খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

থমাস মুলার- দ্য মডেস্ট এসাসিন!

এর মধ্যেই খেলে ফেলেছেন দুইটি বিশ্বকাপ। শুধু খেলেছেন বললে ভুল হবে, দুটি বিশ্বকাপই মাতিয়েছেন আপন শৈলীতে। এবারেও জার্মান অস্ত্রভাণ্ডারে তিনি অন্যতম সেরা অস্ত্র। বয়স মাত্র ২৮। সব ঠিক থাকলে নিশ্চিতভাবেই খেলবেন আরও একটি বিশ্বকাপ। মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডে তাই নিশ্চিতভাবেই চোখ থাকবে তাঁর। বিশ্বকাপের তারকা থমাস মুলারকে নিয়ে আজকের লেখা।

পরিবার কট্টর বায়ার্ন সমর্থক। বয়স যখন ১০ও হয়নি, তখন লাল জার্সিতে দাপাদাপি করেছেন গ্যালারিতে। প্রায় নব্বই ছুঁই ছুঁই দাদী যখন মারা যান, চাওয়া ছিল একটাই, যদি টিভিতে দেখা যেত বায়ার্নের আরেকটি ম্যাচ। এমন বায়ার্ন অন্তপ্রাণ পরিবারের একজন বায়ার্নে খেলবেন সেটাই স্বাভাবিক। মুলারও শুরু করেছেন বায়ার্নের হয়েই, ১০ বছর বয়সে। এরপর বায়ার্নের ইয়ুথ সিস্টেমের সিঁড়ি বেয়ে উঠেছেন ধাপে ধাপে, জার্মান অনুর্দ্ধ-১৯ লীগে খেলেছেন, খেলেছেন বায়ার্ন সেকেন্ড টিমের হয়ে সেকেন্ড টায়ার লীগেও। খুব জাদুকরী কেউ নন, তাই তাঁকে নিয়ে আলোচনাও ছিল না। নীরবে উঠে এসেছেন ধাপে ধাপে। বুন্দেসলীগায় প্রথম খেলেছিলেন ২০০৮ সালে, মিরোস্লাভ ক্লোসার বদলি হিসেবে খেলেছিলেন শেষ দশ মিনিট। সেই মৌসুমে আরও ৩ বার মাঠে নামার সুযোগ হয়েছিল মূল দলের হয়ে। লাইমলাইটে আসার মত কিছু করতে পারেননি।

২০০৯-১০ মৌসুমে প্রথম সিনিয়র দলের হয়ে কন্ট্রাক্ট সাইন করেন। কিন্তু খেলার সুযোগই পাচ্ছিলেন না। তাঁকে লোনে পাঠানো হবে এমন কথা ছড়াচ্ছিল বাতাসে। পেশাদার ফুটবলারের জীবনই এমন, তাই মুলারও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই সময়ে দৃশ্যপটে আসেন মাস্টার ট্যাক্টিসিয়ান লুই ফন গাল। ফন গাল কোচ হয়ে আসেন বায়ার্ন মিউনিখের, সাথে নিয়ে আসেন মুলারের জন্য লাইফলাইন। ফন গাল নিয়মিত খেলাতে শুরু করেন মুলারকে। শুরুতে তিনি ছিলেন রেগুলার সাবস্টিটিউট, কিন্তু টানা দুই ম্যাচে বদলী হিসেবে নেমে করেন জোড়া গোল, নির্বাচিত হন বুন্দেসলীগার প্লেয়ার অফ দ্যা মান্থ। সুযোগ পেয়ে যান প্রথম একাদশে। সেই যে শুরু, আর মিস করেননি মৌসুমের কোন ম্যাচ।  আস্তে আস্তে হয়ে ওঠেন লুই ফন গালের মূল আস্থা। কোন এক সংবাদ সম্মেলনে ফন গাল সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেন, “With me, Muller will always play”. এই মুগ্ধতা এতটাই ছিল যে, ম্যানইউ কোচ হয়েও ফন গাল চেষ্টা করেছিলেন রেকর্ড ট্রান্সফারে মুলারকে দলে টানতে, কিন্তু যাই যাই করেও বায়ার্নের টানে যেতে পারেননি মুলার। এখনও রয়ে গেছেন বায়ার্নের জার্সিতে। ফন গাল চলে গেছেন, এরপর হেইংকেস, গার্দিওলা, আন্সেলত্তির মত ভিন্ন দর্শনের কোচ এসেছেন, মুলার জায়গা করে নিয়েছেন সবার গুডবুকেই। বায়ার্নের হয়ে জিতেছেন সম্ভাব্য সবকিছুই। নিজেকেও তুলে ধরেছেন বায়ার্ন মিউনিখের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে।

তারপরও মুলারের মূল কারিশমা জাতীয় দলের হয়ে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে বিশ্বকাপে। ২০১০ সালে যখন স্কোয়াডে এসেছিলেন, বায়ার্নের মূল দলে তখন সবে থিতু হয়েছেন, বিশ্ব ফুটবল তাঁকে চেনেনা বললেই চলে। মাত্র ২০ বছরের তরুণ। একাদশে সুযোগ পাওয়ারই কথা নয়। অধিনায়ক মাইকেল বালাকের ইনজুরিতে ভাগ্য খুললো, বালাকের ১৩ নম্বর জার্সি পেলেন, সাথে পেলেন জার্মান কিংবদন্তী জার্ড মুলারের লিগাসি। সেই বিশ্বকাপে সেকেন্ড স্ট্রাইকার হিসেবে খেলে মুলার করলেন ৫ গোল, সাথে ৩ টি এসিস্ট।  জিতলেন গোল্ডেন বুট ও টুর্নামেন্টের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের ট্রফি। সেবার অনেকেই ভেবেছিলেন ফ্লুক। কিন্তু ২০১৪ তে মুলার আবার প্রমাণ করেছেন নিজেকে। এবারও করেছেন ৫ গোল, হামেস রদ্রিগেজের পেছনে থেকে জিতেছেন সিলভার বুট। এবার আর তৃতীয় নয়, দলকে জিতিয়েছেন বিশ্বকাপ। দুবারই টুর্নামেন্টের ড্রিম ইলেভেনে জায়গা পেয়েছেন।

থমাস মুলারের একটি বড় শক্তি হল, তিনি বিশ্বের সবচেয়ে ফ্লেক্সিবল খেলোয়াড়। মূল পজিশন এটাকিং মিডফিল্ডার, অনেক সময় খেলেন সেকেন্ড স্ট্রাইকার হিসেবে। জার্মানী ও বায়ার্ন মিউনিখ দুই দলেরই মূল ফরমেশন ৪-২-৩-১। এখানে ৩ জন এটাকিং মিডের মাঝের জায়গাটা নেন মুলার। জার্মানীতে খেলেন ডানদিকে। এখানেই শেষ নয়। খেলতে পারেন দুই উইংয়ে, ডিফেন্সেও সাহায্য করেন। খেলেছেন লোন স্ট্রাইকার হিসেবেও। এই ফ্লেক্সিবিলিটির জন্যেই ভিন্ন ভিন্ন দর্শনের সব কোচের সাথেই খুব সহজেই মানিয়ে নিয়েছেন মুলার। পাশাপাশি তাঁর দুর্দান্ত ওয়ার্করেট খুব ভালো যায় জার্মান মেশিন দর্শনের সাথে।

মুলার খুব তীব্র গতির কেউ নন, তাঁর ক্লাব দলে কোম্যান সবচেয়ে দ্রুতগতির। খুব স্কিলফুলও নন, আরিয়েন রোবেন বা ফ্রাঙ্ক রিবেরি নেবেন সেই জায়গা। জাতীয় দলেও ওজিলের পাশে তিনি বড্ড ম্লান। তাহলে কি নিখাদ নাম্বার নাইন? দুর্দান্ত পোচার? নাহ ঠিক তাও নয়, সেখানে লেভানদস্কি এগিয়ে থাকবেন ক্লাবে, জাতীয় দলেও আছেন ওয়ের্নার বা মারিও গোমেজ। সেরা পাঁচ ফরোয়ার্ড, সেরা পাঁচ এটাকিং মিড, সেরা পাঁচ উইঙ্গার, বা সেরা পাঁচ হোল্ডিং মিডের তালিকা করুন, মুলারকে পাবেন না কোথাও। কিন্তু তিনি যে সময়ের অন্যতম সেরা তারকা, তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। তাহলে মুলারের এত সফল কেন? রহস্যটি ঠিক কোথায়? মুলার নিজে নিজেকে বলেন, Raumdeuter. অনুবাদ করলে ইংরেজিটা দাঁড়াবে “Interpreter of space”. হ্যাঁ ঠিক তাই। মুলার মাঠে বল খোঁজেন না, স্পেস খুঁজে বেড়ান। অফ দ্যা বল তিনি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। প্রচণ্ড ডায়নামিক এই ফুটবলারের পজিশন সেন্স আর মুভমেন্ট বিশ্বসেরা। আধুনিক ফুটবলে একটা গুরুত্বপুর্ন ধারণা হল, স্পেস খুঁজে বের করা। প্রত্যেকটা ফরোয়ার্ডের জন্য আলাদা প্ল্যান থাকে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সের, মান মার্কিংয়ে, জোনাল মার্কিংয়ে তটস্থ থাকেন অ্যাটাকাররা। ঠিক এখানেই মুলার ম্যাজিক। মুলারের অবিশ্বাস্য মুভমেন্ট প্রতিপক্ষ ডিফেন্সকে এলোমেলো করে দেয়, ডিফেন্সের বুক চিরে বেরিয়ে যান, ডিফেন্ডার যতক্ষণে ভাবতে থাকেন তাঁর ভুল কোথায়, মুলার জালে বল জড়িয়ে উল্লাসে মাতেন।

আরেকটি বড় বিষয় হল তাঁর ওয়ার্করেট। যেকোন প্লেয়ারের ওয়ার্করেট বোঝার উপায় হল তাঁর হিটম্যাপ। যেকোন ম্যাচে মুলারের হিটম্যাপ দেখলে বিস্ময়ে তব্দা হয়ে যেতে হয়। মাঠের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে পা পড়ে না মুলারের। নাম্বার নাইনের সাথে জায়গা বদল করেন প্রতিনিয়ত, ভেতরে সরে এসে ওভারল্যাপ করার সুযোগ দেন উইং ব্যাকদের, কখনো বা ট্যাকলে সাহায্য করেন সামি খেদিরাদের। বিশ্বসেরা ফুটবলারদের মুভমেন্টের একটা প্যাটার্ন থাকে, ডিফেন্ডাররাও সেভাবে পরিকল্পনা করেন তাকে আটকানোর। কিন্তু, মুলারের নির্দিষ্ট কোন প্যাটার্ন নেই, ডিফেন্ডাররা জানেন না তিনি কিভাবে মুভ করবেন। কারণটা সহজ, মুলার নিজেও জানেন না। মুলারের গেম রিডিং খুব ভালো, তিনি মুভ করেন প্রতিপক্ষের ধরণ বুঝে। তাই একেক ম্যাচে তাঁর হিটম্যাপ একেকরকম মুলার। বল ধরে রাখবেন না, খেলা দেখবেন, এদিক সেদিক ছুটে বেড়াবেন, মাঝে মাঝে দুয়েকটা পাস বাড়াবেন, তাও নিতান্ত অনিচ্ছায়। মার্কারকে ছুঁড়ে ফেলে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যাবেন, তারপর ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় বল পেয়ে যাবেন, পাঁচ জনের ডিফেন্স লাইনেও কিভাবে যেন ফাঁকায় পেয়ে যাবেন বল। এ এক প্রহেলিকা, যার উত্তর শুধু মুলারই জানেন।

মুলার কিভাবে গোল করবেন, ভাবেন না। বুলেট গতির শট করেন, হেড করেন, কিছুতেই তাঁর অনীহা নেই। পুসকাস এওয়ার্ডে তাঁর নাম খুঁজে পাবেন না, মুলারের তাতে বিশেষ আগ্রহও নেই। গোল যেভাবেই আসুক, তাঁর গোল চাই। মুলার এসিস্টও করেন, তবে সেসবও দুর্দান্ত থ্রু বাড়িয়ে, এমন নয়। হয়তো দুর্দান্ত কাউন্টার এটাকের অংশ হয়ে, হয়তো ফাঁকায় নাম্বার নাইনকে বল বাড়িয়ে। সবকিছুর মুলে সেই পজিশনিং ও মুভমেন্ট। মুলার তাঁর লিমিটেশন জানেন, ম্যাজিকাল কিছু করতে যান না, ঠিক সময় ঠিক জায়গায় থাকেন। তাই গার্ডিয়ানের চোখে তিনি “মডেস্ট এসাসিন”।

জার্মানী অনেক দিন ধরেই আছে জোয়াকিম লোর যোগ্য হাতে। আর লোর গেমপ্ল্যানে মুলার খুবই গুরুত্বপুর্ণ সদস্য। বেশ কিছুদিন হলেই মুলার সেই আগুন ফর্মে নেই, সেভাবে গোল পাচ্ছেন না জাতীয় দলের হয়ে। তাতে আশা হারাচ্ছেন না কেউ। সবাই ঠিকই জানেন, বিশ্বকাপ শুরু হতেই মুখোশ খুলবেন মুলার, মাফ করবেন না সূক্ষ্মতম ভুল। নিষ্ঠুর আততায়ীর মত ছিঁড়েখুড়ে ফেলবেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্স। এই তো মাত্র কটা দিন। মুলারের সময় শুরু হল বলে।

*

এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনুন ক্যাসপারস্কি ল্যাবের সব পণ্য, খুব সহজে। অনলাইনে পেমেন্ট, অনলাইনেই ডেলিভারি!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close