পাবলো পিকাসোর একটা উক্তি আছে, “Everything you can imagine is real”!

মানুষের মনের ক্ষমতা কতটা বিশাল এটা যদি মানুষ বুঝতে পারতো! মোনালিসা চিত্রকর্মের জন্যে বিখ্যাত হওয়া শিল্পী লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি একবার উড়োজাহাজের মডেল এঁকেছিলেন। আপনি জেনে অবাক হবেন সময়ের চেয়ে চারশো বছর এগিয়ে ছিলেন তিনি। কারণ, এই ছবি আঁকার চারশো বছরের বেশি সময় পরে গিয়ে সত্যিসত্যি উড়োজাহাজ আবিষ্কৃত হয়। একসময় রোবট নিয়ে কোনো সিনেমা দেখলেই আমার মেজাজ খারাপ হতো। কি সব যন্ত্র ফন্ত্র বিকট করে নড়াচড়া করছে, মানুষের সাথে যুদ্ধ করছে। মনে হতো এমন অবাস্তব এবং গাঁজাখুরি জিনিস মানুষ বানায় কি করে! অথচ, কি আশ্চর্য, রোবট এখন কতটা জীবিত হয়ে উঠছে।

আমি মূলত, টেলিপ্যাথি নিয়ে কথা বলতে চাই। টেলিপ্যাথি মনের ব্যাপারস্যাপার। এটা কি করে কাজ করে এই নিয়ে মানুষের আগ্রহের সীমা নেই। তাই, প্রারম্ভিকায় উদাহরণগুলো দিয়ে বলতে চাইছি যে, মানুষের মনের ক্ষমতার সীমাপরিসীমা নেই। এক মনেই মানুষ নিজস্ব অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করে।

আপনার হঠাৎ করেই মনে হতে পারে, আজকে দিনটি ভিন্ন। কিছু একটা আলাদা। মনে মনে ভাবছেন, আপনার প্রিয় কোনো আত্মীয় আজকে বাসায় আসবে যে কিনা রেজাল্ট কী, চাকরি কত দূর- এসব জিজ্ঞেস করে বিব্রত করে না। যে আসলে আপনার ভীষণ ভালো লাগে। যদিও তার আসার কোনো কারণ নেই। তবুও, আপনি যদি বাসায় ফিরে দেখেন আপনার সেই আত্মীয় এসে বসে আছে, আপনার দিকে তাকিয়ে হাসি দিচ্ছে কেমন লাগবে তখন!

আপনি কারো কথা ভাবছেন, আপনার চিন্তা জুড়ে প্রবলভাবেই তার অবস্থান। আপনার ইচ্ছে করছে তার সাথে কথা বলতে। ঠিক সেসময়ই মানুষটা আপনাকে ফোন দিলো।

এই ব্যাপারগুলো কেনো ঘটে?

  • ১৮৮২ সালের দিকে সর্বপ্রথম টেলিপ্যাথি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিলো। ইংল্যান্ডের ডাবলিনে রয়েল কলেজ অব সাইন্সের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্যার উইলিয়াম ব্যারেট টেলিপ্যাথি বিষয়ক তার গবেষণার প্রাথমিক সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে একটি সম্মেলন আহবান করেন। সেই সম্মেলনেই টেলিপ্যাথি এবং “Extra Sensory perception (ESP)” বিষয়ে ভালো করে গবেষণা করবার জন্যে গঠন করা হয়েছিলো “Society for Psychical Research/সোসাইটি ফরসাইকিক্যাল রিসার্চ”।

Society for Psychical Research- এর প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেডেরিক মায়ার্স প্রথম “টেলিপ্যাথি” শব্দটি ব্যবহার করেন। টেলিপ্যাথি শব্দটি গ্রীক টেলি ও প্যাথিয়া শব্দ থেকে এসেছে। টেলি শব্দের অর্থ হচ্ছে, দূরবর্তী, প্যাথিয়া শব্দের অর্থ অনুভূতি। মাঝখানে সত্যিকার অর্থে কোনো দৃশ্যমান যোগাযোগের উপায় নেই তবুও দূরবর্তী কেউ আপনার অনুভূতি বা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, তাদের কাছে যে চিন্তাগুলো স্থানান্তর হয়ে যাচ্ছে এই বিষয়টাকেই টেলিপ্যাথি বলা যেতে পারে।

যদিও এই বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ততটা শক্ত নয়। তবুও, প্যারাসাইকোলজির এই শাখাটিকে নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। দুইটি ভিন্ন তত্ত্বের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা টেলিপ্যাথিকে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন। প্রথমে রেডিও ওয়েব থিউরির কথা বলি। এই থিউরি বলছে, মানুষ যখন চিন্তা করে, তখন তার মস্তিষ্ক থেকে এক ধরণের রেডিও ওয়েব উৎপন্ন হয়। এই ওয়েব যদি অন্য কেউ গ্রহণ করে তবে সে মানুষটা কি চিন্তা করছে সেটা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। এই তত্ত্বের সমস্যা আছে। যদি এই থিউরি সত্য হয় তাহলে মানুষের মস্তিষ্কের তরঙ্গ বা ওয়েব অনেক দূর থেকে পরিমাপ করা যেতো। কিন্তু, এখন পর্যন্ত কোনো যন্ত্রই মানুষের মস্তিষ্কের তরঙ্গ কয়েক সেন্টিমিটারের বেশি দূর থেকে ডিটেক্ট করতে পারেনি। তাই এই তত্ত্বকে অনেকেই মেনে নিতে পারেননি।

টেলিপ্যাথির আরো একটি থিউরি হচ্ছে, Timeless/Spaceless Psychic Field theory। এই থিউরি আবার বলছে, প্রতিটি মানুষের চিন্তা-ভাবনা একটি “Psychic Field”-এ জমা থাকে। এই সাইকিক ফিল্ড থেকে চিন্তা ভাবনাগুলো জানা যায়, যারা টেলিপ্যাথি করতে পারেন তারা এইভাবে সাইকিক ফিল্ড থেকে চিন্তা ভাবনাগুলো ধরার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ধরণের Psychic Field এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখনো পরিষ্কার না।

অবশ্য, কোয়ান্টাম থিউরিতেও টেলিপ্যাথির একটা ব্যাখ্যা আছে। কোয়ান্টাম থিউরি বলছে, দুইটি মৌলিক কণিকা যারা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত তাদের যদি অনেক দূরে আলাদা আলাদা করে স্থাপন করা হয়, তাহলেও তাদের আচরণ একে অপরের উপর নির্ভর করবে। একটি কণিকা অন্য কনিকার আচরণ বুঝতে পারবে এবং সেইরকম আচরণের প্রভাব তার উপরও পড়বে। ধারণা করা হয় যে, কণিকা দুটো “নন-লোকাল” কোন ডোমেইনের মাধ্যমে যুক্ত থাকে, যা কিনা স্থান এবং সময়েরও উর্ধে। এই থিউরির হিসাবে, আমরা সবাই একে অপরের সাথে কোনো না কোনো “নন-লোকাল” ডোমেইনের মাধ্যমে যুক্ত। তার মানে হচ্ছে, দুইজন মানুষকে যদি এই গ্রহের দুইটি ভিন্ন প্রান্তেও নিয়ে যাওয়া হয়, তবুও তারা একে অপরের মনের অবস্থা বুঝতে পারার কথা!

গাথরী এক্সপিরিমেন্ট- তরুণ পদার্থ বিজ্ঞানী স্যার অলিভার লজ টেলিপ্যাথি গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করার চেষ্টা করেছিলেন। অলিভার লজ রেখাচিত্র স্থানান্তরের মাধ্যমে টেলিপ্যাথি করার চেষ্টা করেছিলেন। তার এই এক্সপিরিমেন্ট বেশ ভালোই সফল হয়। সোসাইটি ফর সাইকিক্যাল রিসার্চয়ের বিবরণীতে অলিভার লজের এই কাজটিকে “গাথরী এক্সপিরিমেন্ট” বলে উল্লেখ করা হয়। লিভারপুলের এক স্কুল শিক্ষক মি. ম্যালকম গাথরী এই গবেষণায় চিন্তা প্রেরণকারীর ভূমিকা পালন করেছিলেন। মি. গাথরীর কাজ ছিলো স্যার অলিভার লজের আঁকারেখাচিত্রে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে রাখা। মি. গাথরীর মস্তিষ্ক থেকে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে এই রেখাচিত্রের ধারণাটা স্থানান্তরিত হতো আবার অপর দিকে অবস্থিত এক মহিলার মস্তিষ্কে। মহিলাটি জানতেন না রেখাচিত্র কি হতে যাচ্ছে। কিন্তু, তিনি রেখাচিত্রের সেই প্রতিলিপিটা আঁকতেন যেটা তিনি গাথরীর টেলিপ্যাথির মাধ্যমে পেতেন!

এই গবেষণার পর টেলিপ্যাথি নিয়ে আরো অনেকেই গবেষণায় উৎসাহিত হয়।

১৯৭১ সালে এ্যাপোলো-১৪ এর চন্দ্র-অভিযানের সময় টেলিপ্যাথি গবেষণার সবচাইতে চাঞ্চল্যময় খবরটি প্রকাশিত হয়। সেসময় গুজব ছড়ায় যে, এ্যাপোলো-১৪ এর নভোচারী ক্যাপ্টেন এডগার মিচেল চাঁদ থেকে ESP সম্পর্কে একটি রহস্যজনক গবেষণা চালিয়েছেন। দাবি উঠে যে, তিনি চন্দ্র-যান থেকে মোট ছয়বার পৃথিবীর সাথে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে এই গবেষণার বিস্তারিত জানা যায়নি। এমনকি, সরকারিভাবেও এই গবেষণার কথা অস্বীকার করা হয়!

যাই হোক, অতীন্দ্রিয় ঘটনাবলিকে আমরা হয়ত কাকতালীয় বলে চালিয়ে দেই কিংবা মনের ভুল বলে! ব্যাখ্যাতীত ঘটনাবলীর জগতটাকে আমরা ভাবি বিভ্রান্তির জগত। বিজ্ঞান সর্বসম্মত একটি ব্যাখ্যা হয়তো দাঁড় করিয়ে ফেলবে, তখন আমরা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে সব বুঝে ফেলবো। কিন্তু, তাই বলে এখন মনের এই শক্তিকে শুধুই বিভ্রান্তি বলে উড়িয়ে দেয়া কি ঠিক হবে?

সূত্র- 

Comments
Spread the love