বাংলাদেশের বাস্তবতায় পঁচিশ বছর বয়সে একটা ছেলে বা মেয়ে হয়তো গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ করে চাকুরীর খোঁজে নামে। কেউ উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশে পাড়ি জমায়। কিন্ত চাকরি, ব্যবসা, উচ্চশিক্ষা বা ক্যারিয়ার গুছিয়ে নেয়ার সহজ রাস্তাগুলো ছেড়ে কেউ যদি পঁচিশ বছর বয়সে রাজনীতিতে যোগ দেয়, তাহলে ‘ছেলেটা গোল্লায় গেছে’ টাইপের অপবাদ ছাড়া তার কপালে আর কিছুই জুটবে না। পঁচিশ বছর বয়সে কি একটা দেশের মন্ত্রী হওয়া সম্ভব? মালয়েশিয়ার সৈয়দ সাদিক আবদুর রহমানকে জিজ্ঞেস করুন প্রশ্নটা, উত্তর পেয়ে যাবেন।

দীর্ঘ পনেরো বছর পরে মালয়েশিয়ার ক্ষমতায় ফিরেছেন মাহাথির মোহাম্মদ। নাজিব রাজ্জাকের ক্ষমতাশীল দলকে হারিয়েছে তার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। ক্ষমতায় এসেছেন মাহাথির, ঢেলে সাজাচ্ছেন মালয়েশিয়াকে। গতকাল তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে তেরোজন নতুন মন্ত্রীকে সরকারে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদেরই একজন সৈয়দ সাদিক আবদুর রহমান। পঁচিশ বছর বয়েসী এই যুবক মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার সাথে সাথেই একটা রেকর্ড গড়েছেন, মালয়েশিয়ার ইতিহাসের কণিষ্ঠতম মন্ত্রী এখন তিনিই!

সাদিকের পরিবারেরই একজন ২০১৩ সালে নাজিব রাজ্জাকের সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন৷ খাইরি জামিলুদ্দিন নামের এই ভদ্রলোক সম্পর্কে সাদিকের মামা হন৷ মন্ত্রী হবার সময় জামিলুদ্দিনের বয়স ছিল ৩৭ বছর। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজ্জাকও মন্ত্রীপরিষদের ক্যাবিনেটের সদস্য হয়েছিলেন পঁচিশ বছর বয়সে। তবে তিনি পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন না। আর তাই সবচেয়ে কম বয়সে মন্ত্রী হবার রেকর্ডটা সাদিকের নামের পাশেই যোগ হচ্ছে।

সৈয়দ সাদিক আবদুর রহমান, মালয়েশিয়া, কণিষ্ঠতম মন্ত্রী

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন সৈয়দ সাদিক আবদুর রহমান। যদিও বিরোধী শিবির প্রশ্ন তুলেছে, একটা গোটা মন্ত্রণালয় সামলানোর মতো দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা সাদিকের আছে কিনা। তবে বেশিরভাগ মানুষই তরুণ এই মন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়েছেন। রাজনীতিতে তরুণদের আরও বেশি পরিমানে আগ্রহী করে তোলার জন্যে সাদিকের মতো ব্যক্তিদের ক্ষমতায় আনতে হবে বলেই মনে করেন তারা।

সাদিক অবশ্য তার ওপর সংশয়বাদীদের ওপর বিরক্তি প্রকাশ করেননি। শপথ গ্রহণ শেষে বলেছেন, কাজ দিয়েই তিনি সবার মন জয় করে নিতে চান। সাদিক আরও বলেছেন- “এটা অনেক বড় একটা দায়িত্ব। হয়তো এই দায়িত্ব পালনের জন্যে আমি পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত নই এখনও৷ কিন্ত এই নিশ্চয়তা আমি দিতে পারি যে, আমার প্রচেষ্টায় কোন ঘাটতি থাকবে না। অভিজ্ঞতার অভাবটা আমি পরিশ্রম দিয়ে পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবো। আমাদের নেতা মাহাথির মোহাম্মদ আমার ওপরে আস্থা রেখেছেন, সেটার প্রতিদান দিতে আমি একটুও কার্পণ্য করবো না।” সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করলে তিনি জবাবে বলেছেন, “দয়া করে আমাকে স্যার ডাকবেন না। আমি আপনাদের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট হবো, আমাকে সাদিক ভাই বলে ডাকলেই চলবে।”

ছাত্রজীবনে তুখোড় বিতার্কিক ছিলেন সাদিক। এশিয়ার সেরা বিতার্কিক হয়েছিলেন তিনি। এশিয়ান ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি ডিবেটিং প্রতিযোগীতায় ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ মালয়েশিয়ার ছাত্র সাদিক তারই এক সহপাঠী মুবারাত ওয়াসি’র সাথে যৌথভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণাতেও তার এই বিতর্কের প্রতিভাটা চোখে পড়েছে সবার। নিঁখুত যুক্তি তুলে ধরে নাজিব রাজ্জাকের সরকারের সমালোচনা করেছেন তিনি, অন্যদের মতো নোংরা কাদা ছুঁড়ে মারার খেলায় নামেননি। বাদবাকী রাজনীতিবিদদের মতো মিথ্যে ভরসা দেননি ভোটারদের, শোনাননি কল্পিত আশার বাণী। প্রচারণা চলাকালে মিডিয়ায় তাকে ‘ভয়েস অফ মালয়েশিয়ান ইউথ’ বা ‘মালয়েশিয়ান তারুণ্যের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

সৈয়দ সাদিক আবদুর রহমান, মালয়েশিয়া, কণিষ্ঠতম মন্ত্রী

ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে জড়ালেও, ছাত্র হিসেবেও তিনি যথেষ্ট ভালো ছিলেন। সুযোগ পেয়েছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার, তাও একদম নিখরচায়! কিন্ত রাজনীতির টানেই স্কলারশীপের সেই অফার লেটারটা ফিরিয়ে দিয়েছেন সাদিক। দেশ ছাড়লে রাজনীতি আর করা হবে না, এই কারণেই দেশে রয়ে গেছেন সাদিক। তার পরিবারেরও অমত ছিল না এতে।

মাহাথির মোহাম্মদকে নিজের রাজনৈতিক গুরু মানেন সাদিক। রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে মাহাথিরের চিন্তাভাবনাই তাকে প্রভাবিত করেছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। ২০১৬ সালে নাজিব রাজ্জাকের সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে প্রথম আলোচনায় আসেন তিনি, পরিবর্তনের পক্ষে দেয়া তার বক্তৃতা দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল তখন। সদ্যসমাপ্ত মালয়েশিয়ার ১৪তম জাতীয় নির্বাচনে তাকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিল মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স। নিজের আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজালি ইব্রাহিমকে সাত হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন সাদিক।

সৈয়দ সাদিক আবদুর রহমান, মালয়েশিয়া, কণিষ্ঠতম মন্ত্রী

তরুণ এই মন্ত্রী মালিয়েশিয়ার ক্রীড়াক্ষেত্রে নতুন কোন অবদান রাখতে পারবেন কিনা সময়ই বলে দেবে। তবে প্রথমদিন অফিস করেই নিজের মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীদের জন্যে নতুন নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন সাদিক। বলেছেন, অফিস শুরুর আগে, আর অফিস শেষ হলে দলবেঁধে সবাইকে বেরিয়ে জগিং করতে হবে। তার পরিস্কার কথা- “দেশের খেলাধুলা আর শরীরচর্চা নিয়ে কাজ করবো আমরা, আমাদেরই যদি পেট আধফুট সামনে বেরিয়ে থাকে, তাহলে কিভাবে হবে? খেলাধুলা আর শরীরচর্চার এই সংস্কৃতিটা মন্ত্রণালয় থেকেই শুরু করতে হবে।”

সৈয়দ সাদিক আবদুর রহমান যেবার এশিয়ান ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি ডিবেটিং প্রতিযোগীতায় চ্যাম্পিয়ন হলেন, সেই প্রতিযোগীতায় বাংলাদেশেরও দুজন ছিলেন সেরা দশে। তারা হয়তো দেশ ছেড়ে চলে যাবেন, অন্যান্য আরও অনেক মেধাবীদের মতো। কিংবা হয়তো বিসিএসের জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়বেন, এই দেশে হাভার্ডে সুযোগ পাওয়া ছাত্রছাত্রীরাও তো মায়ের ইচ্ছায় বিসিএস ক্যাডার হতে চায়! কিন্ত তারা কেউ রাজনীতিতে আসার কথা ভাববেন না, ছাত্র আর তরুণদের জন্যে এদেশের রাজনীতিটা তো মোটামুটি কলুষিতই বলা যায়!

তথ্যসূত্র- চ্যানেলনিউজ এশিয়া, এবিসি নিউজ, টাইমস অফ ইন্ডিয়া।

Comments
Spread the love