খেলা ও ধুলা

যে মানুষটা পার্শ্বনায়কই থেকে যান…

সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিনের শেষে পরিসংখ্যানের সরু গলিতে ঢুঁ মারতে হলো বেশ ক’বার। চতুর্থ ইনিংসে ৩২১ বা এর বেশি রান তাড়া করে টেস্ট ক্রিকেটে জয়ের নজির আছে মাত্র বিশটি। এরমধ্যে উপমহাদেশের মাটিতে এমন কীর্তি হয়েছে মাত্র পাঁচটি। বাংলাদেশ কখনও তিনশো রান তাড়া করেও জেতেনি, শেষ ইনিংসে সর্বোচ্চ রান চেজ করে টাইগারদের জয়ের রেকর্ডটা ২১৯ রানের। তবুও এই ম্যাচে বাংলাদেশ এখনও জয়ের স্বপ্ন দেখছে, আর সেই স্বপ্নটা একাই টিকিয়ে রেখেছেন তাইজুল ইসলাম। প্রথম ইনিংসের ছয় উইকেটের পরে দ্বিতীয় ইনিংসেও পাঁচ উইকেট নিয়ে এই বাঁহাতি অনেকগুলো রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন আজ।

প্রথম ইনিংসের এমন বিপর্যয়ের পরে এভাবে যে ম্যাচে ফিরে আসা যাবে, সেটা অনেকেরই ধারণায় ছিল না। হাতে দশ উইকেট নিয়ে শেষ দুইদিনে বাংলাদেশকে করতে হবে আরও ২৯৫ রান। কঠিণ, কিন্ত অসম্ভব তো নয়! সেন্সিবল ব্যাটিং করলে জয়টা অনায়াসেই আসার কথা। তবে প্রথম ইনিংসে ১৪১ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশ যে জিম্বাবুয়েকে এত তাড়াতাড়ি গুটিয়ে দিতে পারবে, সেটা হয়তো অনেকের কল্পনাতেও ছিল না। বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে দুই উইকেটে একশো তুলে ফেলার পরে জিম্বাবুয়ের লক্ষ্যমাত্রা কোথায় গিয়ে থামবে, শঙ্কা ছিল সেটা নিয়েই। 

সেখান থেকে পুরো খেলাটাকে প্রায় একাই টেনে বাংলাদেশের নাগালে নিয়ে এসেছেন তাইজুল। বাঁহাতি এই স্পিনারের তাণ্ডবে ছারখার হয়েছে জিম্বাবুয়ে। প্রথম ইনিংসের ছয় উইকেটের পরে আজও পাঁচ উইকেট শিকার তাইজুলের, সেই সঙ্গে বাংলাদেশী বোলারদের মধ্যে এক ম্যাচে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হয়ে গেলেন তিনি। এর আগে এনামুল হক জুনিয়র এবং মেহেদী হাসান মিরাজ এক টেস্টে বারো উইকেট শিকার করেছিলেন।

এই সিরিজটা শুরুর আগে টেস্টে তাইজুলের উইকেট সংখ্যা ছিল ৬৯। এই এক ম্যাচ দিয়েই সেটাকে ৮০-তে নিয়ে গেলেন তিনি, পেছনে ফেললেন মাশরাফি বিন মুর্তজাকে(৭৮)। ক্যারিয়ারে এর আগে কখনোই এক ম্যাচে দশ উইকেট পাননি তাইজুল, সেটাও হয়ে গেছে দুই ইনিংস মিলিয়ে। টেলরকে বানিয়েছেন ইমরুলের ক্যাচ, তাইজুলের বলেই রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে বোকা হয়েছেন উইলিয়ামস, ফলাফল, বোল্ড। ক্লোজ ইনে ফিল্ডার এনে প্রথম বলেই ফিরিয়েছেন পিটার মুরকে। ম্যাচে দশ উইকেট হয়ে গিয়েছিল তখনই। শেষ ব্যাটসম্যান চাতারাকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলে জিম্বাবুয়ের লেজটাও মুড়ে দিয়েছেন তাইজুল। 

তাইজুলের এই কীর্তিটাই কঠিণকে জয় করার সাহস যোগাচ্ছে বাংলাদেশ দলকে। এর আগে যতোবারই বাংলাদেশের বোলারেরা এক টেস্টে দশ বা এর বেশি উইকেট নিয়েছেন, কোনবারই হারেনি বাংলাদেশ। এনামুলের বারো উইকেটে ২০০৫ সালে ঢাকা টেস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ড্র করেছিল বাংলাদেশ। পরের তিনবারই(মিরাজ একবার, সাকিব দুইবার) জিতেছিল টাইগারেরা। এবার তাইজুলের ম্যাচে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে তো?

ওয়ানডে দলে জায়গা হয় না তার, তবে টেস্টে তিনি অটো চয়েজ। তারকা ক্রিকেটার নন তিনি, নেই সুবিশাল ফ্যানবেইজ। তাইজুলকে দলে চেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া হয় না, তিনি বাদ পড়লেও কেউ হয়তো খবর রাখে না সেভাবে। তবে আড়ালে থেকে নিজের কাজটা ঠিকঠাক করে যান তাইজুল। বেশিরভাগ সময়ই তিনি পার্শ্বচরিত্রে থাকেন, তবে সেটা নিয়ে তাইজুলের নিজেরও কোন আক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না। সাকিব-মিরাজদের ভীড়ে হাইপের আড়ালে থেকেই প্রতিপক্ষের ওপর তৈরি করেন অদৃশ্য একটা চাপ। 

আর এবার তো তিনি নিজেই নায়কের আসনে। একাই টেস্টের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছেন, আশার ডুবন্ত তরীটাকে ভাসিয়ে রাখছেন বল হাতে। প্রথম ইনিংসে ছিয় উইকেট নিয়েছিলেন ১০৮ রান খরচায়, আর দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ ব্যাটসম্যানকে প্যাভিললিয়নে ফেরত পাঠিয়েছেন মাত্র ৬২ রানের বিনিময়ে। সিলেট টেস্টে তাইজুলের এগারো উইকেট, ১৭০ রান দিয়ে। নিজের কাজটা তাইজুল পুরোপুরি করে দিয়েছেন, এর বেশি কিছু বোধহয় কেউ আর কিছু করতে পারতো না। এবার দায়িত্বটা ব্যাটসম্যানদের, তাইজুলের অতিমানবীয় বোলিঙের মান রাখার ভার তো তাদের ওপরেই বর্তায়।

Comments

Tags

Related Articles