আমাদের আনসাং হিরো!

স্বাধীনতার যুদ্ধ চলছে। এদেশের প্রাণের নেতা, স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কারাগারে বন্দী। ওইরকম পরিস্থিতিতে যে মানুষটা বাংলার স্বাধীনতা অর্জনে রেখেছেন অগ্রণী ভুমিকা, যার সুদক্ষ নেতৃত্ব ছাড়া আমাদের স্বাধীনতার কথা চিন্তাও করা যেত না, সেই বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের জন্মবার্ষিকীতে ‘এগিয়ে চলো’জানায় স্যালুট ও একরাশ শ্রদ্ধা। যতদিন পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের নাম লেখা থাকবে, ততদিন তাজউদ্দিন আহমদের নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে…

তাঁকে নিয়ে লিখেছেন- Mashroof Hossain 

মাশরুফ হোসেইন

“আনসাং হিরো” বলে একটা কথা আছে- এঁরা সেই বীরের দল, যারা ইতিহাসের গতিপথ পালটে দেয়, কিন্তু তাদের নিয়ে তেমন কিছু বলা হয়না- নায়কের পাশে ইতিহাস স্রেফ ভুলে যায় তাঁর অবদানকে।

এই বীরেরা নিঃশেষে প্রাণদান করে, সমস্ত কিছুর বিনিময়েও পেছপা হয়না নিজের লক্ষ্য থেকে, শত প্রলোভনেও আদর্শচ্যুত হয়না।

মহাভারতের অভিমন্যু ,ঘটোৎকচ, ইলিয়াডের হেক্টর- এঁরা সাহিত্যে আনসাং হিরো।

আমাদের ইতিহাসেও এরকম আনসাং হিরো রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু নামক উজ্জ্বল নক্ষত্রটির পাশে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা সার্বক্ষণিক যে তারাটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সব রকমের দুর্যোগকে প্রবল মেধা, ক্ষুরধার মস্তিষ্ক এবং হিমালয়সম দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় মোকাবিলা করেছিলেন, “নেভার সে ডাই” স্পিরিটটিকে যিনি নিজের সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে ধারণ করেছিলেন- এই লোকটিকে আমরা তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেইনি।

নেতার মৃত্যুর পর এই লোকটি চাইলেই পোশাক পালটে আয়েশের জীবন যাপন করতে পারতেন, সেই প্রস্তাব তাকে একাধিকবার দেয়া হয়েছিল। কিন্তু না, আদর্শের সাথে প্রতারনার চাইতে নিশ্চিত মৃত্যুকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু যখন জেলে ফাঁসির দিন গুনছেন, প্রবল প্রশাসনিক দক্ষতায় এই লোকটি তখন সামলে গিয়েছেন একটা যুদ্ধ পরিচালনার মত অনিশ্চিত, ভয়াবহ কঠিন কাজ।

দেশ স্বাধীন হবার আগ পর্যন্ত নিজের পরিবারের সাথে একদিনও থাকেননি, গোটা যুদ্ধকালীন সময়ে নিজের ঘড়িকে বাংলাদেশের সময়ে মিলিয়ে রেখেছিলেন। বিনা প্রটোকলে সেই সময়ে আশ্রয় দিতে চাওয়া বন্ধু রাষ্ট্রের আতিথেয়তা উপেক্ষা করে আত্মসম্মানবোধের প্রথম পাঠ ইতিহাসের খাতায় লিখে গিয়েছেন নিজ কর্মের মাধ্যমে।

চশমা পরা, ছোটখাট, পড়াশোনায় ভয়াবহ রকমের ভালো এই লোকটিকে পাকিস্তানিরা খোদ বঙ্গবন্ধুর চাইতেও বেশি ভয় পেত কোন কোন ক্ষেত্রে, তাই তো পাকি জেনারেলদের লেখায় তাকে নিয়ে দেখা যায় নোংরা সব বিষেদাগার।

তুচ্ছ তেলাপোকাও যখন আজকের প্রচারের যুগে প্রবল আমিত্বে মশগুল থাকে, এক হাতে একটা জাতির ক্রান্তিকালীন ইতিহাস লিখতে থাকা এই লোকটি তখন পরম মমতায় বলে ওঠেন- আমি এমনভাবে কাজ করে যাব যাতে কাজ শেষে দেশটাকেই সবাই দেখতে পায়, আমি হারিয়ে যাই।

তা তাকে হারিয়ে যাবার সমস্ত আয়োজন হায়েনার দল সম্পন্ন করে ফেলেছিলো বটে। কিন্তু বাংলার মাথার মুকূট হবার নিয়তি নিয়ে ক্ষণজন্মা যে লোকটি জন্মেছিলেন, তাকে কি এতো সহজে মুছে ফেলা যায়??

চে গুয়েভারাকে গুলি করার সময় তিনি ঘাতককে বলেছিলেন, “মারো, কাপুরুষ, একটা মানুষকেই তো খালি হত্যা করতে পারবে।”

আসলেই তো, মানুষকে গুলি করে হত্যা করা যায়- আদর্শকে হত্যা করবে এমন বুলেট আদৌ আছে কি?

তাই তো কোন এক বিস্মৃত সময়ে অভাগা এই জাতির বুকে এই লোকটার পৃথিবীতে আগমনের দিনে কারও কারও বুকে হাহাকার বয়ে যায়। হু হু করে ওঠে বুকটা, কল্পনা করতে চায়- ইতিহাসে যা লেখা আছে তা ভুল, এই লোকটা মরেনাই, বঙ্গবন্ধু মরে নাই- স্বাধীনতার পর জন্মযোদ্ধা এই লোকটার সাথে বঙ্গবন্ধুর কোন দূরত্ব তৈরি হয়নাই, দাঁতাল শুওরের দল বঙ্গবন্ধুর পাশে তার অবস্থানকে চাটুকারিতা দিয়ে দখল করে নেয়নাই…

মূকুট তো তার নামেই ছিলো, জন্মেছিলো আজ,
শত বুলেটেও মরলো কোথায়, বাংলার বুকে তাজ?

শুভ জন্মদিন, বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ!!!

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-