Kazi Tahmina

Kazi Tahmina

আমার প্রিয় শিক্ষক কে?

অনেকে!

আমার প্রথম ও প্রধান শিক্ষক আমার মা। একবার রোজার ভেতরে আমার বাসায় আম্মা আর ছোট বোনকে ইফতারের দাওয়াত দিয়েছি। ইফতারির মেন্যু ছিল-সবজি খিচুড়ি, দেশি মুরগির ঝোল, ফালুদা আর ম্যাংগো মিল্কশেক। আম্মা এসে খুশি হওয়ার বদলে কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়েই বললেন, ‘ফালুদা থাকলে আবার ম্যাংগো মিল্কশেকের কি দরকার? এটা বাহুল্য!’ আমার আম্মা বাহুল্যে বিশ্বাসী না, ইফতারে কোটি কোটি আইটেম খাওয়ায় বিশ্বাসী না।

আম্মার বাসায় যদি মেহমান আসার কথা থাকে, কিংবা অন্য রোজাদারদের খাওয়ানোর ব্যাপার থাকে, তাহলেই শুধু রকমারী ইফতার আয়োজন হয়। নিজেদের জন্য হরেক রকম রান্নাও হয়, রোজার ভেতর বড় জোর দু’চারবার।

শুধুমাত্র আম্মার কারণেই খাবার নষ্ট করার আগে তিনবার ভাবি- অথবা নিজের জন্য খুব বাহুল্য আয়োজন করলে নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হয়।

ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, আমরা নিজেরা যা খাই, আমাদের বাসায় যারা কাজে সাহায্য করতে আসেন, আম্মা তাদেরও একই খাবার দেন। আমরা বয়োজ্যেষ্ঠ যে কোন মানুষ, সামাজিক অবস্থানে আমাদের যত নিচেই থাকুন না কেন-তাদেরকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতে শিখেছি- প্রতিটা মানুষকে মানুষ জ্ঞান করতে শিখেছি। আমাদের আম্মার কাছ থেকেই শিখেছি মানবতাবাদের, জীবনাচরণে ন্যায়নিষ্ঠতার প্রথম পাঠ।

আজকাল কোন কোন বাসায় যখন দেখি, ইফতারিতে প্রায় শ’খানেক আইটেম থাকার পরও গৃহকর্মীর পাতে ওঠে উচ্ছিষ্ট, আর তাদের জন্য ভাত রান্নায় কেনা হয়, কম দামী কাঁকরভরা চাল; অতঃপর তারাই রোজায় সংযম, ইসলামে সাম্যবাদ নিয়ে যখন ওয়াজ নসিহত করতে থাকেন, আর গৃহকর্মী, গাড়িচালক, দারোয়ানরা কত অকৃতজ্ঞ আর লোভী তা বলতে থাকেন; মানুষকে প্রতিনিয়ত অসম্মান করতে থাকেন- নির্বাক শ্রোতা হয়ে ভাবি- ইনারাই হাজার হাজার টাকা খরচ করে সন্তানকে নামী বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে আর গণ্ডা কয়েক কোচিং করিয়ে সন্তানকে সুশিক্ষিত (!) করতে চান! অথচ ভুলে যান- ঘর ও পরিবারই সুশিক্ষার প্রাথমিক সূতিকাগার।আমি ভাগ্যবান যে আমার প্রথম শিক্ষকদ্বয় নিজেরা সুশিক্ষিত ছিলেন।

আমার দ্বিতীয় অথচ প্রধানতম শিক্ষক আমার বাবা- আমাদের আব্বু। আব্বু ছিলেন একজন বোকা-সোকা (!) ভাল মানুষ ; মহাত্মা গান্ধী ছিলেন না তিনি, খুব সাধারন মানুষ ছিলেন। দোষ-গুনে ভরা; তবুও কোথায় যেন একটা অসাধারনত্ব ছিল আমার বাবার মধ্যে। নিজের অবস্থানে থেকে যতটুকু করা সম্ভব ছিল, তার চেয়ে সব সময়ই কিছুটা ভাল (সবার জন্য) করার চেষ্টা করতেন। আব্বু ছিলেন একেবারেই অন্য রকম-নিজের স্বার্থ নিয়ে কখনো ভাবতেন না; ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত মানুষের উপকার করে বেড়াতেন…আর পড়াশোনা নিয়ে থাকতেন। আব্বু বই কিনতে খুব ভালবাসেন। আমাদের বাসা ভর্তি ছিল বই আর পেপার-পত্রিকায়।

আমাদের ছোটবেলাটা বেশ অন্যরকম ছিল। খুব একটা সচ্ছল ছিলাম না আমরা। আজ বলতে খুব গর্ব হচ্ছে যে আমার আব্বু যদিও উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন, অন্যান্য আরও আট দশটা সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারীর মতো তিনি স্রোতে গা ভাসিয়ে দেননি। তাই অনেক এবং অঢেল সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁর কোন উপরি ছিলনা (যদিও ইচ্ছা করলেই তিনি তার সমপর্যায়ের সহকর্মীদের মত কোটিপতি হতে পারতেন)। তাঁর সততার কারণে আব্বুকে অনেকে বলতো বোকা, কেউ কেউ বলতো পাগল।

আব্বু বেঁচে থাকতে খুব ছোটবেলায় যতবার গ্রামে গিয়েছি, আব্বু আমাদের নিয়ে হাঁটতে বের হতেন- বিলের ধারে, ধানক্ষেত, আখক্ষেত, বাঁশবাগান, ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের পূর্বপুরুষদের জমির সীমানা দেখাতেন। আব্বু বেঁচে থাকতে বলতেন-‘শিক্ষিত হওয়া মানে শুধু বই পড়ে বিদ্বান হওয়া নয়-যে তার শেকড় চেনেনা- মাটি ভালোবাসেনা , মানুষ ভালোবাসেনা, মাছ, গাছ, ফুল, পাখি চেনেনা-তার শিক্ষা অসম্পূর্ণ’ । আব্বুর কাছ থেকেই শিখেছি বারবার শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া।

আমি আমার বাবা মায়ের কাছ থেকে যে অজস্র জিনিস শিখেছি, তার মধ্যে আর একটা হল কৃতজ্ঞতা বোধ । এই কৃতজ্ঞতা যে শুধু বাবা মায়ের প্রতি তা নয়; আমার কৃতজ্ঞতা বোধের ব্যাপ্তি বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।এখন বহুদূর জীবন পাড়ি দিয়ে এসে বুঝতে পারি ছোট ছোট প্রাপ্তিতে আনন্দ পেতে -সহজ, নির্ভেজাল সুখের মুখ দেখতে চাইলে জীবনকে গ্রহণ করতে হয় নতজানু- দুহাত পেতে।

আমার প্রধানতম দুই শিক্ষক তাদের যাপিত জীবন থেকে আমাদের শিখিয়েছেন সূর্যের মত প্রখর হতে, কল্যাণময়,অথচ আপোষহীন হতে-যাতে দিনশেষে কারো দীর্ঘশ্বাসের কারণ না হই।

আমার জীবনে আরো অসংখ্য শিক্ষক রয়েছেন যাদের কাছে আমি জীবনের তরে কৃতজ্ঞ- যাদের কাছে শুধু পড়াশোনাই শিখিনি- শিখেছি জীবনের অপরাপর গুরুত্বপূর্ণ পাঠসমুহ।

আমাদের স্কুলের মেসেরুদ্দিন স্যার, মান্নান স্যার, খোদেজা আপা, চীরবালা আপা,রণজিৎ স্যার, শিল্পী স্যার; কলেজের শেলি আপা, ফেরদৌসি আপা, আম্বিয়া আপাসহ আরো অনেকে আমাদের যেমন প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনে সাহায্য করেছেন- তেমনি নানাভাবে পাল্টে দিয়েছেন, সমৃদ্ধ করেছেন ভাবনাজগত, জীবন ও পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।

আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শিক্ষকদের কথা বলতে গেলে উপাখ্যান হয়ে যাবে। তাদের অনেক যেমন শিখিয়েছেন শব্দের রং-রূপ, ঘ্রাণ ভালোবাসতে, উদার থেকে উদারতম হতে- হাতে ধরে যেমন শিখিয়েছেন সাহিত্য ও ইতিহাসের অলি-গলি; তেমনি কয়েকজন শিখিয়েছেন একজন শিক্ষকের কেমন হওয়া উচিত না, কোনভাবেই উচিত না- অজান্তেই নিজেদের আচরণে বুঝিয়েছেন কেমন শিক্ষক হলে শিক্ষার্থীদের মনোজগতে ভালোবাসার বদলে ক্রোধ ও গ্লানির জন্ম হয়।

তারপরেও বলতেই হবে- প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় দলের কাছ থেকেই শিখেছি প্রচুর- আর সে কারণেই অথবা অকারণেই শিখেছি তাদের শ্রদ্ধা করাও।

জগতের সকল শিক্ষক মণ্ডলীর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা…

 

– কাজী তাহমিনা, শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-