নন্দিনী- জাগো রঞ্জন, আমি এসেছি তোমার সখী। রাজা, ও জাগে না কেন।
রাজা- ঠকিয়েছে। আমাকে ঠকিয়েছে এরা। সর্বনাশ! আমার নিজের যন্ত্র আমাকে মানছে না। ডাক তোরা, সর্দারকে ডেকে আন, বেঁধে নিয়ে আয় তাকে।
নন্দিনী- রাজা, রঞ্জনকে জাগিয়ে দাও, সবাই বলে তুমি জাদু জান, ওকে জাগিয়ে দাও।
রাজা- আমি যমের কাছে জাদু শিখেছি, জাগাতে পারি নে। জাগরণ ঘুচিয়ে দিতেই পারি।

‘স্বপ্নজাল’ শেষ হয় ঠিক এরকমই এক আকুতি নিয়ে। এই আকুতি শতবর্ষ আগে নন্দিনীরও ছিল। লোভের বলি হয়ে, ধর্ম-অধর্মের দিব্যি দিয়ে ফুলেল স্বপ্নগুলো রক্তকরবীর মতোই লাল হয়ে যায় শেষে।

রবিবাবু ‘রক্তকরবী’ লিখেছেন সেই ১৯১৬ সালে। তাঁর ঠিক শত বর্ষ পরে গিয়াস উদ্দিন সেলিমও একটি গল্প লিখলেন, তার নাম – স্বপ্নজাল। কেন রক্তকরবীর প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে আসা হল স্বপ্নজালে ধরা দেয়ার পর? তা কি কেবল সেলিমের স্বপ্নজালে রক্তকরবীর প্রসঙ্গ গল্পের অনুষঙ্গে ব্যবহার করবার জন্যই? না… কারণ স্বপ্নজালের অঙ্গে অঙ্গে আদতেই আছে রক্তকরবীর সুবাস। রক্তকরবীতে আমরা পাই নন্দিনীকে। আহ নন্দিনী! তাঁর অপার সৌন্দর্য আর চঞ্চলতা প্রাণ সঞ্চারিত করে যেন মরুভূমির বুকেও। আর স্বপ্নজালে দেখা মেলে শুভ্রার। যার শুভ্রচেতনা আর আনন্দস্পর্শ মুহূর্তেই রাঙিয়ে দেয় উড়তে থাকা মনখারাপের মেঘগুলোকে। রক্তকরবীর রঞ্জন যেন হয়ে ওঠে স্বপ্নজালের অপু। আয়নাল, থান্ডু আর বিসম্ভর দায়িত্ব নেয় লোভী রাজা ও তার দলের ভূমিকা পালন করতে। তাই তো রক্তকরবী মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় স্বপ্নজালে। যে জালে ধরা পড়েও পড়ে না জীবনের চাঞ্চল্য।

নন্দিনী থেকে শুভ্রা-

নন্দিনী খুব নাচতে চাইতো। রঞ্জনকে দেখে বেতাল নাচ নাচতো তাঁর মন। সেই নাচ দিয়েই শুরু হয় শুভ্রার গল্প। নাচের ক্লাসের জানালা দিয়ে অপুর জিজ্ঞাসু চাহনি অবশ্য সে নাচকে এলোমেলো করে দেয়। নাচে-গানে অনন্যা শুভ্রাকে আরও দেখা যায় গলা সাধার সময়। অপুকে দেখার শখের তীব্রতা বারবার যেন মনে করিয়ে দেয় নন্দিনীকেই। রঞ্জনকে কাছে পাবার আকুলতা আর অপুকে নিয়ে স্বপ্ন বোনার ব্যাকুলতা মিলে যায় চাঁদপুরের সে ছোট্ট মফস্বল শহরে। শুভ্রার স্পর্শে অপুও যেন প্রাণ খুঁজে পায় নিজের মাঝে। দুজনে মিলে রাঙিয়ে বেড়ায় তাদের একান্ত ব্যক্তিগত পৃথিবীটাকে। জীবন বাস্তবতার বাঁকে পড়ে সুখজাগানিয়া শুভ্রাই আবার দুখজাগানিয়া হয়ে ওঠে নন্দিনীর মতো। সে দুখজাগানিয়া শুভ্রা অপুর বিরহের কারণ হয়। বিরহ বাসে যাবার আগে তাও প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেয়, মনের একটা বন্দোবস্ত করিয়ে নেয়।

“মনটাকে মোর বসতে দিও। মুড়ি-মুড়কি খেতে দিও। জলের গ্লাস দেয়ার ছলে একটুখানি ছুঁয়ে দিও।”

এই শুভ্রাই গল্পের শেষপর্যায়ে গিয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। নন্দিনী যেমন যুদ্ধঘোষণা করেছিল রাজার বিরুদ্ধে, তেমনি শুভ্রাও প্রতিবাদী হয় ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য। মঞ্চের নন্দিনীকে যেন নিজের মাঝেই সঞ্চারিত করে শুভ্রা। লোভ-লালসা, যক্ষের ধন পাবার লিপ্সার মোকাবেলা করে ছিনিয়ে আনে তার নিজস্ব ভিটেমাটি আর ন্যায়বিচারকে। কিন্তু শুভ্রা জয়ী হয় না, যেমন জয়ী হয়নি নন্দিনীও। জয়ী হতে দেয়া হয় না তাদের। তাদের রঙিন স্বপ্নগুলোকে তার আগেই ছিঁড়ে খায় বাস্তবতার শকুনদল। তাই তো শতবছর আগের নন্দিনী, শতবর্ষ পরেও শুভ্রা হয়ে বেঁচে থাকে।

রঞ্জন থেকে অপু-

রঞ্জন ছিল যন্ত্রের মাঝেও অযান্ত্রিক। গৎবাঁধায় আটকা ছিল না সে, সে ছিল ব্যতিক্রম। লোভের বশীভূত হয়ে নিজেকে দুর্বল হতে দেয় নি বরং জেগে উঠেছিল নীরব প্রতিবাদে। সে নীরব প্রতিবাদ অপুর মাঝেও ভাস্বর। রঞ্জন যেমন রাজার লিপ্সার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল সর্বদা তেমনি কলেজছাত্র অপুও তার নাজুক কাঁধে তুলে নেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার দায়ভার। রঞ্জনের পরশপাথর যেমন ছিল নন্দিনী, তেমনি অপুর চালিকাশক্তিও শুভ্রাই থাকে। ভালবাসার টানে এই অপু একাই দাঁড়িয়ে পড়ে লোভী রাজার সামনে। আয়নাল গাজী, থান্ডু, বিসম্ভররা যখন ভোগে ব্যস্ত তখন এই অপুই ত্যাগ স্বীকার করে নিজেকে সঁপে দিয়ে ন্যায়বিচার খোঁজ করে, শুভ্রার ভালবাসার খোঁজ করে।

রাজা/সর্দার/ বিশু থেকে আয়নাল/থান্ডু/বিসম্ভর-

রক্তকরবীর নেপথ্যে থাকা রাজার একমাত্র চাহিদাই ছিল লোভ। স্বপ্নজালের আয়নাল গাজীরও তাই। লোভের বশবর্তী হয়েই আয়নাল নিজেকে অমিত শক্তিধর মনে করে। রাজার সর্দার যেমন ক্ষমতালোভে রাজার কথাই শোনে না তেমনি আয়নালের সহচর থান্ডুও একপর্যায়ে আয়নালের আদেশ অমান্য করতে উদ্যমী হয়। রাজার কেবল একটাই লিপ্সা আর তা হল যক্ষের ধন, আয়নাল গাজীও বুঝি কোন এক যক্ষের ধনের সন্ধানেই সদাব্যস্ত। কিন্তু এই অর্থ, এই লিপ্সাই একসময় রাজা ও আয়নালের জন্য পরিতাপের বিষয় হয়। অর্থ দিয়ে রাজা হাসিল করতে পারে না নন্দিনের ভালোবাসা আর ওদিকে আয়নাল এতো অর্থ দিয়েও ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ঠিক করাতে পারে না। বিশুর নন্দিনের প্রতি আকর্ষণ যেন বিসম্ভরের কথাই মনে করিয়ে দেয়। নন্দিনের প্রতি মুগ্ধতা বিশুর আর শুভ্রার প্রতি মুগ্ধতা আসে বিসম্ভরের। কিন্তু সে মুগ্ধতা একপাক্ষিক, নন্দিনীর মুগ্ধতা যে কেবল রঞ্জনের জন্য আর শুভ্রার মুগ্ধতা অপুর জন্য।

রক্তকরবীর সাথে স্বপ্নজালের এই মিশে যাওয়া অবাক করার মতো। কিন্তু সেলিমের সজ্ঞানে রক্তকরবী টেনে নিয়ে আসা স্বপ্নজালে মুগ্ধই করে কেবল। কিন্তু যদি রক্তকরবীকে পাশে রেখে আলোচনা করা হয় স্বপ্নজাল নিয়ে! আলোচনা হোক তবে তাই পরিমনি, ইয়াশ রোহান, ফজলুর রহমান বাবুদের নিয়ে।

পরিমনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক। তার চাহনি, তার কাজলটানা চোখ, তার সারল্যমাখানো আদুরে কথা সবকিছুই মুগ্ধ করার মতো। তাই তো শুভ্রা যখন নন্দিনী হয় তখন একটুও অবাক লাগে না। বরং মনে হয় এই তো আমার নন্দিনী। এর স্পর্শেই তো যক্ষপুরীতে প্রাণ ফিরে আসবে। পরিমনির হাসির সাথে তুলনা করা যায় চৈত্রের মেঘবাতাসের। প্রচণ্ড তাপদাহের পর মেঘবাতাসের যে প্রথম ছোঁয়া সেই ছোঁয়া ছুঁয়ে যায় পরিমনির হাসিতেও। তাকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম যেন স্বপ্নজালে। তার সাথে ইয়াশ রোহানের রসায়ন ছিল দেখবার মতো। ধর্মীয় বিভেদ, কাঁটাতারের বাঁধা সবকিছুই নগণ্য মনে হয় যখন অপু-শুভ্রা পাশাপাশি থাকে। কেমন যেন একটা অদৃশ্য আত্মবিশ্বাস খেলা করে, মনে হয় যে অপু-শুভ্রাকে কেউ আলাদা করতে পারবে না। সে দায় অবশ্য অনেকটাই অপুর। তার হার না মানা মানসিকতা, নীরব প্রতিবাদ সবকিছুই যথার্থভাবে অভিনয়ে তুলে নিয়ে এসেছেন ইয়াশ রোহান। তার কাছ থেকে আরও অনেক ভালো কাজের প্রত্যাশা তাই করাই যায়। আরও বলতে হবে ফজলুর রহমান বাবুর কথা। বাবু যে একজন অসাধারণ অভিনেতা তা বোধকরি সকল দর্শকই জানে। কিন্তু বিগত ৩-৪ বছরে তার ‘কোয়ালিটি অফ এক্টিং’ এমন পর্যায়ে তিনি নিয়ে গেছেন যা মনে হয় না অদূর ভবিষ্যতে কেউ ছুঁতে পারবে। টাইপকাস্ট হচ্ছেন বলে সমালোচনা জাগছিল একটু একটু করে কিন্তু স্বপ্নজালে এসে সে ধারণাও বদলে দিলেন বাবু। কমিক ভিলেইন কখনো মিনেসিং হতে পারে না বাংলা সিনেমায়, সে ধারণা ভেঙ্গেচুড়ে দিয়েছেন বাবু। তার ডায়লগে কমিক ইলেমেন্টও যেমন ছিল, তেমনি বিভিন্ন দৃশ্যে তাকে রীতিমত ভয়ঙ্করও লেগেছে। বেশকিছু সিনে তার অভিনয় মনে রাখার মতো। কেবল মদ্যপ আর বমি করার সিনগুলো কিছুটা ওভারএক্ট হয়ে গেছে। ইরেশ জাকের অবশ্য পুরোটাই কমিক্যাল। তাকে দেয়া দায়িত্ব তিনি যথাযথ পালন করেছেন। যেমনটি করেছেন শহীদুল আলম সাচ্চু। মিশা সওদাগরকে আরও বেশি স্ক্রিনটাইম না দেয়া সেলিমের জন্য রীতিমত অপরাধ হয়ে গেছে বলে আমি মনে করি। যে দু-একটি সিনে ছিলেন সেখানেই মিশা তার মুনশিয়ানা দেখিয়ে দিয়েছেন। কলকাতার দিকের ব্রাত্য বসু, রজত গাঙ্গুলি, বিপ্লব ব্যানার্জীরাও ছিলেন অভিনয়ে দারুণ পোক্ত।

স্বপ্নজাল, পরীমনি, গিয়াসউদ্দীন সেলিম

এবার আলাদা করে বলি ডিওপি কামরুল হাসান খসরুর কথা। কী অসাধারণ ক্যামেরাওয়ার্ক! এবছরের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তিনি না পেলে রীতিমত অবাক হবো। কলকাতাকে এতো সুন্দর বোধহয় কলকাতার কোন সিনেমাতেও দেখিনি। চ্যাপ্টা গলি, বিশাল ছাদ, গায়ে গায়ে লেগে থাকা বারান্দা, লাল ইটের দালানকোঠা, ট্রাম, থিয়েটার আর এদিকে চাঁদপুরের নদী, লঞ্চ, মহল্লার বাজার, দোতলা বাড়ি, তুলসী গাছ, সবকিছু মিলেই যেন অদ্ভুত সুন্দর একটা গল্প খসরু নিজেই বলে গেছেন। মনপুরার পর দীর্ঘ একটা সময় সিনেমা বানান নি গিয়াস উদ্দিন সেলিম। প্রায় ৯ বছর পর তাঁর দ্বিতীয় সিনেমা ‘স্বপ্নজাল’। মনপুরার সাথে স্বপ্নজালের তুলনা দেয়া যাবে না কারণ গল্প ভিন্ন, স্থান ভিন্ন, কাল ভিন্ন, সবকিছুই ভিন্ন। মনপুরার গল্প ছিল সরল, গানগুলো ছিল সহজিয়া আর স্বপ্নজালের গল্প কিছুটা জটিল ও দীর্ঘ, সহজেই কোন পরিণতিতে চলে আসা যায় না। সেদিক থেকে স্বপ্নজাল চাইলেই আরেকটু সহজ হতে পারতো। মনপুরায় যে কষ্টটা দর্শকের মন কাঁদাতে পেরেছিল সে কষ্টটা এখন অনেকটাই ক্লিশে হয়ে গেছে। তবুও সেলিম চাইলেই আরও হৃদয় বিদারক করতে পারতেন, তিনি বিস্তর সময় পেয়েও সাবপ্লটের জট মেলাতে মেলাতে শেষে গিয়ে তাড়াহুড়াই করে ফেলেছেন। তাই অপু সোনাইয়ের জায়গা নিতে পারে না, তবে পরীকে ছাড়িয়ে যায় শুভ্রার শুভ্রতা। নব্বইয়ের স্বাদটা আনতে পেরেছেন বেশ ভালোভাবেই সেলিম। কেয়ামত থেকে কেয়ামতের পোস্টার থেকে শুরু করে টিভিতে এক্স ফাইলসের নস্টালজিক সুর। কিন্তু গল্প মেলাতে গিয়েই যেন খেই কিছুটা হারিয়ে গেল। রক্তকরবীতে রঞ্জন আর রাজার শেষ যেভাবে একসাথে হল তেমনি এখানেও যদি আয়নাল আর শুভ্রা-অপুর প্লট একসাথে মিলে যেত তাহলে ইমপ্যাক্ট আরও ভালো হতো। শেষ বিশ মিনিটে আলাদা করে আবার ভালবাসার গল্প বলতে হতো না।

স্বপ্নজাল গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ও পরিমনির ক্যালিবার ঘোষণা দিয়ে গেল। সাথে আগমন বার্তা দিয়ে গেল ইয়াশ রোহানের। ফজলুর রহমান বাবুকেও এই সিনেমা ‘বাংলাদেশের সেরা অভিনেতা’ তকমা লাগিয়ে দিতে বাধ্য। কিন্তু গল্পের গণ্ডি আর চরিত্রের পরিণতি আরও নিদারুণ হতে পারতো। তবুও স্বপ্নজাল রক্তকরবীর মতো প্রতিকূলতায় ভালবাসার গল্প বলে যায়। লোভের মাঝে, বাস্তবতার মাঝে, ধর্ম-অধর্মের যুদ্ধের মাঝে জয়ী করে যায় বন্য ফুল রক্তকরবীকে, দেখিয়ে যায় ভালবাসার সর্বনাশ।

পথের পাশে বন্য কোনো ফুল যেমন,
শ্বাস কেড়ে নেয় হঠাৎ যখন ক্লান্ত মন।
তোর দেহে ঠিক ওইরকমই মদির বাস,
অবশ করে হাতছানি দেয় সর্বনাশ…

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-