২০১১’র ‘আরব বসন্ত’র পর যখন সিরিয়াতে বাশার-আল-আসাদকে উৎখাতের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন থেকেই সিরিয়াতে চলছে গৃহযুদ্ধ। আসাদকে সরাসরি সাপোর্ট দিয়েছে ইরান, রাশিয়া এবং লেবাননের শিয়াপন্থী রাজনৈতিক দল ও মিলিট্যান্ট গ্রুপ হিজবুল্লাহ। আর আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে সুন্নিপন্থী আরব রেবেল গ্রুপ ফ্রি সিরিয়ান আর্মি, কুর্দিশ-সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স (SDF), সালাফি জিহাদি গ্রুপগুলা যেমন আল-নুসরা ফ্রন্ট এবং ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এ্যান্ড দ্যা লেভান্ট (ISIL)। যুদ্ধটা মূলত শিয়াপ্রধান ইরান, হিজবুল্লাহ এবং আসাদের আর্মি (আসাদ নিজেও শিয়া)র সাথে কুর্দিশ, সালাফি আর সুন্নিদের যুদ্ধ। ২০১৪ সালে আমেরিকা ISIL’র বিরুদ্ধে এয়ারস্ট্রাইক শুরু করার পর আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে এই বিষয়টা ভাইরাল হওয়ার অনেক আগে থেকেই আসলে এই গৃহযুদ্ধ চলছে। ২০১১ থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে আসাদ যেমন বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য পেয়েছেন, তেমনি তার প্রতিপক্ষ গ্রুপও সিরিয়ার প্রতিবেশী আরবের সুন্নি দেশগুলাসহ বিভিন্ন দেশের সাহায্য পেয়েছে।

মুসলমান/খ্রিষ্টান/হিন্দু/বৌদ্ধ অথবা শিয়া/সুন্নি; যাই-ই হন না কেন রাজনীতির খেলাতে হওয়া যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার হয় আপনার/আমার মতো সাধারণ মানুষরা, সিরিয়াতেও তাই হচ্ছে। শুরু হয়েছে এক্সোডাস, লাখ লাখ সিরিয়ানের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। যাদের টাকাপয়সা বেশি ছিলো তারা গিয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, যাদের কম ছিল তারা গিয়েছে আশেপাশের শিয়া দেশগুলোতে। আর যাদের টাকা পয়সা ছিলো না তারা থেকে গেছেন। এই তিন দলের বাইরেও একটা দল আছে, যারা চলে যাওয়ার আর্থিক সংগতি থাকার পরও থেকে গিয়েছেন সিরিয়াতে, ৬/৭ বছর ধরে চলা এই গৃহযুদ্ধ চোখের সামনে দেখছেন কিন্তু নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে যাননি।

তেমনই একজন হলেন মোহাম্মদ মহিয়েদিন আনিস (Mohammed Mohiedin Anis)। পরিবারকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিলেও ‘The Jewel of Syria’ নামে খ্যাত নগরী আলেপ্পোতে বসবাস করা এই ধনকুবের ব্যবসায়ী থেকে যান নিজের শহরেই। উনার শখ ছিলো ভিনটেজ গাড়ি সংগ্রহ করা। ১৯৪৭ মডেলের ক্যাডিলাক কনভার্টিবল, ১৯৫৫ মডেলের হাডস্ন কমোডোর, ১৯৫৭ মডেলের মারকারি মন্টক্লেয়ার, ১৯৫৮ মডেলের শার্ভোলেট এ্যাপাচি, ১৯৪৭ মডেলের প্লাইমাউথ সহ সব মিলিয়ে উনার সংগ্রহে ছিল প্রায় ৩০টা কার, যেগুলার ২৪টাই ভিনটেজ। ২০১২’র জুলাই থেকে শুরু হওয়া ‘Battle of Aleppo’ যখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করে ,তখন তিনি বাধ্য হন অন্য শহরে চলে যেতে, ২০১৬’র ডিসেম্বরে আসাদ বাহিনী আইসিলের কাছ থেকে আলেপ্পো মুক্ত করলে উনি ফিরে আসেন আলেপ্পোতে। ফিরে আসার পর ১৩টা গাড়ি অক্ষত পেয়েছিলেন তিনি, বাকিগুলা হয় বিধ্বস্ত অথবা চুরি হয়ে গিয়েছে।

যুদ্ধ শেষ হলে ২০১৭ সালে AFPর বৈরুত ব্যুরোর চিফ সামি কেটজ এবং ফটোগ্রাফার জোসেফ ঈদ(Joseph Eid) আলেপ্পোতে উনার সাথে দেখা করতে গিয়ে আনিসের এই বিখ্যাত ছবিটি তোলেন। নিজের বিধ্বস্ত বাসভবনের একটা খাটে বসে পাইপ টানতে টানতে এক বৃদ্ধ শুনছেন তাঁর প্রিয় গায়ক মোহাম্মদ দিয়া-আল-দিনের গান। ২০১৭ সালের ৯ই মার্চ প্রথম প্রকাশের পর এই ছবিটি ভাইরাল হয় পুরো বিশ্বে। সিরিয়ার যুদ্ধের অসংখ্য হৃদয়গ্রাহী ছবির মধ্যে এই ছবিটাকে ধরা হয় অন্যতম সিম্বোলিক ছবি হিসেবে।

একজন মানুষ, যে এত কিছুর পরও নিজের দেশ, শহর, ঘর ছেড়ে যাননি। দীর্ঘ যুদ্ধের ভয়াবহতাকে পাশে ফেলে তিনি বিধ্বস্ত ঘরে পাইপ টানতে টানতে শুনছেন পছন্দের শিল্পীর গান; শেষ জীবনে বেঁচে আছেন যুদ্ধের ভয়াবহতাকে সঙ্গী করে।

Comments
Spread the love