তারুণ্যপিংক এন্ড ব্লু

মানুষকে ছোট্ট একটা থ্যাংকস বলতে আমাদের কত আপত্তি!

আয়মান সাদিকের একটা ভিডিও’র কথা মনে পড়ে। যেখানে তিনি বলেছিলেন, মানুষকে খুশি করতে খুব বেশি কিছু লাগে না। হাসিমুখে একটা ধন্যবাদ দিলেই হয়। মানুষকে ইম্প্রেস করতেও খুব বেশি কিছু লাগে না। ছোট করে সুন্দর একটা হাসি দিয়ে সালাম দিলেই মানুষ বেশ খুশি হয়ে যায়। সেই ভিডিওতে তিনি একটা ঘটনাও বলেছিলেন। আবছা আবছা মনে পড়ে। ঘটনাটা এমন যে, তার পরিচিত এক আন্টি যার বিভিন্ন ব্যাপারে কৌতূহল, তাকে তিনি সালাম দিতেন। আসসালামু আলাইকুম আন্টি! হাসিমুখে পাওয়া এই সালাম সেই আন্টিকে খুশি করত।

আরেকটি ঘটনা তিনি বলেছিলেন, একবার তিনি নামাজ পড়ে বের হবার পর একটা সালাম পেলেন। যিনি আয়মানকে সালাম দিয়েছিলেন তিনি বেশ বয়স্ক। আয়মান কিছুটা অবাক হয়েছিলেন। লোকটাও বেশ মজা পেয়ে বললো, অবাক হয়েছো? আয়মান বললেন, হ্যাঁ। ভদ্রলোক বললেন, স্বাভাবিক। তুমি যখন বয়সে ছোট কাউকে সালাম দিবে তারা অবাক হবে। এরপর আয়মান খেয়াল করলেন, যারা সালাম আশা করে না, তাদের একদিন সালাম দিলে তারা বেশ অবাকই হয়! খুশিও হয়। তিনি সেই ভিডিও’তে সবাইকে বলেছিলেন, ছোট্ট একটা সালাম দিয়ে মানুষকে খুশি করার চেষ্টা করতে।

ইউরোপে এই ব্যাপারগুলো আছে। অপরিচিত মানুষের দিকে কারো চোখে চোখ পড়ে গেলে খুব শান্ত স্নিগ্ধ একটা হাসি বিনিময় করেন তারা। এটা এক প্রকার সৌজন্যতা। রেস্টুরেন্ট কিংবা জনবহুল কোনো জায়গায় দরজা দিয়ে প্রবেশের সময় পরের জন যেন প্রবেশ করতে পারে এজন্যে দরজা ধরে রাখা একটা সাধারণ ভদ্রতা। সভ্য দেশে এইরকম অভ্যাস আছে। এই সাধারণ সৌজন্যবোধ আমাদের দেশে কতজন মানুষের আছে?

আয়মান সাদিক সম্প্রতি আরেকটি ভিডিও বানিয়েছেন। তার আগের ভিডিও দেখে যারা ভাল অভ্যাস শিখেছিল, মানুষকে ধন্যবাদ দিচ্ছিলো, তারা অনুযোগ জানাচ্ছে, এসব ভাল কাজের মূল্য নেই। কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। আয়মান সাদিক সেই ব্যাপারটা নিয়েই এই ভিডিওতে কথা বলেছেন। ভাল কাজ, ভাল ব্যবহারকে এদেশে কেন যেনো দূর্বলতা ভাবা হয়। ভাল কাজের প্রশংসা একেবারেই দূর্লভ একটি ব্যাপার। এই যে ভাল কাজের এপ্রিশিয়েশন নেই কোথাও, মানুষ ভাল কাজ তাহলে কেন করবে? আমরা সারাদিন অভিযোগ জানাই, এটা ঠিক নেই, ওটা ঠিক নেই, অমুক খারাপ, তমুক খারাপ। কিন্তু, আমরা কি কখনো যা ঠিক আছে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি, আমরা কি কখনো যে ভাল তাকে নিঃস্বার্থভাবে মন খুলে প্রশংসা করেছি?

মানুষকে ছোট্ট একটা থ্যাংকস বলতে আমাদের কত আপত্তি! আপনি কারো উপকার করলেন, হয়ত তার বিপরীতে ধন্যবাদ আশা করেন না, তবুও কেউ যখন সুন্দর করে ধন্যবাদ বলে সেটা শুনতে কি ভীষণ ভালই না লাগে! ঠিক তেমনি কেউ যখন আপনার ছোট খাটো উপকার করবে, আপনাকে ছোট খাটো সার্ভিস দিবে তাকে ছোট করে একটা ধন্যবাদ দিলে কিন্তু ক্ষতি নেই। বরং দেখা যাবে, সামান্য একটা ধন্যবাদের কারণে আপনি সেই মানুষটার কাছে পরের বার আরো ভাল ব্যবহার পাচ্ছেন, আরো ভাল সেবা পাচ্ছেন। কিন্তু, বেশিরভাগ সময়ে দেখা যায়, কাউকে ধন্যবাদ দিতে আমাদের ইগোতে লাগে। রেস্তোরাঁয় আপনি টাকা দিয়ে খান আবার কিসের ধন্যবাদ দেবেন যদি এমন মন মানসিকতা হয় তাহলে জীবনে আপনি কখনো তৃপ্ত হতে পারবেন না কোনো কিছুতে। মানুষকে ধন্যবাদ দিয়ে দেখুন হাসিমুখে, তারা যে খুশিটা হবে তা যদি উপলব্ধি করতে পারেন তাহলেই সত্যিকারের তৃপ্তি উপভোগ করতে পারবেন।

আজকাল এই সামান্য ধন্যবাদটাই বিরল হয়ে গেছে। বাসের সিটে কাউকে জায়গা ছেড়ে দিলে এমন ভাবে বসে যায়, যেনো এটা তারই সিট ছিল, জন্মসূত্রে পাওয়া। এরপর কি আর কারো জন্য সিট ছেড়ে দিতে মন চাইবে? লিফটে কাউকে আসতে দেখে থামিয়ে অপেক্ষা করার পর যখন কেউ ধন্যবাদ দেয় না তখন একই রকম সিচুয়েশনে একই কাজ আবার করতে কেনো ইচ্ছা করবে? যে মানুষটাকে দিনের পর দিন সালাম দিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায় না তাকে কি আর সালাম দিতে ইচ্ছে করবে? কেউ অসুস্থ এই কথা বলার পর তাকে যখন সাহায্য করবেন, তারপর সে ভাব নিবে এটা তার অধিকার, আপনি কি আর কখনো অসুস্থ মানু্ষকে সাহায্য করবেন? একই কাজ যখন আপনার সাথে হবে এবং আপনি ধন্যবাদ জানাতে ভুলে যাবেন তখন কেউ কি আর আপনাকে সাহায্য করবে?

সব কিছু টাকা দিয়ে কেনা যায় না। আপনার বাসায় কাজের লোক টাকা পায়। কেয়ারটেকার টাকা পায়। পত্রিকাওয়ালা মাস শেষে টাকা নেয়। এদের কখনো ধন্যবাদ বলে দেখেছেন? দেখবেন এরা কেমন খুশি হয়! আপনার চেয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থানে বড় কেউ যখন আপনার প্রশংসা করে তখন আপনার যেমন খুশি লাগে, আপনি যখন আপনার চেয়ে ছোট কাউকে প্রশংসা করবেন, সালাম কিংবা ধন্যবাদ দিবেন তারা আপনার কল্পনার চেয়েও বেশি খুশি হবে।

যদিও এই প্র‍্যাক্টিসটা আমাদের দেশে কম। কাউকে ধন্যবাদ দিতে আমাদের গায়ে লাগে। আমরা মনে করি, ধন্যবাদ দিলে বেশি পাত্তা দেয়া হয়ে যাবে। ধন্যবাদ দিলে মাথায় উঠে যাবে। আমরা ভাবি, ‘টাকা দিয়া কাজ করাইসি, আবার ধন্যবাদ, হুহ!’ আমরা ভাবি, অমুক আমার চেয়ে নিচু, তারে আবার ধন্যবাদ কিসের! কতরকম চিন্তাভাবনা আমাদের ব্যাক অফ দ্যা মাইন্ডে চলতে থাকে। বাস্তবতা হলো, একটা ধন্যবাদ দিলে কোনো ক্ষতি নেই, বরং লাভ আছে। সামান্য একটা ধন্যবাদে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তিও ঘটে যায়।

ভাল কাজের এপ্রিশিয়েশন দেয়া মানে এই না আপনি ছোট হয়ে যাচ্ছেন। ভাল কাজের প্রশংসা করা মানে আপনি আরো একটা ভাল কাজের প্রতি মানুষটাকে অনুপ্রাণিত করছেন। আমাদের মনে তাহলে কিসের এতো শঙ্কা? মানুষকে ছোট করে একটুখানি প্রশংসা করতে, একটা থ্যাংকস দিতে কেন আমাদের বাঁধে? কারো সমালোচনা করবার বেলায়, কোনো রিকশাওয়ালার সাথে কথা কাটাকাটি করবার সময়, চায়ে চিনি কম হয়েছে বলে ঝাড়ি দেয়ার সময় আমরা ছেড়ে কথা বলি না। কিন্তু, ভাল কিছু দেখলেই আমরা কাচুমাচু করতে থাকি।

প্রত্যেকদিন পুলিশকে এতো গালাগাল দেন, কোনোদিন একটা পুলিশকে ধন্যবাদ দিয়েছেন? ডাক্তারদের কাছে কতবার গিয়েছেন, তারা ঔষধ লিখে দিচ্ছে, চিকিৎসা নিচ্ছেন, টাকা দিচ্ছেন, এর বাইরে কখনো একটা ধন্যবাদ দিয়েছেন? কোনো দিন সকালে রাস্তার ঝাড়ুদারকে দেখে ধন্যবাদ জানিয়েছেন? ভেবে দেখুন, আপনি অনেক কিছুই ‘ট্যাকেন ফর গ্রান্টেড’ হিসেবে ধরে নিয়েছেন। অথচ, একটা ছোট হাসিমাখা মুখে একটা ধন্যবাদ কিন্তু চাইলেই আপনি দিতে পারেন!

মানুষকে ধন্যবাদ দেয়ার এই প্র‍্যাক্টিসটা আজ থেকেই শুরু হোক, নাকি?

আর কতদিন | আয়মান সাদিক

ভালোর প্রতিদানে আরেকটু ভালো হলে ভালো হতো না?

Posted by Ayman Sadiq on Sunday, October 7, 2018

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close