মনপুরা সিনেমাটা যখন রিলিজ পায়, আমরা তখন হাইস্কুলের ছাত্র। মফস্বল শহর, রক্ষণশীল পরিবার; সিনেমা হলে যাওয়াটা সেখানে পাপের পর্যায়ে পড়ে। সেই ‘পাপ’ আমি করেছিলাম, মনপুরা সিনেমাটা দেখতে গিয়ে। ‘দুলাল সিনেমা’ নামের একটা সিনেমা হল আছে আমাদের শহরে। মফস্বলের প্রেক্ষাগৃহগুলো যেমন হয়, ভাঙা চেয়ার, ঝাপসা পর্দা, সিগারেট আর গাঁজার কটু গন্ধে ভরে থাকা পুরোটা জায়গা- সেখানে একটানা দুই ঘন্টা সময় কাটানোটা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। সেই অসম্ভব সম্ভবে পরিণত করতে পারেনি মনপুরা, আধঘন্টা পরেই গঞ্জিকার গন্ধ সহ্য করতে না পেরে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম, তবে মনপুরা কিন্ত মন থেকে মুছে যায়নি!

বাংলাদেশের সিনেমাজগত যত দিন থাকবে, মনপুরা সিনেমাটার নামও তত দিন উচ্চারিত হবে। বাংলাদেশী সিনেমাগুলোর মধ্যে সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমার তালিকা করা হলে একদম ওপরের দিকেই জায়গা হবে মনপুরার। ক্লাস থেকে মাস- সব শ্রেণীর দর্শকের মন জয় করে নিয়েছিল সিনেমাটা, অশ্লীলতার যাঁতাকলে পিষ্ট হবার পরের সময়টাতে আমাদের সিনেমাজগত যখন ধুঁকছিল, তখন মনপুরাই এক পশলা স্বস্তির বাতাস নিয়ে এসেছিল সিনেমাপাড়ায়।

এই গিয়াসউদ্দীন সেলিমটা কে, মনপুরা কেমন সিনেমা, কিছুই আমরা জানতাম না, চঞ্চল চৌধুরীকে চিনতাম খানিকটা, আর টিভিতে সারাক্ষণ বিজ্ঞাপণ চোখে পড়তো- মনপুরা আসছে। সিনেমার গানগুলো তো তখন সবার মুখে মুখে। ইউটিউবের যুগ ছিল না তখন, আমাদের হাতে হাতে মোবাইল ছিল না। অডিও সিডি কিনে উইন্ডোজ মিডিয়া প্লেয়ারে সেটাকে রিপ করা হয়েছিল কম্পিউটারে, নিথুয়া পাথারে থেকে সোনার ময়না পাখি, যাও পাখি বলো তারে, এমনকি মমতাজের ‘আগে যদি জানতাম রে বন্ধু’ গানটাও তখন গভীর আবেগ নিয়ে শুনতাম আমরা! এই সিনেমা না দেখলে চলে?

স্বপ্নজাল, গিয়াসউদ্দীন সেলিম, মনপুরা, পরীমনি

মনপুরার পাক্কা নয় বছর বাদে দ্বিতীয় সিনেমা ‘স্বপ্নজাল’ নিয়ে আসছেন গিয়াসউদ্দীন সেলিম। ২০০৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল মনপুরা। দারুণ সাফল্য, দর্শকদের এমন অসাধারণ প্রতিক্রিয়া, সবকিছু মিলিয়ে খুব শীঘ্রই গিয়াসউদ্দীন সেলিমকে আবার সিনেমার পেছনে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। কিন্ত মেঘে মেঘে বেলা বয়ে গেছে, সেলিমের আর সিনেমা বানানো হয়নি। এই প্রশ্নটা যেকোন টক-শো বা আড্ডাতেই তাকে করা হয়, কেন এত দিনের বিরতি? তার উত্তরটা অকপট।

মনপুরার মতো অসাধারণ একটা সিনেমা বানানোর পরেও গিয়াসুদ্দীন সেলিমকে সিনেমার প্রযোজক খুঁজতে গলদঘর্ম হতে হয়! অবিশ্বাস্য হলেও কথাটা সত্যি। কাজলরেখা নামের একটা সিনেমা বানানোর জন্যে মাঠে নেমেছিলেন সেলিম, গল্প-চরিত্র সবকিছু চূড়ান্ত করে। পিরিয়ড ফিল্ম হওয়ায় বাজেট একটু বেশী ছিল, কিন্ত সেই সিনেমাটা শেষমেশ আর হয়নি। প্রায় চার বছরেরও বেশী সময় সেটার পেছনে লেগে থেকে শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়েছেন তিনি, স্বপ্নের জাল বোনা শুরু করেছেন স্বপ্নজালকে ঘিরে।

স্বপ্নজাল, গিয়াসউদ্দীন সেলিম, মনপুরা, পরীমনি

স্বপ্নজালের মূল আকর্ষণ অবশ্যই পরিচালক নিজে। তবে অন্যরকম একটা আকর্ষণও আছে এই সিনেমায়, সেই আকর্ষণের নাম পরীমনি। তাকে মূলত কমার্শিয়াল সিনেমাতেই দেখা যায়, আর যেসব চরিত্র বা সিনেমায় তিনি এতদিন অভিনয় করেছেন, সেগুলোর মধ্যে ‘ডানাকাটা পরী’ আইটেম সংটা ছাড়া মনে রাখার মতো কিছু আসলে খুঁজে পাইনি আমি। কিন্ত স্বপ্নজালের ট্রেলারে অন্যরকম একজন পরীমনির দেখা মিলেছে, সৌন্দর্য্যের সাথে মেধাকে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টাটা তার মধ্যে দেখা গেছে পুরোপুরি। শুভ্রা নামের চরিত্রটার মধ্যে পুরোপুরি ঢোকার চেষ্টা চোখে পড়েছে, সেটা তিনি কতটুকু করতে পেরেছেন, এইটুকু দেখার জন্যেও সিনেমা হল পর্যন্ত ধাওয়া করা যায়।

নব্বইয়ের দশকের শেষ, কিংবা নতুন শতাব্দীর শুরুর সময়টার আবহ নিয়ে সিনেমার গল্পটা। এখানে চাঁদপুর আছে, আছে কলকাতা। আড়াই মিনিটের ট্রেলারজুড়ে পরিমিতি আর পরিচ্ছন্নতার আভাস। দেড়যুগ আগের কলকাতাকে গল্পের প্রয়োজনে ক্যামেরায় সেভাবেই ধারণ করার চেষ্টা করেছেন গিয়াসউদ্দীন সেলিম। মনপুরার মতো এখানেও পটভূমিতে নদীকে রেখেছেন পরিচালক। জলের সঙ্গে জীবনের মিতালীতে শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা অথবা বিচ্ছেদের চারাটা গল্পের ভেতরে রোপন করা হয়েছে।

স্বপ্নজাল, গিয়াসউদ্দীন সেলিম, মনপুরা, পরীমনি

মনপুরার অসাধারণ জনপ্রিয়তার মূলে ছিল সিনেমার গানগুলো। আগে যদি জানতাম, নিথুয়া পাথারে, সোনার ময়না পাখি- এই গানগুলো এখনও লোকের মুখে মুখে ঘুরে ফেরে। স্বপ্নজাল এক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে। সিনেমা মুক্তির ক্ষণ এগিয়ে এসেছে, কিন্ত গান রিলিজ দেয়া হয়েছে একদম শেষ মূহুর্তে। ‘এমন করে বলছি শোন’ শিরোনামের গানটা শুনতে ভালো লেগেছে, কিন্ত ঠিক মনপুরার মানের মনে হয়নি। এটার ব্যাখ্যা অবশ্য পরিচালক নিজেই দিয়েছেন, তার ভাষায়- “আমি সিনেমার জন্যে গান বানিয়েছি, গানের জন্যে সিনেমা বানাইনি। মনপুরার গান মনপুরার জায়গায়, স্বপ্নজালেরটা স্বপ্নজালের জায়গায়।”

নয় বছর অনেকটা সময়। নয় বছরের বিরতি পরিচালক হিসেবে গিয়াসউদ্দীন সেলিমকে কতটা ঋদ্ধ করেছে, সেটা দেখার জন্যে সিনেমা হলে যেতে হবে। ‘শুভ্রা’ হয়ে ওঠার জন্যে পরীমনিকে কম লড়াই করতে হয়নি, শুটিং শুরুর পরে তো একটা পর্যায়ে ছবিটা ছেড়েই দিতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্ত পরিচালক অভয় দিয়েছেন তাকে, সাহস যুগিয়েছেন। কমার্শিয়াল সিনেমার এই নায়িকার ‘ডানাকাটা পরী’ ইমেজটাই আমার চোখে ভাসছে, সেই ইমেজ ভেঙে স্বপ্নজালের ‘শুভ্রা’ চরিত্রের ভেতরে তিনি কতটা ডুব দিতে পেরেছেন, নায়িকার খোলস থেকে বেরিয়ে কতখানি চরিত্রাভিনেত্রী হতে পেরেছেন, সেটা দেখার আগ্রহ আছে অবশ্যই। শুটিঙের সেটে নাকি তিনি শুভ্রা হয়েই ছিলেন, পর্দায় কতটুকু হতে পেরেছেন, সেটা জানা যাবে আগামীকালই। তবে স্বপ্নজালে কিন্ত আরও দুজন মানুষ আছেন, যাদের কথা না বললেই নয়- ফজলুর রহমান বাবু এবং মিশা সওদাগর।

ফজলুর রহমান বাবু কোন মাপের অভিনেতা সেটা সবাই জানে। স্বপ্নজালের ট্রেলারে তার মুখে “সে তো ইন্ডিয়া চলে গেছে, জোয়ান একটা মেয়েকে বিয়ে করে…” ডায়লগটা শুনেই মুগ্ধ হয়েছি, সিনেমা হলে গিয়ে সেই মুগ্ধতাটা বাড়াতে চাই বহুগুণে। অজ্ঞাতনামায় তার অভিনয় চোখে লেগে ছিল, স্বপ্নজালেও বড় সম্পদ হতে পারেন এই মানুষটাই। আর মিশা সওদাগরকে কমার্শিয়াল সিনেমার বাইরে সেভাবে দেখা হয়নি, টিপিক্যাল চিৎকার-চেঁচামেচির ডায়লগ ছেড়ে তিনি কেমন অভিনয় করেন, সেটা দেখার জন্যে হলেও স্বপ্নজাল দেখতে ছুট লাগানো যায়।

স্বপ্নজাল, গিয়াসউদ্দীন সেলিম, মনপুরা, পরীমনি

তবে হতাশার বিষয় অবশ্যই প্রচারণা। মনপুরার নয় বছর পরে গিয়াসউদ্দীন সেলিমের সিনেমা আসছে, যে পরিমাণ হাইপ ওঠার কথা ছিল এটা নিয়ে, সেরকম কিছু দেখা যায়নি। নির্মাতাদের দায় এখানে খানিকটা হলেও আছে। আপনি ভালো একটা সিনেমা বানাবেন, অথচ দর্শক সেটা সম্পর্কে জানতে পারবে না, তাহলে সিনেমা হল পর্যন্ত যাওয়ার ইচ্ছেটা তাদের মধ্যে জাগবে কেন? প্রচারণা কি, সেটা দেখিয়েছিল আয়নাবাজি, কিংবা ঢাকা অ্যাটাক। সেলিম নিজেও তো তার প্রথম সিনেমাটাকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়ার সর্বাত্নক চেষ্টা করেছিলেন, সেই ২০০৯ সালে ইন্টারনেট-স্মার্টফোন-ফেসবুকবিহীন একটা সময়ে যেভাবে সিনেমার প্রচারণা চালিয়েছেন, সেটা স্বপ্নজালের ক্ষেত্রে দেখা গেল কই? প্রচারণার জন্যে বেশ কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছে স্বপ্নজাল টিম, পরিচালক বলেছেন, এই সিনেমার দর্শক তরুণরা, এটা তরুণদের সিনেমা। তবুও মনে হচ্ছে, অনেক কিছুই যেন অপূর্ণ রয়ে গেল এই জায়গাটায়।

আজ দেশের বিশটা সিনেমা হলে মুক্তি পাচ্ছে সিনেমাটা, একটা ভালো সিনেমার জন্যে আসলে এই সংখ্যাটাও অপ্রতুল। চট্টগ্রাম বা বরিশালের কোন সিনেমা হলেই মুক্তি পাচ্ছে না স্বপ্নজাল। তবে স্বপ্নজাল টিম জানিয়েছে, এটা তাদের সিদ্ধান্ত। ভালো প্রতিক্রিয়া পেলে পরের সপ্তাহে অবশ্যই অধিক সংখ্যক সিনেমা হলে যাবার ইচ্ছে আছে তাদের। কিন্ত পরের সপ্তাহে আরও তিনটি সিনেমা মুক্তি পাবার কথা রয়েছে, শাকিব খান এবং আরিফিন শুভ’র মতো তারকারা নিজেদের সিনেমা নিয়ে আসছেন, তাদের ভীড়ে স্বপ্নজালের টিকে থাকাটা হয়তো সহজ কিছু হবে না। কিন্ত সিনেমার পেছনের মানুষটা যখন গিয়াসউদ্দীন সেলিম, তখন দারুণ কিছুর প্রত্যাশা করাই যায়। গল্প যে সিনেমার নায়ক, সেই সিনেমাকে হারিয়ে দেয়ার সামর্থ্য কারো নেই। মনপুরা সিনেমাটাও ওয়ার্ড অফ মাউথে চলেছিল, মানুষ প্রশংসা আর ভালোবাসায় ভাসিয়েছিল এটাকে। স্বপ্নজালের বেলাতেও সেরকম কিছু ঘটবে, এমনটাও প্রত্যাশা।

স্বপ্নজালের জন্যে শুভকামনা!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-