তারানাথ তান্ত্রিকের সাথে আমার প্রথম পরিচয় পশ্চিম বাংলার রেডিও অনুষ্ঠান সাসপেন্সের মাধ্যমে। সেখানে দুয়েকটি অডিও গল্প শুনেছিলাম। বেশ ভাল লেগেছিলো। তারপর সিদ্ধান্ত নেই নিজের চিত্ত্বকে আর বঞ্চিত করবো না। একেবারে হার্ডকপি পড়ে বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে রস আস্বাদন করবো! বাংলা ভাষায় ভৌতিক বিষয়বস্তুর অভাব চিরকালের। যাও-বা দু’একটা পাওয়া যায়, তার ভিত্তি বেশ নড়বড়ে। যৌক্তিকতার অভাব দেখা যায়। এদিক থেকে তারানাথ তান্ত্রিককে আদর্শ চরিত্র হিসেবেই পেয়েছি। ভৌতিক বিষয়বস্তুর সারকথা হলো, লেখাটি পড়ে পাঠক পুরোপুরি ভয় না পেলেও কিছুটা গা ছমছম করবে। মানে বলতে চাইছি চাইছি ভয় পেয়ে রাত্রে লাইট জ্বালিয়েই ঘুমানোর মত ভয় না পেলেও, আশেপাশে যেন দু’চারবার চোখ মেলে দেখে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। তারানাথ খুব সূক্ষ্মভাবে পাঠককে ভয়ের রাজ্যে প্রবেশ করাবে, একদম বৈঠকী বর্ণনার ভঙ্গীতে। যুক্তি যেখানে কুপোকাত, প্রমাণ যেখানে ব্যর্থ, সেখানেই পাঠকের কাছে হাজির হয়েছে অনবদ্য এই চরিত্রটি।

তারানাথ তান্ত্রিকের সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় হলেও তাঁর হাতে কিন্তু এই চরিত্রের পূর্ণতা পায়নি। তার মৃত্যুর পরে তারানাথ তান্ত্রিক চরিত্রটিকে বিস্তৃত করার কাজটি করেছে তাঁরই পুত্র তারাদাস বন্দোপাধ্যায়। এককথায় বলা যায় মহামতি বিভূতিভূষণ তারানাথের উপর যতটা উদাসীন ছিলেন, ঠিক ততটাই যত্নশীল ছিলেন তাঁর পুত্র তারাদাস বন্দোপাধ্যায়। জীবদ্দশায় বিভূতিভূষণ তারানাথকে নিয়ে মাত্র দুটি গল্প লিখেছিলেন, পাঠকপ্রিয়তার পরেও। এ তথ্য থেকেই ব্যাপারটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে বিভূতিভূষণ তারানাথের উপর সুবিচার করেননি।

তারাদাসের লেখনীতেই আমরা পরিপূর্ণ তারানাথ তান্ত্রিককে পেয়েছি, তার বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে দীক্ষা লাভ। তারাদাস বন্দোপাধ্যায় আরেকটি কাজ খুব সূক্ষ্মভাবে এবং চতুরভাবে করেছেন, সেটি হলো প্রাচীন গ্রাম বাংলার আবহটাকে গল্পের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যেটা পাঠকদের তারানাথ তান্ত্রিকের প্রতি আরো বেশী আকৃষ্ট করেছে বলে মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ একটা গল্পের কথা বলা যায়। বঙ্গদেশে একসময় সেভাবে আলুর প্রচলন ছিলো না। তখন আলু খাওয়াকে একরকম সৌখিনতা মনে করা হতো। এরকম সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয় আমরা তারানাথ তান্ত্রিকের মাধ্যমেই পেয়েছে তারাদাস বন্দোপাধ্যায়ের লেখনীর মাধ্যমে। তারানাথ নাগরিক জীবনে অভ্যস্থ হলেও কিংবা নগর থেকেই গল্পের সূত্রপাত হলেও সে বিবরণ খুব কম এসেছে, একেবারে আসেনি বললেও ভুল বলা হবে না।

বিভূতিভূষণের লেখনীতে আমরা তারানাথকে অনেক বেশী রূপকের সাহায্য নিতে দেখেছি, কিছুটা নির্ভরশীল হতে দেখেছি। কিন্তু তার পুত্র তারাদাস বন্দোপাধ্যায়ের বর্ণনাতে আমরা তারানাথকে অনেক বেশী মানবিক, অনেক বেশী সংবেদনশীল, অনেক বেশী অনুভূতিপ্রবণ দেখেছি। তাই বলে তারাদাস বন্দোপাধায়ের লেখনীতে তারানাথ তান্ত্রিকের মৌলিক ভিত্তিতে কোন পরিবর্তন আসেনি। শুধুমাত্র ইম্প্রোভাইজ হয়েছে। এক্ষত্রে ভাল উদাহরণ হতে পারে সত্যজিত রায়ের ফেলুদা আর সন্দ্বীপ রায়ের ফেলুদা। ওখানেও যেমন ভেতরের বস্তুটা একই ছিল, শুধু উপস্থাপনা ভিন্ন; এখানেও বোধ করি তারানাথ তান্ত্রিকের ক্ষেত্রে বিষয়টা একইরকম হয়েছে।

তারানাথ তান্ত্রিক অনেক কারণে বাংলা সাহ্যিতের অনন্য এক চরিত্র। সেটা হলো যুক্তিতে। পাঠক যখন একের পর এক রহস্যের জট খুলে গল্পের গভীরে প্রবেশ করবে, তখন আর বিষয়টাকে অবাস্তব মনে হবে না। বাংলা ভাষায় ভৌতিক রচনাগুলোর মধ্যে এই যুক্তির অভাবটাই থাকে। এই তারানাথ চরিত্রটা এই ধরণের দুর্বলতা থেকে মুক্ত। খুব সর্ন্তপনে পাঠকের মনের ভেতর ঢুকে যাওয়াতেই ভৌতিক রচনার সার্থকতা এবং তারানাথ তান্ত্রিক এই জায়গাটিতে দারুণভাবে সফল।

ভৌতিক রচনাগুলোতে বিশ্বাস অবিশ্বাসের ব্যাপার থাকে এবং প্রায় সব লেখকই পাঠকের ওপর বিষয়টা ছেড়ে দেন। কিন্তু লেখক তারাদাস বন্দোপাধ্যায় বলেছেন, তারানাথের এসব কাহিনী তার চিন্তাপ্রসূত নয়। বেশিরভাগই কল্পনাপ্রসূত। তারানাথের প্রকৃত পরিচয়টাও লেখক পাঠকদের ভেবে নিতেই বলেছেন। এরকম একদম আমাদের বাংলা অনুসঙ্গ নিয়ে, পশ্চিমা কোন এলিমেন্ট ছাড়াই হরর কোন ক্যারেক্টার বাংলা সাহিত্যে খুব বেশী আছে বলে মনে হয় না। যারা একদম নিজেদের গ্রাম-বাংলার গল্প শুনে ভয় পেতে চান, তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য!

Comments
Spread the love