কানে দুল, লম্বা চুল, জাঁদরেলি গোঁফ; সব মিলিয়ে অদ্ভুত একটা প্যাকেজ! গতবছর আমির খানকে এই রূপে দেখে চমকে উঠেছিলেন সবাই। পরে জানা গিয়েছিল, ‘থাগস অফ হিন্দুস্তান‘ নামের নতুন একটা সিনেমার জন্যেই আমিরের এই বেশভূষা। আমির খানের সিনেমা মানেই বিশাল কিছু, দর্শকের আগ্রহ সেটা নিয়ে থাকবেই। আমিরের সিনেমা মুক্তি পাওয়া মানেই সিনেমা হলে দর্শকের ঢল, বক্স অফিসে তোলপাড়। থাগস অফ হিন্দুস্তান মুক্তি পাচ্ছে এই দিওয়ালীতে, নভেম্বরের সাত তারিখে। সেটার বেলাতেও ব্যতিক্রম কিছু হবে না নিশ্চয়ই।

আরও পড়ুন- ‘অভিনয়ের খিদেটাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে’

আগ্রহের পারদটা বাড়িয়ে দিচ্ছে সিনেমার বিষয়বস্তু। আর আমিরের সহ অভিনেতারাও ‘থাগস অফ হিন্দুস্থান’ নিয়ে হাইপ ওঠার একটা বড় কারণ। আমিরের সঙ্গে প্রথমবার স্ক্রীন শেয়ার করতে যাচ্ছেন বলিউড কিংবদন্তী অমিতাভ বচ্চন। ধুম-৩ এর পরে ক্যাটরিনা কাইফ আবার পর্দায় ফিরছেন আমিরের বিপরীতে। আছেন দাঙ্গাল গার্লজের একজন ফাতিমা সানা শেখ, আরও আছেন রোনিত রয়। এই সিনেমা নিয়ে আলোচনা না হওয়াটাই তো বরং অস্বাভাবিক। 

থাগস অফ হিন্দুস্তান, কনফেশনস অফ থাগ, আমির খান, অমিতাভ বচ্চন, যশরাজ ফিল্মজ

থাগস শব্দটার উৎপত্তি ঠগী থেকে। সতেরশো, আঠারোশো আর উনিশ শতকে এই ঠগীদের তৎপরতা ছিল ভারতবর্ষ জুড়ে। বিশেষ করে মধ্য ভারত আর বাঙলায় এদের দাপট ছিল বেশি। লোক ঠকানো, চুরি, ডাকাতি, জোচ্চুরি, এমন কোন কাজ ছিল না যেটা এরা করতো না। আমির খান এবার পর্দায় আসছেন সেই ঠগী সেজেই। সিনেমার গল্প নেয়া হয়েছে ফিলিপ মেন্ডজ টেইলরের ১৮৩৯ সালে রচিত ‘কনফেশন অফ এ থাগ’ বইটা থেকে। সেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আমির আলী হিসেবেই রূপালী পর্দায় আসবেন আমির খান, যিনি ইংরেজ সরকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। ১৭৯০ থেকে ১৮০৫ সালের মধ্যবর্তী সময়কার গল্প বলা হবে থাগস অফ হিন্দুস্তানে।

ভারতে থাগ বা ঠগীদের উৎপাত ছিল প্রায় ছয়শো বছর ধরে। এরা মূলত দলবেঁধে ঘুরে বেড়াতো, কেউ আবার একাকীও ঘুরতো। ভারতে বেড়াতে আসা বিদেশী পর্যটকেরা ছিল এদের প্রধান টার্গেট। অন্য এলাকা থেকে কাজের সন্ধানে বা অন্য কোন কারণে অন্য এলাকায় আসা মানুষজন। এরা পর্যটকদের সাথে বন্ধুর মতো মিশে যেতো, তাদের আস্থা অর্জন করতো, তারপর সুযোগ বুঝে তাদের খুন করে টাকাপয়সা মেরে দিতো। এক সমীক্ষায় জানা যায়, চারশো বছরেরও বেশি সময়ে ঠগীদের হাতে প্রায় পাঁচ লক্ষ থেকে বিশ লক্ষ মানুষ খুন হয়েছিল। বৃটিশ সরকার অষ্টাদশ শতকে ঠগীদের দমনের জন্যে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, ফলে বৃটিশদের সঙ্গে ঠগীদের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই সত্যিকার ঘটনাগুলোকে ফিকশনের আবরণে মুড়েই আসছে থাগস অফ হিন্দুস্তান।

আরও পড়ুন- বলিউডে সবচেয়ে বেশি আয় করেন কোন অভিনেতা?

যশরাজ ফিল্মজের ব্যানারে নির্মিত হচ্ছে সিনেমাটা, পরিচালনার দায়িত্বে আছেন বিজয়কৃষ্ণ আচার্য্য। ‘তাশান’ সিনেমাটা পরিচালনা করেছিলেন তিনি, এছাড়াও ধুম সিরিজের সবগুলো সিনেমার চিত্রনাট্য আর সংলাপ তার লেখা। ধুম-৩ এর পরিচালকও ছিলেন তিনিই। যদিও সেটাকে বলা হয় গত কয়েকবছরে আমির খানের সবচেয়ে দুর্বল সিনেমা। থাগস অফ হিন্দুস্তানে অতীতের অপবাদ কতটা ঝেড়ে ফেলতে পারবেন বিজয়কৃষ্ণ আচার্য্য, সেটাও দেখার বিষয়। 

থাগস অফ হিন্দুস্তান, কনফেশনস অফ থাগ, আমির খান, অমিতাভ বচ্চন, যশরাজ ফিল্মজ

সিনেমার প্রোডাকশন বাজেট ২১০ কোটি রূপি। অঙ্কটা চোখ কপালে তুলে দেয়ার মতো। যশরাজ ফিল্মজ এযাবতকালে কোন সিনেমাতেই এত বেশি অর্থলগ্নি করেনি। ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’ সিনেমার সর্বমোট বাজেট ছিল ২১০ কোটি রূপি, আর প্রচারণার খরচাসহ থাগস অফ হিন্দুস্তানের বাজেটটা আড়াইশো কোটি রূপিতে গিয়ে ঠেকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বিশাল বাজেটের সিনেমাটাকে বক্স অফিসে হিট ডিক্লেয়ার করার জন্যেও তিন থেকে সাড়ে তিনশো কোটি রূপি তুলে আনতে হবে শুধু ভারতের বাজার থেকেই। তবে আমির খান যখন সিনেমায় আছেন, কাজটা কঠিণ কিছু হবে না।

ভারতের বাইরে থাগস অফ হিন্দুস্তানের শুটিং হয়েছে মাল্টা আর থাইল্যান্ডে। রাজস্তানে বিশাল সেট বানিয়ে শুটিং করা হয়েছে, অষ্টাদশ শতকের আবহটা সিনেমায় হুবহু ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টার কমতি রাখেনি সিনেমার টিম। জোধপুরের মেহেরনগড় দূর্গে ক্ল্যাইম্যাক্স সিনের শুটিং শেষ হয়েছে ইতিমধ্যেই।

আরও পড়ুন-  ট্রান্সজেন্ডার নারীর পুরুষাঙ্গ প্রদর্শনের অসামান্য সাহসিকতা!

আমির খানের জন্যে এই সিনেমাটা একটু বেশি স্পেশাল। শোনা যাচ্ছে, থাগস অফ হিন্দুস্তানের পরেই নাকি তিনি ‘ড্রীম প্রোজেক্ট’ মহাভারতের কাজ শুরু করবেন। সেটা সত্যি হলে আগামী কয়েক বছর হয়তো মহাভারত ছাড়া অন্য কোন সিনেমায় দেখা যাবে না মিস্টার পারফেকশনিস্টকে। থাগস অফ হিন্দুস্তানে নিজের চরিত্রটা নিয়েও তিনি দারুণ উচ্ছ্বসিত। এক সাক্ষাৎকারে আমির বলছিলেন-

“থাগস অফ হিন্দুস্তানে আমার চরিত্রটা খুব ভালো কোন মানুষের নয়। অনেকদিন পর আমি এমন ডার্ক ক্যারেক্টারে অভিনয় করলাম। আমি কাউকে কোন মেসেজ দিতে চাইনি এখানে, শুধু বিনোদন দিতে চেয়েছি। এমন একটা চরিত্রে আমি অভিনয় করেছি, যাকে আপনি কোনভাবে, কোন মূহুর্তেই বিশ্বাস করতে পারবেন না। থ্রি ইডিয়টস, দাঙ্গাল বা পিকে’তে আমি যা করেছি, তার সম্পূর্ণ বিপরীত এখানে। টাকার জন্যে নিজের মা’কে বিক্রি করে দিতেও একটুও দ্বিধা করে না, এমন একটা মানুষ সেজে থাকাটা মোটেও সহজ কিছু ছিল না।”

থাগস অফ হিন্দুস্তান, কনফেশনস অফ থাগ, আমির খান, অমিতাভ বচ্চন, যশরাজ ফিল্মজ

গল্পের মূল চরিত্র আমির আলীর বাবা মা নিহত হয়েছিলেন ঠগীদের হাতে। শিশু আমিরকে ইসমাইল নামের এক ঠগীই নিয়ে এসেছিল তার বাড়িতে, নিজের সন্তানের মতো বড় করেছিল। সময়ের পরিক্রমায় সে হয়ে উঠেছিল দুর্ধর্ষ ঠগীদের একজন। সিনেমার গল্প এগিয়ে যাবে আমির আলীর বয়ানেই। নিজের জীবনকালে প্রায় সাতশোরও বেশি মানুষকে খুন করেছিল আমির আলী। সেই ভয়ঙ্কর চরিত্রটাই রূপালী পর্দায় ফুটিয়ে তুলবেন আমির খান। অমিতাভ বচ্চন থাকবেন হয়তো ইসমাইলের চরিত্রে।

অমিতাভ বচ্চন আর আমির খানকে নব্বইয়ের দশকে বেশ কিছু স্টেজ পারফরম্যান্সে বা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে একসঙ্গে দেখা গেছে। তবে এই প্রথম সিনেমায় স্ক্রীন শেয়ার করবেন এই দুই তারকা। তবে সেটা স্বচক্ষে দেখার জন্যে দর্শককে অপেক্ষা করতে হবে এবছরের নভেম্বর পর্যন্ত।

তথ্যসূত্র- হিন্দুস্তান টাইমস, বলিউড হাঙ্গামা।

Comments
Spread the love