যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু-১’। মহাশূন্যে এখন একটুকরো বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে আপন কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করছে কৃত্রিম এই উপগ্রহটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ভালো রকমের তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে এই স্যাটেলাইট স্থাপনের ভালো-মন্দ নিয়ে। একটা দেশের জন্যে নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকাটা খুবই জরুরী, এতে কোন সন্দেহ নেই। অন্যের ওপর নির্ভর হয়ে থেকে বা ভাড়া করা স্যাটেলাইটের সার্ভিস দিয়ে তো যার যাই হোক, দেশের আভ্যন্তরীন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করা যাবে না।

অতি আগ্রহী কেউ কেউ সস্তা প্রচারণার আশায় স্যাটেলাইট নিয়ে গানও বেঁধে ফেলেছেন! সেসব গান আবার ইউটিউবে আপলোড করা হয়েছে, মানুষজনের হাস্যরসের খোরাক যোগাচ্ছে এগুলো। জনগণকে বিনোদন দেয়ার বেলায় বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন, এটা ভেবে তিনিও নেমে গিয়েছেন প্রতিযোগীতায়। লণ্ডন প্রবাসী এই ‘জাতীয়তাবাদী যুবরাজ’ অনেকদিন ধরেই ওসামা বিন লাদেন স্টাইলে ভিডিওবার্তা পাঠাচ্ছেন দেশবাসী তথা বিএনপি কর্মীদের উদ্দেশ্যে। এবারও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের পরে তার একটা ভিডিওবার্তা দেখা যাচ্ছে ফেসবুকে। সেখানে রকেট আর স্যাটেলাইট নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তারেক রহমান, জানিয়েছেন, এরকম স্যাটেলাইট স্থাপন করা ছিল তার মরহুম পিতার স্বপ্ন!

১৯৮০ সালের এক সন্ধ্যার কথা স্মরণ করে তিনি জানিয়েছেন, তার পিতা এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ফাইল ক্যাবিনেটের একটা ফাইলের ভেতরে তিনি রকেটের ছবি দেখেছিলেন। কথপোকথনের এক পর্যায়ে জিয়াউর রহমান তাকে জানিয়েছিলেন, এটার নাম স্যাটেলাইট। ভিডিওবার্তায় তারেক রহমান দাবী করেছেন- জার্মানীর সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা জিয়াউর রহমানের আছে, এমনটাই ছেলেকে জানিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি।

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, তারেক যে কথাগুলো বলেছেন বা যে দাবী করেছেন, সেটার সপক্ষে কোন ভ্যালিড ডকুমেন্টস আছে কিনা, সেই প্রশ্নটা তুললাম না। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, তারেক রহমান সত্যি কথা বলছেন। কয়েক মূহুর্তের জন্যে নাহয় মেনে নিলাম, কৃত্রিম উপগ্রহ স্থাপন করাটা জিয়াউর রহমানে স্বপ্ন ছিল। নিজের বাহিনীর সদস্যদের হাতে অকালে নিহত হওয়ায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেননি তিনি, এটাও মেনে নেয়া গেল। কিন্ত তার মৃত্যুর পরে তো বিএনপি নামের দলটা দুইবার পূর্ণমেয়াদে ক্ষমতায় থেকেছে, দশ বছর সরকার পরিচালনা করেছে। কেন তারা সেই সময়টায় দলের প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্ন পূরণ করলো না?

ভিডিওতে তারেক রহমান বলেছেন, বাবার সাথে রকেট বা স্যাটেলাইট নিয়ে এই কথপোকথনটা তার প্রায়ই মনে পড়তো, এখনও মনে পড়ে। ১৯৯১-১৯৯৬, কিংবা ২০০১-২০০৬ সালের মধ্যে ক্ষমতায় থাকার এই দশ বছরে কেন সেটা মনে পড়লো না? এখন, এত বছর বাদে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সময় কেন মনে পড়লো? স্যাটেলাইট স্থাপন করে তথ্যপ্রযুক্তির পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া তো দূরে থাক, উল্টো স্যাটালাইট কার্যক্রমের নামটা বঙ্গবন্ধুর নামে হওয়াতে এর আগে একবার এই প্রোজেক্টটাই বাতিল করে দিয়েছিল বিএনপি সরকার! তখন ‘জিয়াউর রহমানের স্বপ্নে’র কথা মনে পড়েনি কারো? দেশের তথ্য পাচার হয়ে যাবে, এমন অদ্ভুত জুজুর ভয়ে সাবমেরিন কেবলে সংযুক্ত হতে না চাওয়াটা কেমন স্বপ্নপূরণ? এই সিদ্ধান্তটা দেশকে কতটা পিছিয়ে দিয়েছে, লণ্ডনে বসে ভিডিও পাঠানো তারেক রহমান কি সেটা বোঝেন?

অনেক আগে একটা গল্প শুনেছিলাম। পাশের বাড়ির এক লোকের ছেলে ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছে, সেটা শুনে প্রতিবেশী একজন বলেছেন- বৃত্তি পেয়েছে তো কি হয়েছে, মেট্রিকে দেখো ধরা খাবে। সেই ছেলে মেট্রিকেও ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করে গেল। প্রতিবেশী বললেন, পাশ করেছে তো কি হয়েছে, ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারবে না। সেই ছেলে জেলার সেরা কলেজেই ভর্তি হয়ে গেল, কলেজ পাশও দিয়ে ফেললো। সেই পাশের মিষ্টি খেয়ে প্রতিবেশী বললেন, ইন্টার পাশ আর এমন কি, এই ছেলে ভার্সিটিতে তো টিকবে না। ছেলে মাশাল্লাহ দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লো, স্কলারশীপ নিয়ে বিদেশেও পড়তে গেল। সেটা শুনে প্রতিবেশী বললেন, বিদেশে গেছে তো কি হয়েছে? চাকরী তো পাবে না। চাকরী পেলেও দেখবা, বেতন পাবে না।

কিছুদিন পরে প্রতিবেশী ভদ্রলোকের বাড়িতে বিয়ের কার্ড এলো, সেই ছেলেটার বিয়ে। অনুষ্ঠানে ভরপেট খাওয়াদাওয়ার পরে পান চিবুতে চিবুতে তিনি বললেন, বিয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে, আমি নিশ্চিত, বাচ্চা হবে না! বছরখানেক পরে খবর এলো, বাচ্চাও হয়েছে। সেটা শুনে প্রতিবেশী নির্বিকার চিত্তে বললেন- বাচ্চা হয়েছে? দেখো গিয়ে, দেখতে কাকের মতো কুচকুচে কালো হয়েছে, নইলে ল্যাংড়া-খোঁড়া হয়েছে!

বিএনপির অবস্থা এখন এই নিন্দুক প্রতিবেশীর মতো। কি রেখে কি বলবে, নেতাদের কেউই সেটা ভেবে পাচ্ছেন না। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যেমন বললেন- “ওটা(স্যাটেলাইট) আগে ঘুরুক, পৃথিবী পরিক্রম করুক। তারপর দেখা যাবে।” 

বিএনপি দলটাই এখন বিনোদন দানকারী একটা গোষ্ঠী হয়ে গেছে। শীর্ষনেতা থেকে আঁতিপাতি সবাই শুধু লোক হাসিয়েই যাচ্ছেন। নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনটা পুরো জাতির জন্যেই একটা গর্বের বিষয়, সেটা তারা গিলতেও পারছেন না, উগরে ফেলে দিতেও পারছেন না। তারা শুধু ক্ষমতায় যাবার অলীক স্বপ্নে বিভোর, যেন ঈশ্বর স্বয়ং দূত পাঠিয়ে তাদের চেয়ারে বসিয়ে দেবেন!

মন খারাপ থাকলে আমি আজকাল বিএনপির কাজকর্ম গভীরভাবে অনুসরণ করি, তাদের নেতারা কি বললেন, সেসবের খোঁজ নিই। মনটা ফুরফুরে হয়ে যায় মূহুর্তের মধ্যেই। কাজী মারুফ বলেছিলেন, হলে গিয়ে তার সিনেমা দেখতে। আমি বলবো, কাজী মারুফের সিনেমা দেখুন আর না দেখুন, তারেক রহমানের ভিডিও অবশ্যই দেখুন, মির্জা ফখরুল বা বিএনপি নেতাদের বক্তব্য অবশ্যই শুনুন। মন ভালো হয়ে যাবে, এটা গ্যারান্টি।

Comments
Spread the love