অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

মেয়েটা তার ‘ধর্ষক’ স্বামীকে খুনের পুরস্কার পেয়েছে!

উনিশ বছর বয়সী এক সুদানিজ মেয়েকে সে দেশের আদালত গত বৃহস্পতিবার মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেছে স্বামীকে হত্যার দায়ে। অথচ তাকে বাঁচাতেই সুদানের অনেক সাধারণ মানুষ এবং সংস্থা একত্রিত হয়েছে। সেখানকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠেছে প্রতিবাদের ঝড়। কেন একজন খুনীকে বাঁচানোর এত প্রচেষ্টা? কি ছিল মেয়েটির অপরাধ?

সুদানী মেয়ে নওরা হুসেইনের বিয়ে হয় ১৫ বছর বয়সে। বিয়েতে তার সম্মতি ছিল না। তাই সে বিয়ের পরে, স্বামীর ঘর না করে পালিয়ে আসে। আশ্রয় নেয় তার এক অ্যান্টির কাছে। সেটানেই কাটে তার পরের তিনটি বছর। এরপর নওরার বাবা তাকে জোড় করে, কৌশলে আবার স্বামীর বাড়ি পাঠায়। কিন্তু এবারও নওরা স্বামীর সংসার করতে অস্বীকৃতি জানায়।

নওরা যখন পুনরায় তার বিয়ে মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন তার স্বামীর আত্মীয়রা তাকে জোড় করে ধরে রাখে এবং স্বামীর দ্বারা ধর্ষিত হয় নওরা। নওরা হোসেনের আইনজীবী আল-ইমরান এ ঘটনার বর্ণনা দেন এভাবে, “যখন সে বিয়েটাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন তার স্বামীর ভাই এবং আরও দুই কাজিন তাকে রাজি করাতে চেষ্টা করে। নওরা তারপরও রাজী না হলে, তারা তাকে মারধোর করে একটা ঘরে আটকে রাখে। সেখানে দু’জন নওরার হাত-পা জোড়পূর্বক ধরে রাখে এবং তার স্বামী তাকে ধর্ষণ করে।”

পরের দিন আবারও যখন নওরার স্বামী তার সাথে জোড় করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে, সে তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। এতেই নওরার স্বামীর মৃত্যু ঘটে। সে পালিয়ে মা-বাবার কাছে আশ্রয় নিতে গেলে তার বাবা-মা তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

সুদানে বাল্যবিবাহ খুবই সাধারণ ঘটনা। সেখানে ক্ষেত্রেই মেয়েদের মতামতের মূল্য দেওয়া হয় না। সে দেশে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স মাত্র ১০ বছর। তাই, মেয়েদের মতের বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া এবং বিয়ের পর স্বামীর দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার ব্যাপারটি সেখানে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তাই এরকম ঘটনা ঘটলে সেদেশে কেউ প্রতিবাদ করে না। প্রতিবাদ তো পরের কথা, এ ধরণের ঘটনা নিয়ে কেউ আলোচনাও করে না কখনও।

তবু, নওরা হুসেইনের এই ঘটনায় যখন তাকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিল সুদানের একটি আদালত, তখন নওরার এ দুঃখজনক পরিণতি অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করল। মেয়েটির প্রতি সহানুভূতি, আর আদালতের এ অন্যায্য রায়ে ফুঁসে উঠল সুদানের অনেক সাধারণ মানুষ।

গত বৃহস্পতিবার নওরার মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা করা হলে সুদানের ওদুরমান শহরের আদালতে অনেক মানুষ জড়ো হয়। তারা নওরার শাস্তি কমানোর জন্য আদালতের কাছে দাবী জানায়। এত মানুষের অনুরোধে, সে আদালতের জজ, নওরার ধর্ষকের পরিবারের সদস্যদের কাছে জানতে চায়, তারা কি শাস্তি চায়। জজ তাদের বলে যে, তারা ক্ষমা করলে, নওরার শাস্তি কমানো যেতে পারে।

কিন্তু, নওরার স্বামীর পরিবারের সদস্যরা তার মৃত্যুদন্ডের বদলে টাকা দিয়ে মিমাংসা বা অন্য কোন শাস্তির আদেশ মেনে নিতে সম্মত হয়নি। তারা নওরার মৃত্যুদন্ড চেয়েছে। নওরার মৃত্যুদন্ডাদেশ দেওয়া হলে তারা তালি বাজিয়েছে এবং আনন্দে হইহুল্লোর করে উঠেছে।

আদালতের রায় শোনার পর, নওরা হুসাইন আদালতে উপস্থিত তার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেছে, “আদালতের জজ যখন আমার মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিল তা ছিল খুবই দুঃখজনক। আমি জানি, যখন আমি ফাঁসিতে ঝুলব, আমার জীবনের সব স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে যাবে।”

নওরা হুসাইনের পক্ষের আইনজীবী এ রায় এর বিপক্ষে ১৫ দিনের মধ্যে আপিল আবেদন করতে পারবেন। তার আইনজীবী ড. আদিল মুহাম্মদ আল-ইমরান বলেন, ‘নওরা শুধু আদালতের দ্বারা ই পরিত্যক্ত হয়নি, সে তার পরিবারের দ্বারাও পরিত্যক্ত হয়েছে। তবু ন্যায়বিচার পাবার অধিকার সবারই রয়েছে।’

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে নওরার এই দু:খজনক কাহিনী আলোচনার ঝড় তুলেছে। যারা নওরার পক্ষ নিয়েছে, তারা জাস্টিস ফর নওরা ও সেফ নওরা লেখা হ্যাশটাগ দিয়ে তার পক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে। আর এর ফলেই, এ ঘটনা আন্তর্জাতিক মাধ্যমেও আলোচনায় এসেছে বেশ। হাজার হাজার মানুষ নওরার মুক্তির জন্য Change.org নামের পিটিশনে সাইন করছে এবং তা শেয়ার করছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সুদানের গবেষক আহমেদ এলজোবিয়ার বলেন, “এধরণের একটা কেস এই প্রথমবারের মত মানুষের এতটা মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। বৈবাহিক ধর্ষণের ঘটনা সুদানে প্রায়ই ঘটে, কিন্তু কেউ এটা নিয়ে কথা বলেনা। নওরা হুসেইনের ঘটনায় এ ব্যাপারটায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।”

শাদ হামজা নামের বিশ বছরের এক তরুণী হোয়াটসঅ্যাপে নওরার ঘটনা জানার পর কোর্টে এসেছিল তাকে সমর্থন জানাতে। সে সিএনএন নিউজকে জানিয়েছে, “মেয়েদের ধর্ষণ বা হয়রানির ঘটনা সুদানে সবসময়ই ঘটে থাকে, কিন্তু নওরার ঘটনার মত এতটা ভাইরাল হয়নি আগের কোন ঘটনা। সুদানের মানুষ এ ব্যাপারে কথা বলতে লজ্জা পায়। এটা এখানে সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ। আশা করছি এ ঘটনার পর মেয়েরা তাদের বাবা-মা এবং অন্যান্যদের সাথে এসব ব্যাপারে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করবে না।

স্থানীয় কিছু বেসরকারি সংস্থা ও এনজিও এ ঘটনায় নওরা হুসাইনকে সমর্থন দিচ্ছে। তারা জানিয়েছে, নওরার এ সাহসী প্রতিবাদ সুদানের মেয়েদের, তাদের সাথে হওয়া অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।

নওরার আইনজীবীরা বলছে, মৃত্যুদন্ডের আদেশ যথাযথ হয়নি। আসামী নিজেকে রক্ষা করার জন্য স্বামীকে হত্যা করেছে। তাছাড়া, হত্যার পূর্বে সে মানসিক এবং শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। সে একজন আসামী নয় বরং সে নিজেই অন্যায়ের শিকার। নওরা হুসেনের শাস্তি কমানোর দাবীকে নায্য দাবী বলে মনে করছেন তারা।

তথ্যসূত্র- সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close