খেলা ও ধুলা

আমরা বরং ওয়ানডেই খেলি, এসব টেস্ট-ফেস্ট খেলে কী হবে!

জিম্বাবুয়ে ভালো খেলেছে। কতটা ভালো? সিলেট টেস্ট ১৫১ রানের ব্যবধানে জিতে নেয়ার মতো অসাধারণ ক্রিকেট কি জিম্বাবুয়ে আসলেই খেলেছে? নাকি বাংলাদেশ দলই জয়টা জিম্বাবুয়ের মুখের সামনে তুলে ধরেছে? সাড়ে তিনদিন ধরে ম্যাচটা যদি ফলো করে থাকেন, কিংবা যদি চারটে ইনিংসের হাইলাইটসও দেখে থাকেন, তাহলে দ্বিতীয় উত্তরটাই বেরুনোর কথা যে কারো মুখ থেকে। বাংলাদেশের বদান্যতাতেই যে সতেরো বছর পরে দেশের বাইরে টেস্ট জিতলো জিম্বাবুয়ে! মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের এই দলটাকে জিম্বাবুয়ের পুরো স্কোয়াড মিলে একটা গ্র‍্যান্ড ওভিয়েশন দিতেই পারে। বাংলাদেশ দল এমন অকুণ্ঠ সাহায্য না করলে যে জয় পাওয়া কষ্টকর হতো জিম্বাবুয়ের জন্যে!

ওয়ানডেতে হেসেখেলে জয় এসেছে। কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতাইই ছিল না তিন ম্যাচের সিরিজে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই টেস্টেও, তবে জয়ী দলের নামটা পাল্টে গেছে শুধু। ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ছেলেখেলা করেছিল বাংলাদেশ, টেস্টে বাংলাদেশকে নিয়ে খেললো জিম্বাবুয়ে। ওয়ানডে সিরিজটাকে বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানরা বানিয়েছিলেন রান তোলার মহোৎসব, আর টেস্টে এসে ব্যাটিং করাটাই ভুলে গেলেন তারা! এটাই টেস্ট আর ওয়ানডের পার্থক্য, শর্টার ভার্সনের সঙ্গে লঙ্গার ভার্সনের পার্থক্য। এখানে প্রতি মূহুর্তে সংগ্রাম করতে হয়, প্রতিটা বলে পরীক্ষা দিতে হয়। খেলতে হয় বলের মেরিট বুঝে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের এতকিছু বিবেচনা করার ঝামেলা যেতে দেখা গেল না তেমন।

বলা হয়, টেস্ট ম্যাচ নাকি জেতায় বোলারেরা। তাইজুল ইসলামকে বলে দেখুন কথাটা। দুই ইনিংসে এগারোটা উইকেট শিকার করেছেন এই বাঁহাতি স্পিনার, ম্যাচশেষে তবুও তিনি ট্র‍্যাজিক হিরো। জায়গা হয়েছে পরাজিত দলে। ব্যাটসম্যানরেরা দুই ইনিংস মিলিয়ে মোটে তিনশো রান তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে তাইজুল একাই বিশ উইকেট নিলেও তো তেমন কোন উনিশ-বিশ হতো না ফলাফলে। এমন গা ছাড়া ভাব, আউট হবার জন্যে, উইকেট বিলিয়ে দেয়ার জন্যে এমন মরিয়া আচরণ আর কোন দলের ব্যাটসম্যানেরা করেন কিনা জানা নেই।

একটা টেস্টের ব্যর্থতায় এত কিছু বলা ঠিক হচ্ছে কিনা, এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। জানিয়ে রাখা ভালো, গত আটটা টেস্ট ইনিংসে একবারও দলীয় সংগ্রহ দুইশো ছুঁতে পারেনি বাংলাদেশের। টেস্টে কতটা বাজে সময় কাটাচ্ছেন ব্যাটসম্যানেরা, সেটা সহজেই অনুমেয়। এর মধ্যেও ওয়ানডেতে জয় আসছে, টেস্টের এই নিদারুণ ব্যর্থতা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে রঙিন পোষাকের ক্রিকেটের সাফল্যে। কারো কোন মাথাব্যথা নেই, কিংবা মাথাব্যথা থাকলেও, সেটা সারাবার চিন্তা নেই। থাকলে সেটা তো পারফরম্যান্সে ফুটে ওঠার কথা, সেই অ্যাপ্রোচটা মাঠে দেখতে পাবার কথা। সেটা দেখা যাচ্ছে কই?

চতুর্থ ইনিংসের বিবেচনায় ৩২১ রান বিশাল একটা লক্ষ্যমাত্রা। সাকিব-তামিম নেই, সেখানে তাই মুশফিকের ওপরে বিশাল একটা দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটার নামলেন ছয় নম্বর ব্যাটসম্যান হিসেবে! অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ যুক্তি দিয়েছেন, ব্যাটিং ডেপথ বাড়াতেই নাকি এই সিদ্ধান্ত! ব্যাটিং ডেপথ বাড়ানোর জন্যেই তো একাদশে মাত্র তিন বোলারকে রাখা হয়েছিল। ভাবুন তো একবার, দলের দুরবস্থায় কোহলি, স্টিভেন স্মিথ বা জো রুটরা কি কখনও ছয়/সাতে নামবেন? বাংলাদেশে অবশ্য সবই সম্ভব!

ছয়ে নেমে মুশফিক কি করলেন? তার ওপরে অর্পিত দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে পারলেন? স্লগ সুইপকে মুশফিক যতোটা ভালোবাসেন, এতখানি হয়তো কৃষ্ণও রাধাকে ভালোবাসতেন না, জুলেখাও এত ভালোবাসা পাননি ইউসুফের কাছ থেকে, যতোটা স্লগ সুইপ নামের শটটা মুশফিকের কাছে পেয়েছে। এই শটটা খেলতে গিয়ে কতবার উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এসেছেন মুশফিক, তবুও তার মোহ কাটেনি। কাটলো না আজও। দুইবার স্লগ সুইপ করতে গিয়ে ব্যাটে-বলে হয়নি, মুশফিক পণ করেই বসেছিলেন, মারলে মারবো স্লগ সুইপেই! মারতে গেলেন, ধরাও পড়লেন ফিল্ডারের হাতে। মুশফিকের ইগো’র বলি হলো বাংলাদেশ দল।

মুশফিক সবচেয়ে সিনিয়র ক্রিকেটার বলেই তার কথা বলা হলো। নইলে বাংলাদেশের কোন ব্যাটসম্যান কাঠগড়ায় ওঠা থেকে নাম কাটাতে পারবেন? ইমরুল কায়েস, লিটন, মুমিনুল কিংবা মাহমুদউল্লাহ, সবাই তো স্বেচ্ছায় বিলিয়ে দিয়ে এসেছেন উইকেট। জিম্বাবুয়ের বোলিং ভালো হয়েছে, সিকান্দার রাজা দারুণ টার্ন পাচ্ছিলেন, কিন্ত আউট হতে না চাইলে টিকে থাকাই যেতো। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানেরা টিকে থাকতে চাইলেন না কেউই। আর তাই জিম্বাবুয়ের অনিয়মিত স্পিনাররাই টপাটপ তুলে নিলো উইকেট, ১৬৯ রানে অলআউট বাংলাদেশ!

এমন ব্যাটিং ব্যর্থতার দিনে তুষার ইমরানের কথা মনে পড়ে। বছরের পর বছর জুড়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের বন্যা বইয়ে দিয়েও ব্রাত্য থেকে যান তুষার, বয়সের অজুহাতে তুষার বা শাহরিয়ার নাফীসদের বাতিলের খাতায় ফেলে দেন নির্বাচকেরা। বোর্ড থেকে বলা হয়, জাতীয় দলকে দেয়ার মতো তাদের আর কিছু নেই! যারা আছেন, তারা যেটা দিচ্ছেন, তারচেয়ে ভালো কিছু তুষারেরা নিশ্চয়ই করতে পারতেন। অন্তত টেস্ট টেম্পারমেন্ট ব্যাপারটা তাদের ব্যাটিঙে থাকতো। এবছর সব দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি রান তুষারের, তবে সেটা অনেকের চোখে পড়ে না। জাতীয় লীগে করা তুষারের রান আর সেঞ্চুরীগুলো নির্বাচকদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়, ঠিক যেরকম টেস্ট ক্রিকেটটা বিসিবির কাছে অপ্রয়োজনীয়।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ তবু ম্যাচশেষে দাবী করলেন, টেস্ট ক্রিকেটটাকে তারা হালকাভাবে নিচ্ছেন না। কিন্ত কথায় আর কাজে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মোটেও। জিম্বাবুয়ের যে দলটাকে নিয়ে ওয়ানডেতে ছেলেখেলা করা হলো, তাদের কাছেই এমন অসহায় আত্মসমর্পণের দিনে অধিনায়কের কথাগুলোকে ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছু মনে হলো না। পোষাকটা কেবল সাদা হলো, অমনি বাংলাদেশের ব্যাটিঙের নগ্ন চেহারাটা উদ্ভাসিত হয়ে চলে এলো সামনে। বলের রঙটা লাল হতেই উইকেট বিলিয়ে দেয়ার মিছিলে নাম লেখালো পুরো দল। জিম্বাবুয়ে না হয়ে অন্য কোন প্রতিপক্ষ থাকলে একশোর আগেই বাংলাদেশের অলআউট হওয়া ঠেকাতে পারতো না কেউ। অজস্র ক্যাচ আর হাফচান্স মিসের পরেও বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে কেবল ১৬৯ জড়ো হওয়াটাও তো লজ্জাজনক!

আমরা আফসোস করি, কেন ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া আমাদের সঙ্গে টেস্ট খেলতে চায় না, আমরা ভারতকে গালি দেই, কেন তারা আমাদের সেদেশে টেস্ট খেলতে ডাকে না। আমরা ভুলে যাই, আমাদের পরনে শতচ্ছিন্ন কাপড়, জোড়াতালি দেয়া সেই পোষাক পরে অভিজাতদের কাতারে দাঁড়ানো যায় না। টেস্ট ক্রিকেট পুরুষদের খেলা। আঠারো বছর এই আঙিনায় কাটিয়েও আমরা এখনও শিশুই রয়ে গেলাম, ‘পুরুষ’ আর হতে পারলাম কই? আমরা বরং ওয়ানডেই খেলি, এসব টেস্ট-ফেস্ট খেলে কী হবে! 

আরও পড়ুন- 

Comments

Tags

Related Articles