ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ভালো নেই সৈয়দ আশরাফ

কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আওয়ামীলীগের এই সরকারের মন্ত্রীসভায় যারা আছেন, এদের মধ্যে সবচেয়ে ক্লিন ইমেজের মানুষ কে, তাহলে শতকরা নব্বই জন মানুষই যে নামটা নেবেন, সেটা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের। কিংবা যদি ‘সহমত ভাই’দের বাদ দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কোন জরিপ চালানো হয় যে, আওয়ামীলীগ নেতাদের মধ্যে শেখ হাসিনার পরে কাকে মানুষ সবচেয়ে বেশি সৎ মনে করেন, তাহলেও সিংহভাগ মানুষ সৈয়দ আশরাফের কথাই বলবেন। আমাদের নষ্ট হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সৈয়দ আশরাফের মতো মানুষ তো একদমই ব্যতিক্রম! সেই সৈয়দ আশরাফ এখন ভীষণ অসুস্থ, আর কখনও তাকে রাজনীতিতে দেখা যাবে কিনা সেটাও নিশ্চিত নয়! ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত এই রাজনীতিবিদ এখন কাউকেই চিনতে পারছেন না সেভাবে, এমনকি পরিবারের সদস্যদের নামও ভুলে যাচ্ছেন!

২০১৭ সালের স্ত্রী শিলা ইসলামের মৃত্যুর পর থেকেই মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়েন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তখনথেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে দিয়ে রাজনীতির ময়দান থেকেও খানিকটা দূরে সরে যান তিনি। মিডিয়া কাভারেজে থাকতে কখনোই পছন্দ করতেন না সৈয়দ আশরাফ, স্ত্রীর মৃত্যুর পরে একেবারেই সরে যান প্রচারের আলো থেকেও। 

এরপর যুক্তরাষ্ট্রে এবং দেশের নামী হাসপাতালে তার চিকিৎসা করানো হয়েছে। কিন্ত শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি খুব একটা। গত কয়েক মাস ধরে তিনি ব্যাংককের এক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার শারিরীক অবস্থা নিয়ে নানা সময়ে নানা রকমের খবর তৈরি করা হয়েছে, অনেকেই দাবী করেছে, সৈয়দ আশরাফ পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন, খুব দ্রুতই তিনি রাজনীতিতে ফিরবেন।

তবে এটা সম্পূর্ণ গুজব বলেই দাবী করেছেন সৈয়দ আশরাফের ছোট ভাই সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম। বলেছেন, “‘সৈয়দ আশরাফ গুরুতর অসুস্থ। তিনি ফুসফুস ক্যানসারে ভুগছেন। বর্তমানে ফোর্থ স্টেজে আছেন। তিনি কাউকেই চিনতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে তার পক্ষে রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। আমরা এখন রাজনীতি নয়, বরং তার চিকিৎসার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। তিনি যেন সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরতে পারেন সে চেষ্টাই করা হচ্ছে। তাকে নিয়ে অহেতুক গুজব না ছড়াবেন না। সবার প্রতি এই অনুরোধ জানাই।”

সৈয়দ আশরাফের শারিরীক অবস্থা সম্পর্কে সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম জানিয়েছেন, “ছয়-সাত মাস ধরে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। ক্যান্সারটা এখন ফোর্থ স্টেজে ডরমেন্ট বা ঘুমন্ত অবস্থায় রয়েছে। এটা ৪ থেকে ৫ বছরও থাকতে পারে। তবে ক্যান্সার এখনও সারা শরীরে ছড়ায়নি। বলা চলে, তার শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপও নয়, আবার ভালোও নয়। তিনি পুরোপুরি স্মৃতিশক্তি হারাননি। মাঝে মধ্যে সবাইকে চিনতে পারেন, আবার কখনো পারেন না। চিকিৎসকরা তাকে সুস্থ করে তুলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তারা এখনো আশা ছাড়েননি।” 

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে কাটানো সময়ের বর্ণনা দিয়ে সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম আরও বলেছেন, “আমি আশরাফ ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে কানের কাছে গিয়ে আমার নাম বলেছি। আমার নাম শুনে বললেন ‘বস’। মাঝে মধ্যে তার স্মৃতিশক্তি থাকে আবার কখনো থাকে না। আমার ছেলে রাইয়ানের নাম ধরে ধরে ডাকেন। আমাদের পরিবার পালাক্রমে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে দেখভাল করছে। এখন তার শয্যাপাশে রয়েছে তার মেয়ে রিমা ইসলাম। প্রধানমন্ত্রীও সৈয়দ আশরাফের খবরাখবর নেন নিয়মিত। কখনো আমার মাধ্যমে আবার কখনো অ্যাম্বাসেডরের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর রাখছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) এ ব্যাপারে অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। তিনি বলেছেন, টাকা নিয়ে কোন চিন্তা-ভাবনা করতে হবে না। আশরাফের সুচিকিৎসা হবে। আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ।”

বাবা সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে গঠিত মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন সৈয়দ নজরুল, দেশের ক্রান্তিলগ্নে পালন করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। জাতীয় চার নেতার একজন ছিলেন তিনি, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং কামারুজ্জামানের সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর জেলখানায় বন্দী অবস্থায় শহীদ হয়েছিলেন তিনি, তাদের খুন করে আওয়ামী লীগের কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দিতে চেয়েছিল খন্দকার মোশতাক এবং বঙ্গবন্ধুর খুনীরা। সেই মিশনে অনেকটা সফলও হয়েছিল তারা, আওয়ামী লীগের মেরুদণ্ডটাই ভেঙে গিয়েছিল প্রায়। আরও একবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসতে অনেকগুলো বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বপ্রদানকারী এই রাজনৈতিক দলটাকে।

কিছু রক্ত কখনও বেইমানী করতে জানে না, বেইমানী করতে শেখে না। সৈয়দ নজরুল ইসলামের রক্তও তেমনই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বিসর্জন দিতে না চাওয়ায় জীবন দিতে হয়েছিল তাকে। সেই বাবার ছেলে হয়ে সৈয়দ আশরাফ কি করে বঙ্গবন্ধুর কন্যার সঙ্গে বেইমানী করবেন? না, সেটা তিনি কখনও করেননি, বরং দারুণ ঝড়-ঝাপটা থেকে বরাবরই আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন শেখ হাসিনাকে, আগলে রেখেছেন আওয়ামী লীগকে। 

টানা চারবার তিনি সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে। দায়িত্ব পালন করেছেন বেসরকারী বিমান চলাচল ও পর্যটন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে। তবে সৈয়দ আশরাফ নিজেকে স্মরণীয় করে রেখেছেন ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের ক্রান্তিলগ্নে দলের হাল ধরে। সংস্কারপন্থীরা তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দুই দলেই, ‘মাইনাস টু’ ফর্মূলায় শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়া, দুজনকেই রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিল তৎকালীন শাসকেরা।

তখন প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমানের সঙ্গে মিলে দারুণ দক্ষতায় দল সামলেছিলেন সৈয়দ আশরাফ, নেত্রীকে জেল থেকে মুক্ত করে ছেড়েছিলেন তারা। একদিকে ঘরের শত্রুদের মোকাবেলা করা, অন্যদিকে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, আবার আন্তর্জাতিক লবিং এবং কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করা, সেই সঙ্গে আবার দলের ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করা- সবকিছু প্রায় একাই সামলেছেন তিনি! বাবা সৈয়দ নজরুল ইসলাম যেমন আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ, সৈয়দ আশরাফও তেমনই নিজের ভূমিকার কারণেই আওয়ামী লীগের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ হয়ে থাকবেন সবসময়। 

প্রথাগত নেতাদের মতো বাচাল স্বভাবের ছিলেন না, কাজের চেয়ে কথা বেশি বলাটা পছন্দ করতেন না কখনোই। দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন, তবুও তার মধ্যে মিডিয়ায় ফুটেজ খাওয়ার লোভ ছিল না কখনও। নিজেই বলতেন, “আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সব বিষয়ে কথা বলবে কেন? সে শুধু নীতি নির্ধারণী বিষয়ে কথা বলবে। আর মিডিয়ার সামনে কথা বলার জন্য তো, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তো আছেনই।”

এতগুলো বছর মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন, আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি ছিলেন তিনি, অথচ কখনও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি, ক্ষমগা অপব্যবহারের অভিযোগ করেনি কেউ। রাজনৈতিক শিষ্টাচার ব্যাপারটা তার মতো ভালো খুব কম মানুষই বোঝেন। বিরোধী দলের নেতাদের জিজ্ঞেস করুন, তারাও একবাক্যে মেনে নেবেন, সৈয়দ আশরাফের মতো মানুষ হয় না। সেই মানুষটা এখন অসুস্থ, ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছেন। এই লড়াইয়ে সৈয়দ আশরাফ হারবেন না। দশ বছর আগে এরচেয়েও ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়েছেন, জিতেছেন, আওয়ামী লীগকে খাদের কিনারা থেকে বাঁচিয়েছেন, মুক্ত করেছেন শেখ হাসিনাকে। এবার লড়াইটা তার একার, সেখানেও তিনি নিশ্চয়ই বিজয়ীর বেশেই ফিরবেন। আমাদের ঘুণেধরা এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সৈয়দ আশরাফের মতো মানুষকে যে খুব বেশি দরকার!

আরও পড়ুন- 

Comments

Tags

Related Articles