মিলন, নাকি বিচ্ছেদ? সিনেমার একদম শেষ প্রচ্ছদ পর্যন্ত এই প্রশ্নটা জেগে ছিল মনের মধ্যে। শুভ্রার বিয়ের সানাই বাজছে, সাতপাকে বাঁধা পড়তে যাচ্ছে ভালোবাসার মানুষটা, অপু তখন ঢাকাগামী লঞ্চে। এখন কি হবে? অপু ছুট লাগালেন লঞ্চের পেছনের দিকটায়, ঝাঁপ দিলেন মেঘনার বুকে। তারপর? অপু কি ফিরতে পারবে শুভ্রার কাছে?

ইয়াশ রোহান ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ভরা মেঘনায়, ছুটির দিনের সকালে ঘুমনিদ্রা ফেলে রেখে আমরা ঝাঁপ দিলাম সিনেমায়, ধরা পড়লাম স্বপ্নজালে। নয়টা বছর, অনেক দীর্ঘ সময়। মনপুরার নয় বছর বাদে গিয়াসউদ্দীন সেলিম আবার ফিরলেন ডিরেক্টর্স চেয়ারে, নতুন সিনেমা স্বপ্নজাল নিয়ে এলেন, সঙ্গে অজস্র চমক। সেই চমকের পরিমাণটা অনেক বেশীই। সুন্দর, নিটোল আর পরিচ্ছন্ন একটা গল্প, উত্থান-পতন আর রোমাঞ্চের হাতছানি যার পরতে পরতে। সেই গল্পে প্রেম আছে, কাছে আসা আছে, আছে বিচ্ছেদের মন খারাপ করিয়ে দেয়া বিষণ্ণ সুর। সেই বিষণ্ণতাটাও যেন ভীষণ উপভোগ্য!

গল্পের শুরুটা চাঁদপুরে। অপু-শুভ্রা-সাহা-আয়নাল চরিত্রগুলোর বসবাস এখানেই। বাজারে মাছের আড়তের ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে ডাকাতিয়ার পাড়, শান্ত নদীর নিস্তরঙ্গ ঢেউ কিংবা বাতাসে ঘাসফুলের দুলে যাওয়া- এরমধ্যে দানা বাঁধছে প্রেম, জাল বুনছে স্বপ্ন, আর ভালোবাসা। লঞ্চের ভেঁপুর সাথে গল্প এগিয়ে যায় নিজস্ব গতিতে, কখনও আগরতলা, কখনও কলকাতা; সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে ছোটে ভালোবাসা।

স্বপ্নজাল, গিয়াসউদ্দীন সেলিম, মনপুরা, পরীমনি

স্কুলে পড়ার সময় বাংলা প্রথম পত্রে প্রশ্ন আসতো, নামকরণের সার্থকতা। এগুলোর উত্তর লেখা ছিল সবচেয়ে বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা। অথচ আজ কেউ আমাকে স্বপ্নজালের নামকরণের সার্থকতা লিখতে বলুক, লেটার মার্ক নিয়ে পাশ করবো নিশ্চিত! এই সিনেমার নাম ‘স্বপ্নজাল’-এর চেয়ে ভালো কিছু হতেই পারতো না। একটা গল্পের ভেতরে অজস্র বাঁক, সবগুলো শাখা-উপশাখা মিলে ছুটছে একই গন্তব্যের দিকে, সেই স্রোতগুলোকে এক করে মোহনায় ভিড়িয়েছেন পরিচালক, জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অজস্র সুতোকে একসঙ্গে মিলিয়েছেন কি দারুণ কৃতিত্বে!

স্বপ্নজালের সবচেয়ে বড় দিক সম্ভবত অভিনয়। প্রতিটা চরিত্র(অপুর বোন বাদে) নিজেদের সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করেছে, প্রতিভার মেলায় হারিয়ে যাওয়ার মতো একটা অবস্থা যেন! নবাগত ইয়াশ রোহান থেকে শুরু করে কমার্শিয়াল সিনেমার নায়িকা পরীমনি কিংবা ‘জাতীয় ভিলেন’ মিশা সওদাগর- সবাইকেই অন্য একটা রূপে দেখা গেল স্বপ্নজালে। কাকে ছেড়ে কার কথা বলা যায়?

শুরুতেই পরীমনি। এই সিনেমার প্রাণ অবশ্যই তিনি। তার যে ইমেজটা আমাদের কাছে এতদিন ছিল, সেটা অবশ্যই অভিনেত্রীসুলভ নয়। তিনি নায়িকা, তিনি সুন্দরী, আবেদনময়ী, সবকিছুই ঠিক আছে। কিন্ত এত ভালো অভিনয় এই মেয়েটা করতে পারেন, সেটা একজন গিয়াসউদ্দীন সেলিম না থাকলে, একটা স্বপ্নজাল না এলে বোঝা যেতো না হয়তো। পাশের বাড়ির মেয়েটা হয়ে পুরোটা সময় পর্দায় মুগ্ধতা ছড়িয়ে গেলেন কি সুনিপুণভাবে।

স্বপ্নজাল, গিয়াসউদ্দীন সেলিম, মনপুরা, পরীমনি

পরীমনির ব্যাপারে আগ্রহটা তৈরি হয়েছিল অনেক আগে, যখন থেকে তিনি শুভ্রা হবার মিশনে নেমেছিলেন। নায়িকা থেকে চরিত্রাভিনেত্রী হওয়াটা সহজ কিছু নয়, একটা সিনেমা দিয়ে সেটার শতভাগ কেউ পারেও না। পরীমনি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন শুভ্রা হবার জন্যে। সিনেপ্লেক্সের পর্দায় ‘ডানাকাটা পরী’ ছিলেন না, ছিলেন শুভ্রা নামের খুব সাদামাটা একটা মেয়ে, ভালোবাসার মানুষের জন্যে যে জাত-পাত আর ধর্মের ভেদাভেদকে ভুলতে চায়। সহজ-সরল ভালোবাসার কাঙাল মেয়েটা কখনও কখনও প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, সমাজ-সংসারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চায়, আবার কখনওবা বাস্তবতার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়- চরিত্রের এমন উত্থান-পতনগুলো দারুণভাবে সামলেছেন পরিমনী। ‘নায়িকা’ বাদ দিয়ে তার নামের পাশে ‘অভিনেত্রী’ পদবীটা যোগ করার সময় চলে এসেছে, তিনি নিজেই গড়ে নিয়েছেন সেই মঞ্চটা।

তবে স্বপ্নজালের সবচেয়ে বড় সম্পদ নিঃসন্দেহে ফজলুর রহমান বাবু। মনপুরা থেকে অজ্ঞাতনামা, তারপরে হালদা হয়ে স্বপ্নজাল- এই মানুষটা প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার মিশনে নেমেছেন। কোন মাপের অভিনেতা তিনি, সেটা নতুন করে বলার কিছুই নেই। সকালবেলা আরামের ঘুম ভেঙে সিনেমা হলে ছুটে যাওয়া যায় শুধু এই মানুষটার দুর্দান্ত অভিনয়ের অল্প কিছু ঝলক দেখার জন্যে। যতোক্ষণ পর্দায় ছিলেন, একচেটিয়া আধিপত্য ধরে রেখেছেন। পর্দায় তার আশেপাশে থাকা আর কাউকে আমাদের চোখে পড়ে না, সেখানে শুধু ফজলুর রহমান বাবুর একক উপস্থিতি! আয়নাল গাজীর ওপর এই রাগ হচ্ছে, পরের মূহুর্তেই তার সংলাপে হেসে গড়িয়ে পড়ছি- চরিত্র আর সংলাপের এমন অদ্ভুত ট্রান্সফরমেশন ধারাবাহিকভাবে করে যাওয়া শুধু ফজলুর রহমান বাবুর পক্ষেই মনে হয় সম্ভব।

স্বপ্নজাল, গিয়াসউদ্দীন সেলিম, পরীমনি, ফজলুর রহমান বাবু

বাবুর সাথে ইরেশ জাকেরও দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন, যেন পাল্লা দিয়েছেন একে অন্যকে। নতুন হিসেবে ইয়াশ রোহান দারুণ, প্রথম সিনেমায় অভিনয় করছেন বলে মনেই হয়নি। অভিষেকেই কেন্দ্রীয় চরিত্র, সেই চাপটা বোঝা যায়নি তার ডায়লগ ডেলিভারি কিংবা এক্সপ্রেশানে। জড়তা ছিল না অভিনয়ে, বাড়তি আতিশয্যও চোখে পড়েনি কোথাও। পরিচালকও কৃতিত্ব পাবেন এটার জন্যে। অন্যরকম চরিত্রে মিশা সওদাগরকে দেখার আগ্রহ ছিল, সেই আগ্রহ অর্ধেক পূরণ হলো, বাকী অর্ধেকটা রয়েই গেল এই আক্ষেপ জিইয়ে রেখে- আর কিছুক্ষণ পর্দায় থাকলে কি হতো! আর একজনের কথা না বললেই নয়- তিনি শহীদুল আলম সাচ্চু। শুরুতে বোঝা যায়নি তার চরিত্রের গভীরতা, সিনেমা এগিয়েছে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তার উপস্থিতির গুরুত্ব। নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব দারুণভাবেই পালন করেছেন সাচ্চু, চোখে প্রশান্তি এনে দেয়া অভিনয় করেছেন মধ্যবয়সী এই ভদ্রলোক।

স্বপ্নজাল, গিয়াসউদ্দীন সেলিম, মনপুরা, পরীমনি

স্বপ্নজালের প্রতি আগ্রহের সবচেয়ে বড় কারণটা ছিল সিনেমার পেছনে থাকা নামটা- গিয়াসউদ্দীন সেলিম। নয় বছরের বিরতি তাকে কতটা ঋদ্ধ করেছেন, পরিচালক হিসেবে মনপুরার তুলনায় কতটা পোক্ত তিনি হয়েছেন এই সময়টাতে, সেসব দেখার আগ্রহ ছিল প্রচণ্ড। সেই আগ্রহ পূরণ হয়েছে ভালোভাবেই। তার গল্প বলার ধরণটা আরও পরিণত হয়েছে বলেই মনে হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে। সিনেমার আবহসঙ্গীত সুন্দর, সিনেম্যাটোগ্রাফি কিছু জায়গায় অসাধারণ, কিছু জায়গায় আবার অতি সাধারণ। এই বাংলার নদী-জল-মাটি কিংবা কলকাতার ট্রাম-ট্যাক্সি-থিয়েটার, নব্বইয়ের দশকের শেষ বা নতুন শতাব্দীর শুরুর সময়টাকে ধরার চেষ্টায় পুরোপুরি সফল স্বপ্নজাল টিম। গিয়াসউদ্দীন সেলিম এমন একটা সময়ের গল্প বলতে চেয়েছেন, যখন লোকে মনের কথাগুলো চিঠি লিখে জানাতো, ল্যান্ডফোন জিনিসটাও যখন খুব সহজলভ্য নয়। গল্পের সেই আবহটা পর্দায় উঠে এসেছে চমৎকারভাবে।

কোন সিনেমাই শতভাগ পারফেক্ট নয়, কিছু ত্রুটি থাকবেই, কয়েকটা অপছন্দের জায়গা ব্যক্তিভেদে তৈরি হবেই। কিন্ত স্বপ্নজালে বিচ্যুতির সংখ্যা হাতেগোনা, প্রাপ্তির সংখ্যা অজস্র। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তো অবশ্যই ‘অভিনেত্রী পরীমনি’! এতদিন পরে ‘গিয়াসউদ্দীন সেলিমের সিনেমা’ পাওয়াটাও কি প্রাপ্তি নয়? নয়বছর বাদে নতুন সিনেমা, গলাটা নাহয় ভিজলো, কিন্ত তেষ্টা কি মিটলো? আমার তো মনে হয় না। একটা স্বপ্নজালে কি আর নয় বছরের তৃষ্ণা মেটে! শীগ্রই নতুন সিনেমা চাই, এটা তো এখন সময়ের দাবী।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-