লঞ্চের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে শুভ্রা, ঘাটে দাঁড়ানো অপু। বিদায়ের মূহুর্ত আসন্ন, আর কখনও দেখা হবে কিনা কেউ জানেনা। হঠাৎ বিকট শব্দে ভেঁপু বাজিয়ে নড়তে শুরু করলো লঞ্চটা, তীর থেকে সরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। চলমান লঞ্চের বারান্দা থেকে হাঁটতে শুরু করলো শুভ্রা। হোকনা কয়েকটা সেকেন্ড; তবু যতোটা সময় সম্ভব ভালোবাসার মানুষটার খানিকটা কাছে থাকা যায়। দূরত্বটা বেড়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, এক মূহুর্তের জন্যে সেটাকে বাড়তে না দেয়ার কি আপ্রাণ প্রচেষ্টা!

সব মিলিয়ে দৃশ্যটার ব্যাপ্তি দশ সেকেন্ডের বেশি হবে না। এই দশটা সেকেন্ডই মুগ্ধতা ছড়ানোর জন্যে যথেষ্ট। ছোট্ট একটা দৃশ্য দিয়েও দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়া যায়, সেটা নতুন করে উপলব্ধি হলো স্বপ্নজালে। উপলব্ধিটা হলো পরীমনির কল্যানে!

পরীমনির পরিচয়টা আমাদের কাছে কমার্শিয়াল সিনেমার নায়িকা হিসেবে। ‘রক্ত’ সিনেমার মারদাঙ্গা পরী, কিংবা ‘ডানাকাটা পরী’ গানের আবেদনময়ী পরী; অথবা ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের নিউজফিড জুড়ে থাকা সুন্দরী সেই নায়িকা- পরীমনির পরিচয় আমাদের কাছে এটাই। আজ থেকে নতুন একটা পরিচয় তৈরী হলো তার, তিনি নিজেই তৈরি করলেন সেই পরিচিতি- তিনি স্বপ্নজালের শুভ্রা, চরিত্রের গভীরে ডুব দেয়া একজন নিবেদিতপ্রাণ অভিনেত্রী!

অথচ এই শুভ্রা চরিত্রটাই শুটিঙের দুই দিনের মাথায় ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন পরীমনি! গিয়াসউদ্দীন সেলিম পরীর মধ্যে শুভ্রাকে খুঁজে পেয়েছিলেন, কিন্ত পরী নিজেই কনফিডেন্ট ছিলেন না। কান্নাকাটি করে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। কিন্ত অভয় দিয়েছিলেন পরিচালক স্বয়ং। ইউনিটের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে খানিকটা সময় লেগেছে, ঐশ্বরিক প্রতিভা তার মধ্যে কতখানি আছে সেটা আমি জানিনা, তবে স্বপ্নজালে যে পরীমনিকে দেখা গেল, সেখানে ঐশ্বরিক কোনকিছুর ছোঁয়া খুব কমই আছে, যা আছে তার পুরোটাই পরিশ্রম আর ডেডিকেশন।

স্বপ্নজাল, পরীমনি, গিয়াসউদ্দীন সেলিম

শুটিঙের শুরুর দিন তার সিকোয়েন্স ছিল সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার দৃশ্যে অভিনয় করতে হবে। অনেকবার ওঠানামা করা হলো, কিন্ত পরিচালক যেটা চাচ্ছিলেন, সেটা হচ্ছিল না কোনভাবেই। নিজেকে একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো মনে হচ্ছিল পরীমনির, বড় নির্জন সেই দ্বীপ, জনমানুষের আনাগোনা নেই কোথাও। কিন্ত আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবার সঙ্গে সঙ্গেই ঢুকে পড়েছেন শুভ্রার ভেতরে, নিজেকেই যেন হারিয়ে ফেলেছিলেন খানিকটা। আড়াই বছর ধরে একটা চরিত্রকে ধারণ করেছেন নিজের ভেতরে, কাজটা মোটেও সহজ কিছু নয়।

এ তো গেল সিনেমার আগের গল্প। সিনেমায় কি হলো? ‘স্বপ্নজাল’ দেখার পেছনে বেশ কয়েকটা বিশেষ কারণ ছিল। সেগুলোর একটা পরীমনি। মেইনস্ট্রিম সিনেমার এই নায়িকার ‘ডানাকাটা পরী’ ইমেজটাই আমার চোখে ভাসছে, সেই ইমেজ ভেঙে স্বপ্নজালের ‘শুভ্রা’ চরিত্রের ভেতরে তিনি কতটা ডুব দিতে পেরেছেন, নায়িকার খোলস থেকে বেরিয়ে কতখানি চরিত্রাভিনেত্রী হতে পেরেছেন, সেটা দেখার আগ্রহ ছিল। ভয়ও ছিল, যদি আশাভঙ্গ হয়?

হতাশ হতে হয়নি একটুও। একদম শুরু থেকেই প্রানবন্ত পরীমনি। গ্ল্যামার ছুঁড়ে ফেলে অদ্ভুত সাবলীল অভিনয় তার। সেই চেনা ইমেজ ভেঙে শুভ্রায় ঢুকে যাওয়া, পাশের বাড়ির মেয়ে হয়ে ওঠা। পুরো সিনেমাতে বেশ কয়েকবার রূপ বদলেছেন, কখনও তিনি প্রতিবাদী, কখনও বিদ্রোহী, কখনও ভালোবাসার কাঙাল, আবার কখনওবা আদরে গলে যাওয়া প্রেমিকা। ‘তুমি আমার’- দুই অক্ষরের সংলাপে জেদি শুভ্রা বুঝিয়ে দিচ্ছেন ভালোবাসার অধিকারের কথা, আবার গুরুদেবের সামনে ভিন্নধর্মের ভালোবাসার মানুষটার কথাও বুক চিতিয়ে জানাচ্ছেন তিনি। এই শক্ত মেয়েটাই আবার কখনও ভেঙে পড়ছে, কখনও মাসীর হাতে মার খাওয়া ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরছেন সস্নেহে, ভালোবাসার তীব্রতা প্রতিটা দৃশ্যে আলাদা আলাদাভাবে প্রকাশ করছেন- এমন কিছু পরীমনির কাছে প্রত্যাশিত ছিল না মোটেও। প্রশংসা তিনি পেতেই পারেন।

স্বপ্নজাল, পরীমনি, গিয়াসউদ্দীন সেলিম

এফডিসিতে মেকাপ ছাড়া পরীমনিকে দেখেই নাকি গিয়াসউদ্দীন সেলিমের মনে হয়েছিল- এই তো আমার শুভ্রা! সিনেমা হলে স্বপ্নজাল দেখার পরে আমারও মনে হয়েছে, পরীর চাইতে ভালো কেউ শুভ্রার চরিত্রটা করতে পারতেন না বোধহয়। শুভ্রার মায়াবী হাসি আমাদের হাসাচ্ছে, তার চোখের জল আমাদের মন খারাপের কারণ হচ্ছে। অন্তিম লগ্নে সাতপাকে বাঁধা পড়ার ঠিক আগে তার শূন্য দৃষ্টিতে ভালোবাসার মানুষটাকে খুঁজে ফেরার তাড়নাটা মনে গেঁথে থাকে, তার সঙ্গে আমরাও অপেক্ষায় থাকি, অপু কি আসবে? কখন আসবে সে?

‘নায়িকা’ পরীমনি থেকে ‘অভিনেত্রী’ পরীমনির জন্ম হলো স্বপ্নজাল দিয়ে, সেখানে একজন গিয়াসউদ্দীন সেলিমের অবদান অপরিসীম। একটা জিনিস পরিস্কার হয়ে গেল, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিভার অভাব নেই, প্রয়োজন পাকা জহুরীর। একটা স্বপ্নজাল কিংবা গিয়াসউদ্দীন সেলিমদের অভাবেই পরীমনিরা ফুল হয়ে ফুটতে সময় নেন, কেউ কেউ হয়তো কলি অবস্থাতেই ঝরে পড়ে যান। পরীমনিকে নতুন একটা পরিচিতি দিয়েছে এই সিনেমা, সেই সঙ্গে দায়িত্বটাও অনেক বেশী বাড়িয়ে দিয়েছে, বাড়িয়েছে প্রত্যাশার পারদও। সেই প্রত্যাশা পরীমনি পূরণ করবেন, এমনটাই চাওয়া।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-