অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

এবার ওরা নিঃশ্বাস নেবে মুক্ত বাতাসে…

শেষ হলো শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান, ডুবুরীদের সাহায্য নিয়ে গুহার ভেতর থেকে পঁচিশ বছর বয়স্ক কোচের বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাসে ফেটে পড়েছিল সবাই। আট কিশোরকে ভেতর থেকে বের করে আনা হয়েছিল গতকালই। ভেতরে বাকী ছিল তাদের কোচসহ পাঁচজন। সকালে সেই পাঁচজনকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনার অভিযান শুরু হয়েছিল গতদিনের মতো। আগের আটজনকে যেভাবে ডুবুরীরা বের করে এনেছিলেন, সেই একই পদ্ধতি অবলম্বন করেই উদ্ধার করা হয়েছে বাকী পাঁচজনকেও। উদ্ধারকৃত তেরোজনই এখন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। সেখানে আটচল্লিশ ঘন্টা তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। শরীরে কোন রোগের সংক্রমণ হয়নি নিশ্চিত হলেই ডাক্তারেরা পরিবারের সদস্যদের দেখা করার অনুমতি দেবেন।

প্রায় দিন পনেরো আগে অনুশীলন শেষে কোচের সঙ্গে এই কিশোরেরা ঘুরতে গিয়েছিল থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় গুহা থাম লুয়াং-এ। এরা সবাই একটা কিশোর ফুটবল দলের সদস্য। গুহার ভেতরে ঢোকার সময় ওরা হয়তো ভাবতেও পারেনি, কি বিশাল বিপদে পড়তে চলেছে তারা! প্রবল বৃষ্টির তোড়ে ভেসে গিয়েছিল গুহামুখটা, ভেতরে পানি ঢুকে জলমগ্ন করে রেখেছিল প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা। এই কিশোরেরা গুহার ভেতরে ঠিক কোন জায়গাটায় আছে, সেটা বের করতেও উদ্ধারকর্মীদের লেগে গেছে নয়দিন! এই সময়টা শুধু ময়লা পানি খেয়ে কাটিয়েছে দলের সবাই।

থাম লুয়াং, কিশোর ফুটবলার, গুহা, উদ্ধার অভিযান

নিখোঁজ হবার দশ দিনের মাথায় বৃটিশ দুই ডুবুরী রিচার্ড স্ট্যানটন এবং জন ভলানথেন তাদের সন্ধান পান। উদ্ধারকারী এই দুই ডুবরীর কাছে আটকে পড়া কিশোরদের প্রথম প্রশ্ন ছিল- “আঙ্কেল আমাদের কখন বের করবেন?” তাদের এই সোজাসাপ্টা প্রশ্নটার কোন সহজ জবাব জানা ছিল না রিচার্ড বা জনের৷ দশ কিলোমিটার লম্বা এই জলের নীচে ডুবে থাকা গুহার ভেতর থেকে এই কিশোরদের বের করে আনাটা তো চাট্টেখানি কথা নয়!

সন্ধান পাবার পর থেকেই ছেলেগুলোকে জীবিত উদ্ধারের প্রচেষ্টায় প্রাণপণে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন উদ্ধারকারীরা। বৃটেন থেকে অভিজ্ঞ ডুবুরীদের নিয়ে আসা হয়েছে, যারা গুহার ভেতরে আটকা পড়া বন্দীদের উদ্ধার করতে পারবেন। অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলো থাইল্যান্ডের নেভি সীল, থাই প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সর্বক্ষণ খোঁজখবর রাখছিলেন অভিযানের অগ্রিগতির। সারাক্ষণই উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিদের আনাগোনা ছিল থাম লুয়াং গুহার সামনে চলা এই উদ্ধার অভিযানে।

তবে মিশনটা সহজ ছিল না মোটেই। গুহার ভেতরটা অন্ধকারে ঢাকা, পানিতে ডুবে আছে বেশিরভাগ জায়গা। ছেলেগুলোর অবস্থান ছিল গুহামুখ থেকে চার কিলোমিটার ভেতরে। সেখানে পৌঁছানোটা যুদ্ধজয়ের চেয়ে কম কিছু ছিল না। নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে সেই আটকে পড়া কিশোরদের জন্যে বারবার গুহার ভেতরে ঢুকেছেন ডুবুরীরা, পৌঁছে দিয়েছেন খাবার আর অক্সিজেন। কিন্ত মূল প্রশ্নটার কোন সুরাহা হচ্ছিল না। গুহার ভেতর থেকে এই দলটাকে বের করা হবে কিভাবে? কবে নাগাদ সবাই বেরিয়ে আসতে পারবে?

থাম লুয়াং, কিশোর ফুটবলার, গুহা, উদ্ধার অভিযান

একটানা বৃষ্টি হওয়ায় কাজটা আরও কঠিণ হয়ে পারছিল। পানি কমার বদলে বাড়ছিল আরও, উদ্ধারকর্মীরা পাম্প দিয়ে সেঁচেও কূল পাচ্ছিলেন না। ভেতর থেকে বাচ্চাগুলোকে বের করার একটাই উপায়, ডুবসাঁতার শিখিয়ে অক্সিজেন ট্যাংক পিঠে বেঁধে বের করে আনা। নতুবা পানি কমার জন্যে অপেক্ষা করা, সেটার জন্যে বসে থাকতে হতো অক্টোবর মাস পর্যন্ত। সাধারণত অক্টোবরেই থাম লুয়াং গুহার ভেতর থেকে পানি সরে যায়। কিন্ত চার মাস এই ছেলেগুলো কিভাবে থাকবে সেখানে? যে পাহাড়ে গুহাটার অবস্থান, সেই পাহাড়টা কয়েক জায়গায় খুঁড়ে ফেলা হলো। চারশো ফুট গর্ত করেও কোন খোঁজ পাওয়া গেল না, সুতরাং এই পথে কাজ হবে না বুঝে গেলেন সবাই। ঝুঁকি নিলেন উদ্ধারকর্মীরা। নব্বই জন ডুবুরীর একটা দল গঠন করা হলো, সেখানে চল্লিশ জন ছিলেন থাই নেভি সীলের সদস্য। বিদেশী ডুবুরীদের মধ্যে অধিকাংশই বৃটিশ। অসম্ভবকে সম্ভব করার মিশনে নামলেন ডুবুরীরা, শুরু হলো অপেক্ষার প্রহর।

এই কিশোরেরা যেখানে আটকা পড়েছিলেন, সেই জায়গাটা থেকে গুহামুখের দূরত্ব চার কিলোমিটারের বেশি। কখনও হেঁটে, কখনও কোমর পর্যন্ত কাদায় ডুবে, কখনওবা পানির নীচে দিয়ে ডুবসাঁতার দিয়ে কিশোরদের বের করে আনার চেষ্টা করেন ডুবুরীরা। প্রতিজন কিশোরের জন্যে দুইজন করে ডুবুরী, সামনে একজন, পেছনে একজন। গুহার মুখ থেকে একদম কিশোরদের অবস্থানের জায়গাটা পর্যন্ত দড়ি টেনে দেয়া হয়েছিল, যাতে সেটা ধরে পথ হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিশোরদের মুখে অক্সিজেন মাস্ক, অক্সিজেন সিলিণ্ডারটাও বহন করেছেন ডুবুরীরাই। গুহার ভেতরে টি-জংশন নামের একটা জায়গা এতই সরু যে, একজন মানুষের সেখান দিয়ে পার হওয়াটাও ভীষণ কঠিণ ব্যাপার ছিল। অক্সিজেন সিলিণ্ডার শরীর থেকে খুলে পার হতে হয়েছে সেসব ভয়ঙ্কর জায়গা।

থাম লুয়াং, কিশোর ফুটবলার, গুহা, উদ্ধার অভিযান

বড় সমস্যা ছিল গুহার ভেতরের ঘুটঘুটে অন্ধকার। হেলমেটে লাগানো টর্চে এই পথ ধরে এগিয়ে যাওয়াটা প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। সুস্থ-স্বাভাবিক একজন ডুবুরীর জন্যে এই পথটা অতিক্রম করতে ছয় থেকে এগারো ঘন্টা পর্যন্ত সময় লাগে। এতখানি সময় কিশোরেরা টিকে থাকতে পারবে কিনা, তাদের শারীরিক সক্ষমতা সেই পর্যায়ের আছে কিনা, এসব ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে সবাইকে। ছেলেগুলোকে উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন থাই নেভি সীলের সদস্য এক ডুবুরীও। কাজটা কতটা কঠিণ আর ভয়াবহ ছিল, সেটা আন্দাজ করতে কষ্ট হবার কথা নয়।

সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল আবহাওয়ার খবরটা। এমনিতেই একটানা বৃষ্টি হচ্ছিল সেই এলাকায়। পাম্প দিয়ে পানি সেঁচে ভারসাম্য রাখা হচ্ছিল কোনভাবে। কিন্ত আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছিল, তিনদিন পরেই শুরু হবে ভারী বর্ষণ। সেটা সাতদিন একটানা চলতে পারে। এরকম কিছু ঘটলে সেটা উদ্ধারকাজে বিপর্যয় ডেকে আনবে অনায়াসে। গুহার ভেতরে পানির উচ্চতা বাড়বে, সেখানে ডুবেই মারা যেতে পারে আটকা পড়া কিশোরেরা। সেকারণেই উদ্ধারকর্মীরা ঝুঁকিটা নিয়েছেন। আর হার না মানা মনের জোরে তাতে সফলও হয়েছেন তারা।

আর ডুবুরীরা প্রশংসা করেছেন কিশোর ফুটবলারদের সাহস আর মানসিক শক্তির। অন্ধকারে ঢাকা পানির নীচে ডুবে থাকা পথ পাড়ি দিতে তারা একটুও ভয় পায়নি, বাড়তি কোন সমস্যা তৈরি করেনি, ডুবুরীদের নির্দেশ মেনে চলেছে অক্ষরে অক্ষরে। ছেলেরা এভাবে সাহায্য না করলে উদ্ধার অভিযানে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল বলেই জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, “বারো-চৌদ্দ বছর বয়সী একটা কিশোর দুঃস্বপ্নেও এমন দৃশ্যের মুখোমুখি হবার কথা ভাববে না কখনও। আর সেখানে ওরা চ্যালেঞ্জটাকে জয় করেছে!” 

থাম লুয়াং, কিশোর ফুটবলার, গুহা, উদ্ধার অভিযান

পনেরো দিনেরও বেশি সময় দিনের আলো দেখেনি ওরা। বেঁচে থাকার আশাটাও হারিয়ে ফেলেছিল ছেলেগুলো। এগারোদিন শুধু নোংরা পানি খেয়ে টিকে ছিল কোনমতে। মাটির আটশো ফুট নীচের গুহা থেকে কবে উদ্ধার করা যাবে ওদের, এই প্রশ্নের জবাবটা দুই দিন আগেও ঠিকভাবে দিতে পারেনি উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। পুরো থাইল্যান্ডের প্রতিটা মানুষ এই ক’টা দিন সার্বক্ষণিক খবর রেখেছেন ওদের, ফেসবুকের নিউজফিডে একটা সুসংবাদ শোনার আশায় স্ক্রল করে গিয়েছেন, রিমোট হাতে নিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন, যাতে টিভি খুললেই এই বারোজন কিশোরের উদ্ধারের সংবাদটা শুনতে পান!

স্রষ্টার কাছে মনেপ্রাণে কিছু চাইলে তিনি নাকি ফেরান না কাউকে। থাইল্যান্ডের এতগুলো মানুষ এই ছেলেগুলোর জন্যে প্রার্থনা করেছে, বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ ওদের প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে ওদের খোঁজ নিয়েছে, এত মানুষের চাওয়া স্রষ্টা কি করে অপূর্ণ রাখেন?

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close