অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

সুরভীর ভাষা! সুরভীর আশা!

তার নাম সুরভী গৌতম। জন্ম মধ্যপ্রদেশের এক ছোট্ট গ্রামে, এক গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারে। তার বাবা-মা যথেষ্ট শিক্ষিত ও মার্জিত রুচিসম্পন্ন মানুষ। বাবা পেশায় একজন আইনজীবী, আর মা একজন স্কুল শিক্ষিকা। তাই কন্যাসন্তানের জন্মে তারা খুবই খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে কন্যাসন্তানের জন্ম হওয়াটা মোটেই সুখকর কিছু নয়। তাই অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছিল। আড়ালে তার ব্যাপারে অনেক বাজে কথাই বলেছিল।

এবং মেয়ে হয়ে জন্মানোয় তাকে যে অনেকেই ছোট করে দেখে, সেটাও সে খুব অল্প বয়স থেকেই অনুধাবন করতে শুরু করে। এবং তাকে নিয়ে হাসি-তামাশা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার পরিমাণ আরও বেড়ে যায়, যখন সে প্রাথমিকের গন্ডি পেরোনোর পরও স্কুলে যাওয়া অব্যহত রাখে। একটা মেয়ের কেন মাধ্যমিক পর্যায়েও পড়াশোনার দরকার আছে, তা ভেবে অবাক হয় অনেকেই। কিন্তু তার বাবা-মা এসব কিছুর তোয়াক্কা করেননি। তারা মেয়েকে ভালো করে পড়াশোনা করার উৎসাহ দিয়ে যেতে থাকেন।

স্কুলেও সুরভী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছ থেকে অনেক আদর পেত। একবার অংকে ১০০-এ ১০০ পাওয়ায় তার শিক্ষক তাকে বলেছিল, ‘তুমি একদিন অনেক বড় হবে।’ এই কথাটা মনে গেঁথে গিয়েছিল তার। সে বুঝতে পেরেছিল, মেয়ে হয়ে জন্মানোয় তার সামনে আরও অনেক সম্ভাবনার দরজাই হয়ত বন্ধ, কিন্তু পড়াশোনা হলো এমন একটা জিনিস যার মাধ্যমে সে জীবনে উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারবে। তাই সে আরও ভালো করে পড়াশোনা করতে থাকে।

কিন্তু পড়াশোনা করাটা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। একে তো বাবা-মা সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকায় পড়াশোনার ব্যাপারে সে তাদের কোন সাহায্যই পেত না, পাশাপাশি গ্রামে সেই সময়ে দিনের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎ না থাকায় হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করতে হতো তাকে। কিন্তু তারপরও সে গ্রামের স্কুল থেকে খুবই ভালো ফলাফলের মাধ্যমে মাধ্যমিক সম্পন্ন করে। ৯৩.৪% নম্বর পায় সে। তবে এর পরই শুরু হয় তার জীবনের অগ্নিপরীক্ষা।

সুরভীর জীবনের লক্ষ্য ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। সেজন্য এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয় সে, এবং যেকোন সরকারি কলেজে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। সে সিদ্ধান্ত নেয় সিদ্ধান্ত নেয় ভোপালের একটা কলেজে পড়ার। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। কিন্তু কলেজে প্রথমদিন যেতে না যেতেই পাল্টে যায় সবকিছু। সুরভীর সামনে একে একে উন্মোচিত হতে থাকে কঠিন বাস্তবতা। হিন্দি মিডিয়ামের ছাত্রী হওয়ায় এবং গ্রামে বড় হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজিতে খুব একটা সড়গড় ছিল না সে। লিখতে পারত ঠিকই, কিন্তু ঠিকমত সাজিয়ে গুছিয়ে এক লাইন ইংরেজি বলতেও বেগ পেতে হতো তাকে। আর এই দুর্বলতাটাই প্রথমদিন কলেজে গিয়েই বেরিয়ে পড়ে সবার সামনে। এক শিক্ষক যাচ্ছেনাতাই বলে অপমান করে তাকে। ফলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে সে। ঠিক করে আর পড়াশোনাই করবে না। ফিরে যাবে গ্রামে।

জীবনের সেই কঠিন সময়ে সে পাশে পায় তার মা’কে। মা তাকে বলেন, ‘আমাদের গ্রাম থেকে ভালো ফল করে এতদূর অবধি আসা প্রথম মেয়ে হলে তুমি। গ্রামের সব মেয়েদের কাছে এখন তুমি একজন আদর্শ। সেই তুমিই যদি এত সহজে হাল ছেড়ে দাও, তাহলে ওদের কী হবে? ওরা কার কাছ থেকে আশার আলো দেখতে পাবে?’ মায়ের এই কথায় টনক নড়ে সুরভীর। সে ঠিক করে, যত কষ্টই হোক, প্রথম সেমিস্টারের মধ্যেই কাজ চালানোর মত ইংরেজি বলা শিখে নেবে সে। যারা যারা তাকে অপমান করেছে, তাদের সবাইকে উচিৎ জবাব দিয়ে ছাড়বে সে। এরপর পুরো প্রথম সেমিস্টারটাই সে কাটায় হোস্টেলের রুমে চার দেয়ালের মাঝে বন্দী থেকে। সারাদিন রুমে বসে ইংরেজি প্রাকটিস করত সে। প্রয়োজনীয় বিভিন্ন নোট টুকে রাখত খাতায়। আবার কিছু কিছু কঠিন ইংরেজি শব্দ দেয়ালেও লিখে রাখত। এক পর্যায়ে দেখা গেল, তার রুমের দেয়াল ভরে গেছে শত শত ইংরেজি শব্দে।

তার এই অসাধারণ অধ্যবসায় বৃথা যায়নি। সে যে শুধু খুব ভালো ইংরেজিই শিখে গেল তা নয়। বাধ্যতামূলক না হওয়া সত্ত্বেও সে প্রথম সেমিস্টারের সকল পরীক্ষার উত্তর করল ইংরেজিতে। এবং সেই সেমিস্টারে সে প্রথম স্থানও অধিকার করে, আর পায় একটা গোল্ড মেডেল। এরপর থেকে আর সুরভীকে কখনও পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কলেজ সম্পন্ন করার পর সে একটা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রে যোগ দেয় নিউক্লিয়ার সায়েন্টিস্ট হিসেবে। ২০১৩ সালে সমগ্র ভারতের মধ্যে সে প্রথম স্থান অধিকার করে আইইএস পরীক্ষায়। এছাড়াও ২০১৬ সালের আইএএস পরীক্ষার সম্মিলিত মেধাতালিকায় তার অবস্থান ছিল ৫০।

যখন তার জন্ম হয়েছিল, শুধু তার বাবা-মাই সেটা উদযাপন করেছিল। কিন্তু আজ গোটা গ্রামের মানুষ তাকে নিয়ে গর্ব করে, তাকে নিজেদের গ্রামের মেয়ে বলে পরিচয় দিয়ে আনন্দ পায়। ছোটবেলায় মেয়ে হয়ে জন্মানোয়, আর শহরে গিয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর গ্রামের মেয়ে ও ইংরেজি না পারার কারণে সবসময় হীনম্মন্যতায় ভুগতে হয়েছে তাকে। কিন্তু এসব হীনম্মন্যতা তার ভেতরকার মেধাকে কখনও ধ্বংস করে দিতে পারেনি। বরং সে নিজের চেষ্টায় সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করেছে।

তার এই জীবনকাহিনী শুধু গ্রাম থেকে উঠে আসা পিছিয়ে পড়া মেয়েদের, কিংবা ইংরেজি না পারাদেরই অনুপ্রাণিত করবে না, অনুপ্রাণিত করবে সেইসব লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীদেরও, যারা কোন না কোন কারণে সমাজের সামনে প্রচন্ড হীনম্মন্যতায় ভোগে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close