সিনেমা হলের গলি

সেক্স সিম্বল কিংবা সাহসী কন্যা- No means NO!

বছর সাতেক আগে তনুশ্রী দত্ত যখন বলিউডে নিজের ক্যারিয়ারটা গুটিয়ে আমেরিকার বিমানে চড়ে বসেছিলেন, তখন কেউ ভাবতে পারেননি যে এই তরুণী একদিন ভারতে ফিরে এসে সিনেমা জগতে একটা আলোড়ন সৃষ্টি করে দেবেন। সবাই তনুশ্রীর কথা ভুলে গিয়েছিলেন, তার সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় আচরণটার কথাও মনে ছিল না কারো। দশ বছর আগে তনুশ্রী যখন যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছিলেন নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে, তখন বিচার পাবার বদলে উল্টো হেনস্থা হতে হয়েছিল তাকে, তার ক্যারিয়ারটা একরকম গলাটিপে মেরে ফেলা হয়েছে। সেই তনুশ্রী এতকিছুর পরেও হার মানেননি, শেষটা দেখে ছাড়বেন বলে পণ করে রেখেছিলেন হয়তো। এজন্যেই নিজের অবস্থান থেকে একচুল দূরে সরেননি, সবকিছু ভুলে গিয়ে সামনেও এগিয়ে যেতে চাননি। কারন যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হয়েছিল, সেটা চাইলেও ভোলা যায় না।

অর্ণব গোস্বামীর সঙ্গে তনুশ্রীর একটা ইন্টারভিউ দেখছিলাম কয়েকদিন আগে। নানা পাটেকরের ইস্যুটা নিয়েই কথা হচ্ছিল। অর্ণব বেশ ঘাঘু সাংবাদিক, শাহরুখ-সালমানের মতো তারকাদেরও তিনি প্রশ্ন করে বেকায়দায় ফেলে দেন অনেক সময়। তার সামনে পুরো একঘন্টা ধরে প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর ভীষণ স্মার্টলি দিয়ে গেলেন তনুশ্রী, তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিবরণ নিজের অবস্থান থেকে এত ডিটেইলে বললেন, মনে হলো যেন নিজ চোখে সবকিছু দেখতে পেলাম। 

তনুশ্রী দত্ত, নানা পাটেকর, মি টু মুভমেন্ট, যৌন হয়রানি, মিস ইন্ডিয়া, বলিউড

এই তরুণী অসম্ভব গুছিয়ে কথা বলতে পারেন, এবং কথার মধ্যে অপ্রয়োজনীয় অংশ প্রায় কিছুই থাকে না। তনুশ্রীর সম্পর্কে অদ্ভুত একটা শ্রদ্ধাবোধও জন্ম নিলো মনে। অথচ তনুশ্রীকে আমরা চিনতাম সেক্স সিম্বল হিসেবে, তিনি ‘আশিক বানায় আপনে’তে খোলামেলা দৃশ্যে অভিনয় করেন, বোল্ড ফটোশ্যুট করেন, আইটেম গানে নাচেন, এগুলোই ছিল তনুশ্রীর পরিচয়। তনুশ্রীর মধ্যে আমরা হয়তো শুধু আবেদনটাই খুঁজতাম, এর বেশি কিছু নয়।

২০০৪ সালে মিস ইন্ডিয়া হবার পরে সিনেমার অফার আসা শুরু হয়েছিল তনুশ্রীর কাছে, সেখান থেকেই সিনেমাপাড়ায় তার আগমন। অভিনেত্রী হবেন, বা বলিউড সুপারস্টারদের তালিকায় তার নাম থাকবে, এতসব উচ্চকাঙ্ক্ষা তার ছিল না। মিস ইন্ডিয়ার জন্যে রেজিস্ট্রেশন যখন করেছিলেন, তখন সেই প্রতিযোগীতায় ভালো করার ইচ্ছেটা ছিল, কিন্ত বলিউড তার স্বপ্নের ত্রিসীমানায় ছিল না কখনোই। তনুশ্রী জানতেন না, এই বলিউডই তাকে তার জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় স্মৃতিটা উপহার দেবে, সে দুঃসহ স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফিরবে বছরের পর বছর ধরে।

বলিউডে তখনও খুব শক্ত কোন অবস্থান তৈরি হয়নি তনুশ্রীর। ২০০৮ সালের কথা এটা। কয়েকটা সিনেমায় প্রধান নারী চরিত্রে ততদিনে অভিনয় করে ফেলেছেন তনুশ্রী, বোল্ড একটা ইমেজও তৈরি হয়ে গেছে তার। ‘আশিক বানায়া আপনে’ সিনেমায় ইমরান হাশমির সঙ্গে তার সাহসী চুম্বনদৃশ্য ঝড় তুলেছিল তরুণদের মনে। ‘হর্ন ওকে’ নামের এক সিনেমায় একটা আইটেম নাম্বারে পারফর্ম করার প্রস্তাব এলো তার কাছে। তনুশ্রীর সিনেমার চুক্তি বা অর্থ সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো দেখতেন তার বাবা, বাবার সম্মতিতেই কাজটা করতে রাজী হয়েছিলেন তনুশ্রী। কারন তিনি বা তার বাবা, কেউই এতে ঝুঁকির কিছু দেখেননি। 

মি টু মুভমেন্ট, যৌন হয়রানি, তনুশ্রী দত্ত, নানা পাটেকর, ফারিয়া শাহরিন

কিন্ত ঝামেলাটা শুরু হয়েছিল শুটিঙের সেটে। প্রথমে বলা হয়েছিল, তনুশ্রী একাই পারফর্ম করবেন আইটেম গানে, পেছনে থাকবেন ব্যকগ্রাউন্ড ড্যান্সারেরা। সেভাবেই শুটিং এগিয়ে যাচ্ছিল। সিনেমার অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিলেন নানা পাটেকর। শুটিঙের সেটে তনুশ্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ট হবার চেষ্টা করছিলেন তিনি। হুটহাট গায়ে হাত দেয়া, বা নাচের কোরিওগ্রাফারকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই নাচের ইনস্ট্রাক্টর হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা, এসব চলছিল। তনুশ্রীর ভাষায়, তিনি বেশ অবাক হয়েছিলেন এসব দেখে, কারণ নানা পাটেকরের তখন শুটিং সেটেই থাকার কথা নয়। তিনি প্রতিবাদও করেছিলেন প্রযোজক, পরিচালক আর কোরিওগ্রাফারের কাছে। কিন্ত প্রতিকারের বদলে উল্টো তাকে বলা হয়, আইটেম নাম্বারে নানা পাটেকরের সঙ্গেই তাকে পারফর্ম করতে হবে।

শুধু তাই নয়, গানের মধ্যে ইন্টিমেট সীন(ঘনিষ্ঠ দৃশ্য)- এ অভিনয়ের জন্যেও চাপাচাপি করা হয় তাকে। রাজী না হলে তাকে ভয় দেখানো হয়েছিল এই বলে যে, অপেশাদারিত্বের অভিযোগ তুলে তার ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়ে দেয়া হবে। তাতেও যখন তনুশ্রীকে টলানো যায়নি, তখন উগ্রপন্থী একটা সংগঠনকে ডেকে এনে তার গাড়িতে হামলা চালানো হয়। সেই হামলার ভিডিওগুলো দেখলে এখনও আঁতকে ওঠেন তনুশ্রী। জনা বিশেক লোক তার গাড়ির আশেপাশে চিৎকার চেঁচামেচি করছে, গাড়ির ওপরে উঠে লাফাচ্ছে কেউ কেউ, কাঁচ ভেঙে ফেলছে, আবার কেউবা টায়ার পাংচার করার কাজে ব্যস্ত- আর গাড়ির ভেতরে অসহায় অবস্থায় বসে আছেন তনুশ্রী দত্ত আর তার বাবা-মা। চব্বিশ বছরের একটা মেয়ের জন্যে এই পরিস্থিতিটা কতটুকু বিভীষিকাময় হতে পারে, ভাবুন একবার। 

তনুশ্রী দত্ত, নানা পাটেকর, মি টু মুভমেন্ট, যৌন হয়রানি, মিস ইন্ডিয়া, বলিউড

সেদিন পুলিশ এসে তনুশ্রীকে উদ্ধার করেছিল রাজনৈতিক গুণ্ডাদের হাত থেকে। এরপরে তনুশ্রী আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছেন নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে, থানায় অভিযোগ জানিয়েছেন, অভিযোগ করেছেন টিভি এন্ড ফিল্ম আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশনেও। কোন জায়গা থেকেই সাড়া পাননি, উল্টো বলা হয়েছে, তিনি নাকি সস্তা প্রচারণার জন্যে করছেন এসব! নানা পাটেকরের লোকজন তাকে হুমকি দিয়েছে, আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন থেকে তাকে চুপ থাকতে বলা হয়েছে, থানায় জিডি করতে গেলে তনুশ্রীকে শুনতে হয়েছে, নানা’র মতো তারকার বিরুদ্ধে এসব ঝামেলায় না জড়ানোই ভালো! এই অন্যায়ের বিচার না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছেন তনুশ্রী, ধীরে ধীরে ডুবে গিয়েছেন ডিপ্রেশনে, কাজ থেকে সরে গিয়েছেন দূরে।

আমেরিকায় এখন নিজের জীবনটা নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছেন তনুশ্রী। ভয়াল স্মৃতিগুলো এখন আর তাকে তাড়া করে ফেরে না। তবে তিনি সেই দিনগুলোর কথা ভুলে যাননি, প্রতিটা ঘটনা তার মস্তিস্কের কুঠুরিতে জমা আছে স্পষ্টভাবে। ভারতে কয়েক মাসের জন্যে বেড়াতে এসেও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় সেই হয়রানির প্রসঙ্গটা নতুন করে তুলেছেন তিনি, সম্মানহানির মিথ্যে ভয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে চাননি। স্পষ্টভাবে আবারও বলেছেন। তার প্রতি অন্যায় করা হয়েছিল, এবং সেই অন্যায়ের কোন প্রতিকার তিনি পাননি। অন্যায়ের শিকার হয়ে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল, আর যারা অন্যায় করেছে, তারা ঠিকই বুক ফুলিয়ে ভারতে বসবাস করছে, শীর্ষ তারকারাও তাদের সঙ্গে অভিনয় করছে চুটিয়ে। নানার পাশাপাশি তনুশ্রী অভিযোগ এনেছেন সেই সিনেমার পরিচালক-কোরিওগ্রাফার এবং তার অভিনীত আরেক সিনেমা চকলেটের পরিচালকের বিরুদ্ধেও। 

এখন ২০০৮ নয়, ২০১৮ সাল। সেজন্যেই হয়তো তনুশ্রীর পাশে অনেকে দাঁড়াচ্ছেন, তার সাহসের প্রশংসা করছেন, #মি_টু মুভমেন্টে এসে তনুশ্রীকে সমর্থন জানাচ্ছেন। অন্যরকম একটা ঝড়ের শুরু হয়েছে তনুশ্রীর হাত ধরে, সেই ঝড়ে এখন টালমাটাল পুরো বলিউড। তনুশ্রীকে দেখে অনেকেই তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির ঘটনা স্বীকার করছেন এখন, দশ-বিশ বছর আগের ঘটনাও সামনে আসছে এখন। অলোক নাথের মতো প্রবীণ অভিনেতা বা বিকাশ ভেলের মতো মেধাবী পরিচালকদের নামও জুড়ে যাচ্ছে এতে। 

তনুশ্রী দত্ত, নানা পাটেকর, মি টু মুভমেন্ট, যৌন হয়রানি, মিস ইন্ডিয়া, বলিউড

কেউ কেউ অবশ্য এখনও তনুশ্রীকে ফেমসিকার বলেই বিশ্বাস করে। তাদের ধারণা, বিগ বস অনুষ্ঠানে এন্ট্রি পাবার লোভেই এতসব কাহিনী বানাচ্ছেন তনুশ্রী। সেই সমালোচনার জবাবও তনুশ্রী দিয়েছেন, বলেছেন-

“আমেরিকায় আমি যেভাবে আছি, সেই জীবনটা নিয়ে আমি প্রচণ্ড খুশি। আমাকে কেন বিগ বসের ওই ভাঁড়ামিতে যোগ দিতে হবে? এটার মতো বাজে অনুষ্ঠান আমি আমার জীবনে আর একটাও দেখিনি। ওরা তো আজ নতুন আমাকে চাইছে না, পাঁচ-ছয় বছর আগে থেকেই লেগে আছে। কোটি কোটি টাকা অফার দেয়া হয়েছে, আমি রাজী হইনি। কেন হবো? সালমান খান কারো কাছে ভগবান হতে পারে, আমার কাছে তো নন। এই অনুষ্ঠানটাও আমার কাছে গার্বেজের বেশি কিছু নয়। আলোচনায় আসতে চাইলে আমি বোল্ড ফটোশ্যুট করলেই পারতাম, বা ভীষণ ইন্টিমেট কোন দৃশ্যে অভিনয় করে ঝড় ফেলে দিতে পারতাম। আমার তো দরকার নেই নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে আলোচনায় আসার।”

তনুশ্রীর একটা কথা ভীষণ ভালো লেগেছে। তিনি বলছিলেন- “আমি খোলামেলা হয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছি বা চুম্বন দৃশ্যে অভিনয় করেছি, তার মানে এই নয় যে যাকে তাকে যেভাবে খুশি আমার শরীর স্পর্শ করার অনুমতিও দিয়ে রেখেছি। এমনটা যদি কেউ ভেবে থাকে, তাহলে খুবই ভুল ধারণা সেটা। অভিনেত্রীর কথা বাদই দিলাম, আমি যদি বেশ্যাও হয়ে থাকি, অনুমতি ছাড়া আমাকে স্পর্শ করার অধিকার তো কারো নেই। সেই অনধিকার চর্চাটা কেউ করতে গেলে আমি এভাবেই রুখে দাঁড়াবো, আগে যেমনটা দাঁড়িয়েছি…”

এই মেয়েটা সাক্ষাৎ অগ্নিকণ্যা! 

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles