পনেরো দিনেরও বেশি সময় দিনের আলো দেখেনি ওরা। বেঁচে থাকার আশাটাও হারিয়ে ফেলেছিল ছেলেগুলো। এগারোদিন শুধু নোংরা পানি খেয়ে টিকে ছিল কোনমতে। মায়াতির আটশো ফুট নীচের গুহা থেকে কবে উদ্ধার করা যাবে ওদের, এই প্রশ্নের জবাবটা দুই দিন আগেও ঠিকভাবে দিতে পারেনি উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। পুরো থাইল্যান্ডের প্রতিটা মানুষ এই ক’টা দিন সার্বক্ষণিক খবর রেখেছেন ওদের, ফেসবুকেত নিউজফিডে একটা সুসংবাদ শোনার আশায় স্ক্রল করে গিয়েছেন, রিমোট হাতে নিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন, যাতে টিভি খুললেই এই বারোজন কিশোরের উদ্ধারের সংবাদটা শুনতে পান!

স্রষ্টার কাছে মনেপ্রাণে কিছু চাইলে তিনি নাকি ফেরান না কাউকে। থাইল্যান্ডের এতগুলো মানুষ এই ছেলেগুলোর জন্যে প্রার্থনা করেছে, বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ ওদের প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে ওদের খোঁজ নিয়েছে, এত মানুষের চাওয়া স্রষ্টা কি করে অপূর্ণ রাখেন?

গতকাল গুহার ভেতর থেকে চার কিশোরকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। পানিতে ডুবে থাকা সংকীর্ণ পথ পেরিয়ে তাদের বাইরে নিয়ে এসেছেন ডুবুরীরা। আজ উদ্ধার হয়েছে আরও চার কিশোর। মোট উদ্ধার হওয়া কিশোরের সংখ্যা তাই আটজনে দাঁড়িয়েছে। তেরো জনের ওই দলটির মধ্যে এখন কেবল পাঁচজন আছেন গুহার ভেতরে। সেখানে এখনও আটকে পড়াদের মধ্যে চার কিশোরের সঙ্গে আছেন তাদের ফুটবল দলের কোচও। উদ্ধারকৃত কিশোরদের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তবে তারা শারীরিকভাবে সুস্থ এবং সক্ষম আছে বলেই জানানো হয়েছে উদ্ধারকারী দলের সমন্বয়কের পক্ষ থেকে।

প্রায় দিন পনেরো আগে অনুশীলন শেষে কোচের সঙ্গে বেরিয়েছিল এই ক্ষুদে ফুটবলারেরা, এরপরে আর ফিরে আসে নি কেউই। কিন্ত তারা কোথায় গেছে, কি করছে কারো কাছেই কোন খবর ছিল না। তেইশে জুন নিখোঁজ হবার পরদিন মাঠ থেকে কয়েক মাইল দূরে থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় চিয়াং রাই প্রদেশের থাম লুয়াং গুহার সামনে পাওয়া যায় তাদের সাইকেলগুলো। ধারণা করা হয়, সেখানে বেড়াতে ঢুকেছিল কিশোরেরা। বেড়ানোর জন্যে ভেতরে ঢুকলে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বেরিয়ে আসার কথা সবার। কেউ তাহলে ফিরে এলো না কেন? গুহার ভেতরে ঢুকতে গিয়ে দেখা গেল, গুহামুখ ডুবে আছে পানির নিচে! আগের বিকেলে তুমুল বৃষ্টিতে বেড়েছে পানি, সেই পানি এসে ভাসিয়ে দিয়েছে গুহার সামনের অংশ, আর ভেতরের অনেকটা জায়গা। জমেছে কাদার ভারী স্তরও।

বলে রাখা ভালো, থাম লুয়াং নামের এই গুহাটি থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় গুহা। এটা দৈর্ঘ্যে প্রায় দশ কিলোমিটার লম্বা। সাপের মতো প্যাঁচানো এই গুহার ভেতরে অসংখ্য প্রকোষ্ঠ, গাইড ছাড়া ঢুকলে হারিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এই গুহার ভেতরে যে নিখোঁজ কিশোরেরা আছে, সেটা নিশ্চিত হয়েছিল পুলিশ। কিন্ত তারা জীবিত আছে কিনা, থাকলেও গুহার কোন অংশে আছে সেটা খুঁজে বের করতে পারছিল না কেউই। নিরাপত্তাবাহিনীর তরফ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এই তেরোজনকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে। অবশেষে নিখোঁজ হবার এগারো দিনের মাথায় বৃটিশ দুই ডুবুরী রিচার্ড স্ট্যানটন এবং জন ভলানথেন তাদের সন্ধান পান। উদ্ধারকারী এই দুই ডুবরীর কাছে আটকে পড়া কিশোরদের প্রথম প্রশ্ন ছিল-  “আঙ্কেল আমাদের কখন বের করবেন?” তার এই সোজাসাপ্টা প্রশ্নটার কোন সহজ জবাব জানা ছিল না রিচার্ড বা জনের৷

সন্ধান পাবার পর থেকেই ছেলেগুলোকে জীবিত উদ্ধারের প্রচেষ্টায় প্রাণপণে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন উদ্ধারকারীরা। বৃটেন থেকে অভিজ্ঞ ডুবুরীদের নিয়ে আসা হয়েছে, যারা গুহার ভেতরে আটকা পড়া বন্দীদের উদ্ধার করতে পারবেন। অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলো থাইল্যান্ডের নেভি সীল, থাই প্রধানপমন্ত্রী স্বয়ং সর্বক্ষণ খোঁজখবর রাখছিলেন অভিযানের অগ্রিগতির। সারাক্ষণই উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিদের আনাগোনা ছিল থাম লুয়াং গুহার সামনে চলা এই উদ্ধার অভিযানে।

তবে মিশনটা সহজ ছিল না মোটেই। গুহার ভেতরটা অন্ধকারে ঢাকা, পানিতে ডুবে আছে বেশিরভাগ জায়গা। ছেলেগুলোর অবস্থান ছিল গুহামুখ থেকে চার কিলোমিটার ভেতরে। সেখানে পৌঁছানোটা যুদ্ধজয়ের চেয়ে কম কিছু ছিল না। নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে সেই আটকে পড়া কিশোরদের জন্যে বারবার গুহার ভেতরে ঢুকেছেন ডুবুরীরা, পৌঁছে দিয়েছেন খাবার আর অক্সিজেন। কিন্ত মূল প্রশ্নটার কোন সুরাহা হচ্ছিল না। গুহার ভেতর থেকে এই দলটাকে বের করা হবে কিভাবে? কবে নাগাদ সবাই বেরিয়ে আসতে পারবে?

একটানা বৃষ্টি হওয়ায় কাজটা আরও কঠিণ হয়ে পারছিল। পানি কমার বদলে বাড়ছিল আরও, উদ্ধারকর্মীরা পাম্প দিয়ে সেঁচেও কূল পাচ্ছিলেন না। ভেতর থেকে বাচ্চাগুলোকে বের করার একটাই উপায়, ডুবসাঁতার শিখিয়ে অক্সিজেন ট্যাংক পিঠে বেঁধে বের করে আনা। নতুবা পানি কমার জন্যে অপেক্ষা করা, সেটার জন্যে বসে থাকতে হতো অক্টোবর মাস পর্যন্ত। সাধারণত অক্টোবরেই থাম লুয়াং গুহার ভেতর থেকে পানি সরে যায়। কিন্ত চার মাস এই ছেলেগুলো কিভাবে থাকবে সেখানে? যে পাহাড়ে গুহাটার অবস্থান, সেই পাহাড়টা কয়েক জায়গায় খুঁড়ে ফেলা হলো। চারশো ফুট গর্ত করেও কোন খোঁজ পাওয়া গেল না, সুতরাং এই পথে কাজ হবে না বুঝে গেলেন সবাই। ঝুঁকি নিলেন উদ্ধারকর্মীরা। নব্বই জন ডুবুরীর একটা দল গঠন করা হলো, সেখানে চল্লিশ জন ছিলেন থাই নেভি সীলের সদস্য। বিদেশী ডুবুরীদের মধ্যে অধিকাংশই বৃটিশ। অসম্ভবকে সম্ভব করার মিশনে নামলেন ডুবুরীরা, শুরু হলো অপেক্ষার প্রহর।

এই কিশোরেরা যেখানে আটকা পড়েছিলেন, সেই জায়গাটা থেকে গুহামুখের দূরত্ব চার কিলোমিটারের বেশি। কখনও হেঁটে, কখনও কোমর পর্যন্ত কাদায় ডুবে, কখনওবা পানির নীচে দিয়ে ডুবসাঁতার দিয়ে কিশোরদের বের করে আনার চেষ্টা করেন ডুবুরীরা। প্রতিজন কিশোরের জন্যে দুইজন করে ডুবুরী, সামনে একজন, পেছনে একজন। কিশোরদের মুখে অক্সিজেন মাস্ক, অক্সিজেন সিলিণ্ডারটাও বহন করেছেন ডুবুরীরাই। গুহার ভেতরে টি-জংশন নামের একটা জায়গা এতই সরু ছিল যে, একজন মানুষের সেখান দিয়ে পার হওয়াটাও ভীষণ কঠিণ ছিল। অক্সিজেন সিলিণ্ডার শরীর থেকে খুলে পার হতে হয়েছে সেসব ভয়ঙ্কর জায়গা।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল গুহার ভেতরের ঘুটঘুটে অন্ধকার। হেলমেটে লাগানো টর্চে এই পথ ধরে এগিয়ে যাওয়াটা প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। সুস্থ-স্বাভাবিক একজন ডুবুরীর জন্যে এই পথটা অতিক্রম করতে ছয় থেকে এগারো ঘন্টা পর্যন্ত সময় লাগে। এতখানি সময় কিশোরেরা টিকে থাকতে পারবে কিনা, তাদের শারীরিক সক্ষমতা সেই পর্যায়ের আছে কিনা, এসব ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে সবাইকে। ছেলেগুলোকে উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন থাই নেভি সীলের সদস্য এক ডুবুরীও। কাজটা কতটা কঠিণ আর ভয়াবহ ছিল, সেটা আন্দাজ করতে কষ্ট হবার কথা নয়।

সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল আবহাওয়ার খবরটা। এমনিতেই একটানা বৃষ্টি হচ্ছিল সেই এলাকায়। পাম্প দিয়ে পানি সেঁচে ভারসাম্য রাখা হচ্ছিল কোনভাবে। কিন্ত আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছিল, তিনদিন পরেই শুরু হবে ভারী বর্ষণ। সেটা সাতদিন একটানা চলতে পারে। এরকম কিছু ঘটলে সেটা উদ্ধারকাজে বিপর্যয় ডেকে আনবে অনায়াসে। গুহার ভেতরে পানির উচ্চতা বাড়বে, সেখানে ডুবেই মারা যেতে পারে আটকা পড়া কিশোরেরা। সেকারণেই উদ্ধারকর্মীরা ঝুঁকিটা নিয়েছেন। আর এখনও পর্যন্ত তাতে সফলও হয়েছেন। সবাইকে জীবিত আর অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা গেলেই আসবে শতভাগ সফলতা।

মানুষ মানুষের জন্যে- এই ব্যাপারটা এখনকার পৃথিবীতে প্রায় দেখাই যায় না। থাইল্যান্ডের গুহায় আটকা পড়া এই কিশোরেরা নিশ্চয়ই এই কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবে। মানুষের যে পরিমাণ প্রার্থনা, ভালোবাসা আর শুভকামনা ওরা পেয়েছে, সেটা এই যুগে খুব বেশি মানুষের ভাগ্যে জোটে না। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এই বারো কিশোর আর তাদের কোচ অবশ্যই ভাগ্যবান, তবে এই কারণে নয় যে তারা নতুন জীবন পেয়েছে। বরং ওরা ভাগ্যবান এই কারণে যে, অচেনা অজানা কোটি কোটি মানুষ ওদের ভালবেসেছে, ওদের উদ্ধারের জন্যে কেউ কেউ নিজের প্রাণও বিলিয়ে দিয়েছে অকাতরে!

Comments
Spread the love