংরেজবিরোধী বানিয়ে বিশাল দেশপ্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে কিনা, এই প্রশ্নটা তোলাই যায়। ট্রেলার দেখে অমিতাভ বা ফাতিমা সানা শেখদের প্রত্যেককেই দেশপ্রেমিক যোদ্ধা বলেই মনে হয়েছে। আসলেই কি ঠগীরা এমন স্বাধীনতাকামী ছিল?

ইংরেজদের সঙ্গে ঠগীদের বনিবনা ছিল না, সেটার অন্যতম কারণ ছিল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতের ক্ষমতায় আরোহনের পরে ঠগীদের নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল, আর ঠগীরা ইংরেজদের বশ্যতা স্বীকার করতে চায়নি, এতে তাদের পেটে লাথি পড়তো। ঠগীদের ইংরেজবিরোধীতার পুরো কারণটাই ছিল অর্থনৈতিক, সেখানে দেশপ্রেম বা স্বাধীনতা টাইপের কোন কিছুই জড়িত ছিল না। এগুলো আমাদের মনগড়া কথা নয়, ইতিহাসের জ্বলন্ত প্রমাণ। 

থাগস অফ হিন্দুস্তান, আমির খান, অমিতাভ বচ্চন, ক্যাটরিনা কাইফ, ঠগী, যশরাজ ফিল্মজ

আরেকটা ব্যাপার নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, সেটা হচ্ছে ক্যাটরিনা কাইফের গেটাপ। অন্য অনেক সিনেমার মতো এখানেও তাকে ‘শো-পিস’ হিরোইন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রেলারে তার চরিত্রের কোন গভীরতাই খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাকে কেবল নাচতেই দেখা গেছে, তাও বিদঘুটে টাইপের ছোটখাটো পোষাকে। ক্যাটরিনার পোষাক নিয়ে আমাদের কোন আপত্তি নেই, কিন্ত ১৭৯৫ সালে উপমহাদেশের নর্তকীরা এসব পোষাক পরতেন কিনা, এই প্রশ্নটা জিভের ডগায় এসেই যায়। ‘শিলা কি জওয়ানি’ বা ‘চিকনি চামেলি’ গানে ক্যাটরিনা কাইফের ড্রেসাপ যেমন ছিল, প্রায় একই রকম অবতারে তাকে হাজির করা হয়েছে থাগস অফ হিন্দুস্তানেও! দুইশো বছর আগেও তাহলে এরকম পোষাকের প্রচলন ছিল এই অঞ্চলে! 

থাগস অফ হিন্দুস্তানের প্রোডাকশন বাজেট ২১০ কোটি রুপি, শুধু সিনেমার নির্মাণেই এই টাকাটা খরচ হয়েছে। প্রমোশন সহ সেটা আড়াইশো কোটি ছাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যশরাজ ফিল্মজের এযাবতকালের সবচেয়ে বড় বাজেটের সিনেমা এটা। এত টাকাকড়ি খরচ করার অন্যতম একটা কারণ অবশ্যই গ্রাফিক্সের মাধ্যমে ১৭৯৫ সালের আবহটাকে নিখুঁতভাবে তুলে ধরা। সেই কাজে থাগস অফ হিন্দুস্তান সফল হতে পারেনি পুরোপুরি। গ্রাফিক্স কিছু জায়গায় দুর্দান্ত, কোথাও আবার দেখতে একদমই কার্টুনিশ মনে হয়েছে। ট্রেলারের তিন মিনিটেই এই অসামঞ্জস্যতাগুলো চোখে ধরা পড়ে, আর বড় পর্দায় আড়াই-তিন ঘন্টার সিনেমায় তো চোখ ব্যাথা হয়ে যাওয়ার কথা। 

তবে আলোচনা-সমালোচনা বা ট্রল, যাই হোক না কেন, আরেকটা ব্লকবাস্টার সিনেমা যে আসছে, সেটা মোটামুটি নিশ্চিত। একে তো আমিরের সিনেমা, তার ওপরে দিওয়ালির মতো উৎসব। সব মিলিয়ে থাগস অফ হিন্দুস্তান দিয়ে আমির সম্ভবত বক্স অফিসে আরও একবার তোলপাড় তুলতে যাচ্ছেন বলেই বলিউড বিশ্লেষকদের ধারণা… 

তথ্যসূত্র- ফার্স্টপোস্ট, হিন্দুস্তান টাইমস, নিউজ১৮ ডটকম। 

আরও পড়ুন-

থাগস অফ হিন্দুস্তানের ট্রেলার দেখুন এখানে-

Comments

Tags

Related Articles