একটি ‘সুন্দর’ সিনেমার কি কি শক্তি থাকতে পারে? সিনেমাটি দর্শককে কাঁদাতে কিংবা হাসাতে পারে। অথবা সিনেমাটি শেষে কোনো এক আকস্মিক তোলপাড় জাগতে পারে দর্শকের বুকে। সিনেমাপ্রেমীদের আড্ডায় তর্কের ঝড় উঠতে পারে তার বক্তব্য নিয়ে। ক্রিটিক লিখতে পারে তার দীর্ঘ সমালোচনা। শৈল্পিকতার আর নান্দনিকতা হিসাব সরিয়ে রেখে হয়ত হতাশায় ডুবে যাওয়া কারও মনে জাগাতে পারে আলোর রেখা। October Sky কিংবা A good will hunting জাগায় যেমন।

আমরা কথা বলব Three Billboards outside Ebbing, Missouri নামের সিনেমাটি নিয়ে। ইতোমধ্যে অস্কারে সেরা অভিনেত্রী আর সেরা পার্শ্ব-অভিনেতার পুরস্কার জিতেছেন এই ছবির কলাকুশলী থেকে। আরও পাঁচটি ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন ছিল। বাফটা জিতেছে, গোল্ডেন গ্লোব জিতেছে, আকটা জিতেছে, আরও অসংখ্য পুরস্কার জমেছে থলিতে। দর্শকরাও বাহবা দিচ্ছেন সমানতালে। সুতরাং সিনেমার শৈল্পিকতা, নির্মাণ স্বার্থকতা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলা হবে অত্যন্ত বোকামি এবং এহেন কাজ আমরা করবোও না। আমরা গল্প করবো সিনেমাটিতে আমাদের জন্য, আমরা যারা হাজার মাইল দূর থেকে বসে দেখছি, তাদের জন্য কি আছে!

বৃদ্ধা মিলড্রেড হেইসের মেয়ে খুন হয়েছে। খুন হয়েছে ধর্ষণের পর। আমাদের এইদেশে যে নির্মম ঘটনাটি প্রতি দুইদিনে অন্তত একবার করে ঘটে। অনেকদিন হয়ে গেল পুলিশ সুরাহা করতে পারছে না। সব যেন স্বাভাবিক! মিলে যাচ্ছে তো সব। এমনই তো ঘটে এখানে। বছরের পর বছর চলে যায়, একটি মানুষ যার উচ্ছ্বল প্রাণ ছিল, জানোয়ারের মত ভোগ করে তাকে হত্যা করা হয়। অথচ বিচার হয় না। এ তো আমাদের জানা কাহিনী। কেবল আমাদের জানা ছিল না মিলড্রেড হেইস নামক সেই বৃদ্ধার মানসিক শক্তির জোর। চলচ্চিত্রকার তাই জানিয়েছেন।

এবিং শহরের একদম নির্জনে পুরনো অব্যবহৃত তিনটি বিলবোর্ড দেখে একবার চেষ্টা করেন মিলড্রেড। পুলিশ প্রধানকে উদ্দেশ্য করে তিনটি বিলবোর্ডে লিখেন তিনটি ছোট্ট লাইন। ব্যস! যে রাস্তায় কদাচিৎ লোকজন দেখা যেত সেখানে টিভি রিপোর্টার চলে আসে। টনক নড়ে পুলিশের। কিন্তু সমস্যা বাধে অন্য জায়গায়। পুলিশের প্রধান জনপ্রিয় লোক এবং তারা যথেষ্ঠ চেষ্টা করেছে। অপরাধীকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে শেষমেশ। শহরের সব লোক পুলিশের প্রধানকে পছন্দ করে আগে থেকেই এবং মিলড্রেডকে অপছন্দ করা শুরু করে তার বাড়াবাড়ির জন্য।

সবাই বলে, এবার থামো। যেমন আমাদের বলা হয়। গাড়ির কাঁচে ঢিল লাগে মিলড্রেডের, প্রাক্তন স্বামী এসে থামতে বলে, পুলিশের লোক বলে চেষ্টা তো করছিই! কিন্তু মিলড্রেড অনড়। কত ছোটবড় আকস্মিক ঘটনাই যা ঘটে যায়! কিন্তু তারপরও কি হাল ছেড়ে দেয় মিলড্রেড? আর তার মেয়ের ধর্ষণকারী-হত্যাকারীরা কি সাজা পায় শেষতক?

মির্জা শাজাহান কিন্তু পেয়েছেন সুবিচার। যদিও রুপা তার মেয়ে ছিল না। তিনি কেবল পড়েছেন খবরের কাগজে একদল অমানুষ তার শহরের একটি মেয়েকে চলন্ত বাসে ধর্ষণ করে হত্যা করে। যে কিনা সারাদিন চাকুরী করে বাসায় ফিরছিল মায়ের কাছে। মির্জা শাজাহান দৌড়াতেন প্রতিদিন সকালে। তিনি ঠিক করলেন ‘রুপা হত্যার বিচার চাই’ লেখা টি-শার্ট পড়ে আদালত চত্বর থেকে দৌড় শুরু করে শহরের সব জায়গা ঘুরে আবার আদালতে এসে শেষ করবেন। করলেনও। সাথে যোগ দিলো আরও মানুষ। মির্জা শাজাহান কিন্তু ভাবেননি তার এই দৌড়েই বিচারকাজ সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মনে খোঁচা লাগুক, মানুষ মনে রাখুক যে শহরের একজন নাগরিককে বাঁচতে দেয়া হয়নি।

থ্রি বিলবোর্ডস সিনেমায় কি খোঁচা দেয়া হয়েছে সেরকম? বলতে চাওয়া হয়েছে কি এভাবেও হয়ত শুরু করতে পারো তোমরা? তা নাহলে নিউইয়র্ক, মায়ামি, লন্ডন আরও সব জায়গায় এভাবে প্রতিবাদ শুরু হয়ে গেল কিভাবে? লন্ডনে একেবারে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবের সামনেই তিনটি ট্রাকে তিনটি বিশাল বিলবোর্ড। তিনটি বিলবোর্ডে তিনটি লাইন। ঠিক সিনেমার মত। লাল রঙের উপর কালো লেখা। ’71 DIED. STILL NO ARREST. HOW COME?’ নিউইয়র্কে তো একেবারে জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছে। ‘500,000 DIED IN SYRIA. STILL NO ACTION. HOW COME SECURITY COUNCIL?’ মায়ামিতে চাওয়া হয়েছে আরেক পুরনো হিসাব।

চাইলেই কেউ বিলবোর্ডের রঙ পরিবর্তন করতে পারতো। কিংবা পারতো কথাগুলো অন্যভাবে বলতে। কিন্তু সবাই করেছে ঠিক সিনেমার মত। তিনটে ছোট ছোট লাইন কিংবা শব্দগুচ্ছ। তিনটে বিলবোর্ড। লাল পর্দার উপর কালো রঙের লেখা। এত সম্মানজনক পুরস্কারের শেলফের পাশে ঝোলানো প্রতিবাদের এই ছবিগুলোই তো পরিচালকের জন্য বেশি তৃপ্তিদায়ক হওয়ার কথা। তার খোঁচা দেওয়া যে স্বার্থক!

লন্ডনে থ্রি বিলবোর্ডস-

মায়ামিতে থ্রি বিলবোর্ডস-

নিউইয়র্কে থ্রি বিলবোর্ডস। ফিজিশিয়ান ফর হিউম্যানিটি করেছে প্রতিবাদটি।

 

Comments
Spread the love