ছেলেটির নাম তন্ময় বক্সী। জীবনে প্রথমবারের মতো যখন সে কাউকে কম্পিউটারের সামনে বসে কোডিং করতে দেখেছিল, তখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। কাজটির আগামাথা কিছুই বুঝতে পেরেছিল না সে। ভেবেছিল, লোকটি বুঝি নিছকই আনন্দের জন্য কাজটি করছে, যেভাবে কম্পিউটারে নানা রকম ভিডিও গেমস খেলে আনন্দ পায় আর দশটি সাধারণ মানুষ। কিন্তু তন্ময়ের মনে বিস্ময়ের অন্ত ছিল না যখন সে বছরখানেক পর জানতে পেরেছিল, কোডিং করা ওই লোকটির জন্য কেবলই বিনোদনের অনুষঙ্গ ছিল না। বরং কোডিং ছিল তার পেশা। এ কাজের মাধ্যমে সে টাকা উপার্জন করত, এবং সেই টাকা দিয়েই জীবন চলত তার!

যখন এই সত্যটি তন্ময়ের সামনে উন্মোচিত হলো, তখন থেকেই তার মনের মধ্যে কোডিং এর ব্যাপারে এক অন্যরকমের ভালো লাগা ও আকর্ষণ তৈরি হলো। ছোট্ট তন্ময় মনস্থির করল, একদিন সে নিজেও কোডিং করবে। অবশ্য ছেলেবেলায় এমন তো কতজনেই ভাবে। শিশুমনে প্রথম দেখা যেকোন কাজই ভালো লেগে যায়, আর সে নিজেও তা করতে চায়। আমরা নিজেরাও তো ছোটবেলায় পাইলটকে বিমান চালাতে দেখলে ভাবতাম নিজেও বড় হয়ে পাইলট হব, ডাক্তারকে মানুষের চিকিৎসা করতে দেখলে ভাবতাম বড় হয়ে ডাক্তার হব, কিংবা সিনেমার পর্দায় স্পাইডারম্যানকে দেয়াল বেয়ে উঠতে দেখলে ভাবতাম আমরাও একদিন এভাবেই বহুতলবিশিষ্ট দালানের দেয়াল বেয়ে তরতর করে উঠে যাব।

তবে আর দশটা সাধারণ মানুষের সাথে তন্ময়ের পার্থক্যটা এখানেই। অধিকাংশ মানুষেরই ছেলেবেলার ভালো লাগা ছেলেবেলাতেই মরে যায়। বড় হতে হতে সে কথা তার আর মনেই থাকে না। আর কাজটি যে সে বড় হয়ে নয়, ছোট বয়সেও করে ফেলতে পারে, এমন চিন্তাধারণাও আসে খুব কম সংখ্যক মানুষেরই মনে। কিন্তু তন্ময় সেরকম কেউ নয়। সে তার ছেলেবেলার স্বপ্নকে খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়েছিল, এবং সে স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য বড় হওয়া পর্যন্ত তর সয়নি তার। মাত্র ছয় বছর বয়স থেকেই কম্পিউটারের সাথে গড়ে ওঠে তার অবিচ্ছেদ্য সখ্যতা, এবং তখন থেকেই তার টুকটাক কোডিং ও প্রোগ্রামিংয়ের হাতেখড়ি হয়। এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে এসব কাজে একদম পাকা হয়ে ওঠে।

এতটাই যে, মাত্র নয় বছর বয়সে সে আইওএস অপারেটিং সিস্টেমে চালানোর উপযোগী একটি প্রোগ্রাম বা অ্যাপ্লিকেশনও তৈরি করে ফেলে। শুধু তৈরিই যে করে তা নয়, অ্যাপল কর্তৃপক্ষের কাছে সেটির একটি কপি পাঠিয়েও দেয়, এবং অ্যাপল সেটি গ্রহণ করে অনুমোদনও দেয়। সেটিকে উন্মুক্ত করে দেয় অ্যাপ স্টোরে! ভাবতে পারছেন, একটি নয় বছরের ছেলের জন্য এটি ঠিক কত বড় একটি অর্জন!

তবে খুব অল্প বয়সেই সে যেমন সাফল্যের দেখা পেয়েছে, তেমনি মুদ্রার উল্টো পিঠে ব্যর্থতার দেখাও পেয়েছে। অ্যাপল কর্তৃপক্ষ তার অনেকগুলো অ্যাপ প্রত্যাখ্যানও করেছে, কেননা হয় সেগুলো অ্যাপলের নীতিমালা মেনে তৈরি করা হয়নি, নয়ত সেগুলোতে স্ক্রিন সাইজ বা টেক্সট সাইজে কোন খুঁত ছিল। এইসব ব্যর্থতায় কখনোই ভেঙে পড়েনি তন্ময়। বরং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছে ভুলত্রুটি শুধরে নিজেকেই ছাড়িয়ে যাওয়ার। এবং তার এই মানসিক দৃঢ়তা কাজেও দিয়েছে। সে দিনের পর দিন পরিশ্রম করে গেছে প্রোগ্রামিংয়ের নিত্যনতুন ধারা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে, এবং তার মাধ্যমে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করতে, ইতিপূর্বে সে যেসব ভুল করেছে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি না করতে। তারপর নিজেকে সমৃদ্ধ করার সেই প্রচেষ্টায় যখন সাফল্যের দেখা মিলেছে, তখন সে উপলব্ধি করেছে আত্মতুষ্টি নয়, বরং ক্রমাগত নিজের উন্নতিসাধনই হলো সাফল্য লাভের মূলমন্ত্র।

আর এই উপলব্ধি আসার পর সে যা করেছে তা আরও বিস্ময়কর। সে শুধু নিজের দক্ষতাকেই আরও উন্নত করে থেমে থাকেনি, বরং চেয়েছে নিজের নবলব্ধ জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে, যাতে তার মত এ খাতে আরও যারা আছে তারাও যেন সমান উপকৃত হয়। সে ভালোবাসে কোন বিনিময়ের প্রত্যাশা না করেই মানুষকে শিক্ষাদান করতে। তাই সে ইউটিউবে নিজের টিউটোরিয়াল চ্যানেল খুলেছে, এবং তার মাধ্যমে দর্শকদের সাথে ভাগ করে নিয়েছে হ্যাকিং, কোডিং, প্রোগ্রামিং, গণিত ও অ্যালগরিদম সম্পর্কে নিজের যাবতীয় জ্ঞান। এবং এসবের মাধ্যমে মাত্র ১২ বছর বয়সেই সে পেয়েছে ‘World’s Youngest Programmer on IBM’s artificial intelligence platform – Watson’ এর খেতাব।

পাশাপাশি একজন পাবলিক স্পিকার হিসেবেও তার রয়েছে যথেষ্ট সুনাম। ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিওতে সে তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা যেমন ভাগ করে নিয়েছে দর্শকদের সাথে, তেমনি অনেক মৌলিক বক্তৃতাও দিয়েছে, যেখানে সে কথা বলেছে সাফল্যের মূল মন্ত্র নিয়ে। এমনকি সে বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ পেয়েছে লাস ভেগাসে IBM Interconnect 2016 ও ব্যাঙ্গালোরে IBM Developer Connect এর মতো বহুজাতিক নানা সম্মেলনেও। সব মিলিয়ে নিজের টিনেজ শুরুর আগেই কানাডার নাগরিক তন্ময়ের ঝুলিতে রয়েছে এমন সব অর্জন, যা অনেক মানুষের সারা জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার চেয়েও ঢের বেশি।

অনেকেই বলতে পারেন, তন্ময়ের এত এত সাফল্যের কারণ সে এমন একটি পরিবেশে বেড়ে উঠেছে যা তার মেধার পরিপূর্ণ বিকাশে সাহায্য করেছে, যেখানে তার যা যা দরকার সবই সে সময়মত পেয়েছে। এমন কথাও হয়ত বলা যেতে পারে, কানাডার মত উন্নত প্রযুক্তি ও সুযোগ সুবিধার দেশে না জন্মে সে যদি আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশে জন্মাত, তবে আজ সে প্রোগ্রামার হওয়ার সুযোগ পাওয়া তো দূরে থাক, তাকে নিজের চেয়েও বেশি ওজনের ব্যাগ ঘাড়ে ঝুলিয়ে স্কুলে যেতে হতো, আর বাবা-মা, শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী মিলে তার মধ্যে এমন এক বিকৃত সংস্কৃতির বীজ বপন করে দিত যে, যে বয়সে সে অ্যাপলের জন্য অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেছে, ওই বয়সে সে ‘পিএসসিতে জিপিএ-৫ না পেলে আমার জীবনটাই বৃথা হয়ে যাবে’ শ্রেণীর অতি হাস্যকর বুলি আউড়ে বেড়াত।

কেউ এ ধরণের দাবি করলে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই বলে তন্ময়ের কৃতিত্বটিকেও যেন কেউ খাটো করে না দেখে। তার মতো সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তো পশ্চিমা বিশ্বের আরও লক্ষ লক্ষ শিশু বেড়ে ওঠে। কিন্তু তার মত হতে পারে কয়জন? সংখ্যাটা খুবই সামান্য। কারণ নির্দিষ্ট কোন কাজের প্রতি ভালোবাসা আর সেটিকে ধ্যান-জ্ঞান বানিয়ে ফেলে একটানা কাজ করে যাওয়ার মানসিকতাই তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। আর তাই তন্ময়ের এ গল্প থেকে আমরা খুব গুরুত্বপূর্ণ দুইটি শিক্ষা লাভ করতে পারি।

১/ আমাদের বয়স এখন যতই হোক না কেন, এখনও আমাদের সামনে সুযোগ আছে জীবনে সফলতা অর্জনের, যদি কিনা আমরা নিজেদের কাজকে সেভাবেই ভালোবাসি, যেমনটা তন্ময় বেসেছিল তার কাজকে। আর এক্ষেত্রে একটি কথা সবসময়ই মনে রাখা দরকার, নিজের প্রফেশনকে প্যাশন বানিয়ে সফলতা অর্জনের সম্ভাবনা যতটা ক্ষীণ, নিজের প্যাশনকে প্রফেশন বানিয়ে সফলতা অর্জনের সম্ভাবনা ঠিক ততটাই উজ্জ্বল।

২/ একজন মানুষ জীবনে সফলতা পায় তখনই, যখন তার উপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেয়া হয় না। বরং তাকে তার পছন্দের কাজ করার স্বাধীনতা দেয়া হয়, মুক্ত বিহঙ্গের মত খোলা আকাশে উড়ে বেড়ানোর সুযোগ করে দেয়া হয়। তাই আমাদের দেশের অভিভাবকদেরও উচিৎ নয় জোর করে তাদের সন্তানদেরকে শিক্ষা গেলানো। এতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। বরং শিশুর মানসিক বিকাশ ব্যহত হয়, আর তার মধ্যে সুপ্ত প্রাকৃতিক প্রতিভা অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। তাই অভিভাবকদের উচিৎ ছোটবেলা থেকেই তাদের সন্তানকে সেই সব কাজে উৎসাহিত করা, যেগুলোতে তাদের সন্তানের আসলেই আগ্রহ আছে। কেবলমাত্র এভাবেই তারা পারেন তাদের সন্তানের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

তথ্যসূত্র- www.kenfolios.com

 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-