বছর বারোর ছোট্ট ছেলেটার চোখেমুখে তীব্র আতঙ্কের আভাস। উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের কাছে তার একটাই জিজ্ঞাসা ছিল- “আঙ্কেল আমাদের কখন বের করবেন?” তার এই সোজাসাপ্টা প্রশ্নটার কোন সহজ জবাব জানা ছিল না উদ্ধারকারীদের৷

উৎকণ্ঠায় কেটে গেছে দশটা দিন, থাইল্যান্ডের বারোজন কিশোর ফুটবলার আর তাদের সঙ্গে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক কোচ যেন হুট করেই হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিলেন বেমালুম! কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না তাদের৷ অনুশীলন শেষে কোচের সঙ্গে বেরিয়েছিল এই ক্ষুদে ফুটবলারেরা, কিন্ত তারা কোথায় গেছে, কি করছে কারো কাছেই কোন খবর ছিল না। তেইশে জুন নিখোঁজ হবার পরদিন মাঠ থেকে কয়েক মাইল দূরে থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় চিয়াং রাই প্রদেশের থাম লুয়াং গুহার সামনে পাওয়া যায় তাদের সাইকেলগুলো। ধারণা করা হয়, সেখানে বেড়াতে ঢুকেছিল কিশোরেরা।

কিন্ত বিপত্তি বাঁধে অন্য জায়গাতে। বেড়ানোর জন্যে ভেতরে ঢুকলে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বেরিয়ে আসার কথা সবার। কেউ তাহলে ফিরে এলো না কেন? গুহার ভেতরে ঢুকতে গিয়ে দেখা গেল, গুহামুখ ডুবে আছে পানির নিচে! আগের বিকেলে তুমুল বৃষ্টিতে বেড়েছে পানি, সেই পানি এসে ভাসিয়ে দিয়েছে গুহার সামনের অংশ, আর ভেতরের অনেকটা জায়গা। জমেছে কাদার ভারী স্তরও। বলে রাখা ভালো, থাম লুয়াং নামের এই গুহাটি থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় গুহা। এটা দৈর্ঘ্যে প্রায় দশ কিলোমিটার লম্বা। ভেতরে অসংখ্য প্রকোষ্ঠ, গাইড ছাড়া ভেতরে ঢুকলে হারিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।

এই গুহার ভেতরে যে নিখোঁজ কিশোরেরা আছে, সেটা নিশ্চিত হয়েছিল পুলিশ। কিন্ত তারা জীবিত আছে কিনা, থাকলেও গুহার কোন অংশে আছে সেটা খুঁজে বের করতে পারছিল না কেউই। এই নয়টা দিন ধরে পুরো থাইল্যান্ডে নেমে এসেছিল শোকের আবহ। প্যাগোডা-গীর্জা-মন্দিরে প্রার্থনা হয়েছে প্রতিবেলায়, এই কিশোরেতা যাতে নিরাপদে ফিরে আসে, সেজন্যে যার যার ধর্মমতে প্রার্থনা করেছেন থাইল্যান্ডের মানুষ৷ নিরাপত্তাবাহিনীর তরফ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এই তেরোজনকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে। গত নয়দিন ধরে থাইল্যান্ডের সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশী আলোচিত বিষয় এটাই।

বৃটেন থেকে অভিজ্ঞ ডুবুরী আর উদ্ধারকর্মী আনা হয়েছিল গুহার ভেতরে ঢোকার জন্যে। গতকাল রাতে খুঁজে পাওয়া গেছে এই কিশোরদের, সঙ্গে তাদের কোচও আছেন। সবচেয়ে খুশীর ব্যাপার হচ্ছে, তারা সবাই জীবিত আর সুস্থ আছে। এই নয়দিনে গুহার ভেতরে প্রায় অভুক্তই থাকতে হয়েছে তাদের, ক্ষুধাজনিত ক্লান্তি ছাড়া আর তেমন কোন সমস্যা জেই কারোই৷ তবে ছেলেগুলো আশা হারিয়ে ফেলেছিল একদমই, ভেবেছিল আর কোনদিন পৃথিবীর আলো দেখা হবে না তাদের। কিন্ত ডুবুরীদের দেখে বেঁচে থাকার আশা ফিরে পেয়েছে ওরা।

পুরো অভিযানের তদারকি করছে থাইল্যান্ডের নৌবাহিনী। বৃটিশ ডুবুরী আর উদ্ধারকারী দল সাহায্য করছে তাদের। ছেলেগুলোর অবস্থান নিশ্চিত হবার পরে সাগরতলে ডুবুরী নেমেছে, পানির স্রোত আর কাদার বাধা ডিঙিয়ে ঢুকেছে গুহায়, খুঁজে বের করেছে তাদের৷ জরুরী ভিত্তিতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে খাবার আর পানি। কয়েকশো অক্সিজেন ট্যাংক নিয়ে নৌবাহিনীর শত শত ডুবুরী নেমেছেন নীচে। ভেতরে ঢোকার পরেও ওদের খুঁজে পেতে অনেকটা সময় চলে গেছে গুহার ভেতরেই ছোটখাটো একটা বেইজ ক্যাম্প বানিয়ে চলেছে সার্চ অপারেশন। এই ছেলেগুলোর সঙ্গে গত দশটা দিন ধরে পুরো থাইল্যান্ড, দেশটার প্রতিটা মানুষও যেন আটক হয়ে আছেন থাম লুয়াং নামের এই গুহার ভেতরে!

কিন্ত এই কিশোরদের কবে নাগাদ বের করে আনা যাবে, সেটা নিয়ে পরিস্কারভাবে কিছুই জানাতে পারছেন না থাইল্যান্ডের সেনা বা নৌবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মমর্তারা। তবে তাদের ভাষ্য, আটকে পড়া এই ছেলেগুলোকে গুহার ভেতর থেকে বের করে আনতে চার মাসও লেগে যেতে পারে সময়! কিন্ত কেন এতদিন লাগবে?

আগেই বলা হয়েছে, গুহাটি প্রায় দশ কিলোমিটার লম্বা। কোচসহ ওই কিশোরেরা যখন গুহায় ঢুকেছিল, তখন গুহামুখটা স্বাভাবিক শুকনো ছিল। কিন্ত ওরা গুহায় ঢোকার পরেই নামে বিপত্তি। শুরু হয়েছিল প্রবল বৃষ্টি। যদিও গুহার ভেতরে থাকায় কিশোরেরা হয়তো প্রথমে টের পায়নি তেমন কিছু। কিন্ত ভারী বৃষ্টিপাত গুহামুখ আর ভেতরটা ভেসে যায় জলে। ভেতরে নামে কাদার বন্যা। প্রাণ বাঁচাতে পিছিয়ে যেতে যেতে প্রায় চার কিলোমিটার ভেতরে ঢুকতে বাধ্য হয় কিশোরেরা। সেখানেই পাওয়া গেছে তাদের। তবে সেটুকু পথ অতিক্রম করতেও প্রচুর কসরৎ করতে হয়েছে ডুবুরীদের।

উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অক্টোবর পর্যন্ত গুহার ভেতরে প্রায় দুই-আড়াই কিলোমিটার পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকবে। ডুবসাঁতার না জানলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোন উপায় নেই। সাঁতার কেটে বেরুতে গেলেও জীবনের ঝুঁকি আছে। তাই আপাতত এই চার মাস কিশোরদের বের করে আনার ঝুঁকি নিতে চান না তারা। ভেতরে যাতে কিশোরেরা ভালো থাকেন, সেজন্যে পাঠানো হচ্ছে প্রচুর খাবার আর অক্সিজেন৷ সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্যে পাঠানো হয়েছে চিকিৎসকও। তিনি পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, শারীরিকভাবে অসুস্থ নয় কেউই৷ তবে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে ছেলেদের কেউ কেউ।

পাম্প দিয়ে পানি সেঁচার কাজ চলছে, কিন্ত সেঁচে কূল পাওয়া যাচ্ছে না। গুহার ভেতরে পানির উচ্চতা যাতে আর না বাড়ে, এজন্যেই এই ব্যবস্থা। পানি বাড়লে প্রাণ সংশয়ে পড়তে পারে এই কিশোরদের। এজন্যেই এই এলাকায় আবারও ভারী বৃষ্টিপাত হলে সেটা বিপদ ডেকে আনতে পারে বলেই ভাবছেন উদ্ধারকারীরা। এমনিতে প্রতিবছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থাম লুয়াং গুহাটা জলমগ্ন থাকে। কিন্ত এবার জুনের শেষ নাগাদই জলে ভেসে গেছে ভেতরটা। আর একদমই দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাতে আটকে পড়েছে এই তেরোজন!

কখন তাদের বের করা হবে, প্রশ্নের জবাবটা ছেলেগুলোর চোখের দিকে তাকিয়ে দিতে পারেননি ব্রিটিশ উদ্ধারকর্মী। অন্যদিকে তাকিয়ে বলেছেন, খুব শীগ্রই। সেই শীগ্রই-টা কবে আসবে, সেই আশায় নিশ্চয়ই ফিন গুনছে এই কিশোরেরা। বারোজন কিশোরের বাবা মায়েরাও পথ চেয়ে বসে আছেন, তাদের সন্তান তাদের বুকে ফিরে আসবে আবার৷ স্কুলে যাবে, ফুটবল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াবে পুরোটা মাঠ। থাইল্যান্ডের প্রতিটা মানুষও তো সেই আশাতেই স্রষ্টার কাছে হাত তুলছেন!

Comments
Spread the love