একটা সময় ছিল, যখন ছাত্রলীগকে নিয়ে আমার সামনে কেউ কিছু বললে সাধ্যমতো সেটার জবাব দেয়ার বা সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করতাম। আওয়ামী লীগের এই ছাত্র সংগঠনটা তার ঐতিহ্য হারিয়েছে অনেক আগেই, পঁচে দুর্গন্ধ ছড়ানোর কাজটাও নতুন হচ্ছে না আজ। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, এই সংগঠনটা বঙ্গবন্ধুর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা একাত্তরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন, নব্বইতে এই সংগঠনের কর্মীরা জীবন দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিলেন! সেই ছাত্রলীগের নেতারা এখন জনদাবীর বিপরীতে গিয়ে সাধারণ ছাত্রদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হন, সেই ছাত্রলীগের নেত্রীরা এখন একটা ন্যায্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার ‘অপরাধে’ মাঝরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে জুনিয়র মেয়েদের গায়ে হাত তোলেন, তাদের রক্তাক্ত করেন!

কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে, সেই আন্দোলন প্রকাণ্ড আকার ধারণ করেছে গত কয়েক দিনে। শুরু থেকেই স্বতস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করছেন দেশের সব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। বিদ্যমান ৫৬% কোটাটা কমিয়ে একটা সহনীয় পর্যায়ে যাতে নিয়ে আসা হয়, এটাই তাদের দাবী। আন্দোলনে ছাত্রলীগের অজস্র নেতাকর্মী শুরুর দিন থেকেই অংশ নিয়েছে, নিচ্ছে। কারণ প্রশ্নটা তাদের ক্যারিয়ারের, তাদের জীবনের। অথচ শুরু থেকেই ছাত্রলীগের হাইকমান্ড দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেছে এই আন্দোলনকে নিয়ে। শেষমেশ যখন আন্দোলন বড় আকার ধারণ করেছে, তখন প্রকাশ্য বিরোধীতায় নেমেছে এই সংগঠনটা। তাদের যুক্তি, এই আন্দোলনের পেছনে বিএনপি-জামায়াত জোটের গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে! সেই ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করতে রাতভর তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত ক্যাডার নিয়ে শো-ডাউন দিয়ে বেড়ান, পুলিশের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনকারীদের দমনে মাঠে নামেন, নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীহ কিছু ছাত্রীর গায়ে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মেরে তাদের আহত করতে একটুও গায়ে বাঁধে না এই বীরপুঙ্গবপদের!

তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে গত রাতের ঘটনাটা। গভীর রাতে হুট করেই ফেসবুকের নিউজফিড সয়লাব হয়ে গেল একটা রক্তাক্ত পায়ের ছবিতে। সেই ছবিটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রী মোরশেদা আক্তারের। একই ছবির নীচে অনেক রকমের ক্যাপশন, তবে সবগুলোর ভাষা মোটামুটি একই- সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহান তার রুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করেছেন ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনে’ অংশগ্রহণ করা মেয়েদেরকে। এদের মধ্যে ছিলেন বোটানী বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী মোরশেদা আক্তারও, এক পর্যায়ে মোর্শেদার পা ধারালো বস্তুর আঘাতে কেটে যায়- এমনটাই দাবী করেছিলেন ছাত্রীরা। তবে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে হলের প্রভোস্ট জানিয়েছেন, নির্যাতনের ফলে নয়, কাঁচের দরজার সঙ্গে লেগে পা কেটেছে মোরশেদার। তবে রুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের ঘটনা সত্যি বলেই স্বীকার করেছেন তিনি।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিতে ৮ মে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলো থেকে দলে দলে বেরিয়ে এসেছিলেন ছাত্রীরা। শত শত পেরিয়ে সংখ্যাটা হাজার ছুঁয়েছিল, ঘড়ির কাঁটায় তখন মধ্যরাত অতিক্রম করে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। একটা আন্দোলনে অংশ নিতে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরা রাজপথে দাঁড়িয়েছে- এমনটা অহরহ দেখা যায়। কিন্ত হলের গেট ভেঙে মধ্যরাতে বেরিয়ে এসে আন্দোলনে যোগ দেয়াটা অন্যরকম একটা উদাহরণ হয়েই থেকেছে সেই রাতে। কিন্ত অংশগ্রহণকারীরা তখন জানতো না, এই ‘অন্যায়ের’ শাস্তি তাদের ভোগ করতে হবে অচিরেই!

হলের ছাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, গত পরশু থেকেই আন্দোলনে যোগ দেয়া শিক্ষার্থীদের খুঁজে খুঁজে হল প্রেসিডেন্টের রুমে ডেকে পাঠানো হয়েছে। সেখানে নির্যাতন চালানো হয়েছে তাদের ওপর। ভয়ে গতকাল কেউ ঘটনা স্বীকার করেননি, বাইরের কাউকে এসব জানায়নি নির্যাতনের শিকার হওয়া মেয়েরা। গতকাল সন্ধ্যায় আবার হল থেকে মেয়েরা দল বেঁধে আন্দোলনে যোগ দিতে গেলে বাধা দিয়েছিলেন ছাত্রলীগ সভাপতি ইফফাত। কিন্ত সেই বাধা উপেক্ষা করেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন হলের ছাত্রীরা। আন্দোলন থেকে ফেরার পরে তাদের ডাক পড়ে সভাপতির কক্ষে। সেখানে তাদের ওপর আবারও চালানো হয় নির্যাতন। সেখানেই রক্তাক্ত হন মোরশেদা আক্তার- এমনটাই জানিয়েছেন সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রীরা।

ঘটনাটা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুফিয়া কামাল হলের বাইরে জড়ো হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। প্রায় হাজারখানেক ছাত্র উপস্থিত হয়ে গিয়েছিল সেই মধ্যরাতে। তাদেরকেও আসতে বাধা দেয়া হয়েছে রাস্তায়, কোথাও হয়তো হলের গেট বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, কোথাওবা রাস্তায় বাধা পড়েছে। কারা বাধা দিয়েছে সেটা না বললেও চলছে। সুফিয়া কামাল হলের ভেতরেও তখন লঙ্কাকাণ্ড। ছাত্রলীগ সভাপতি ইফফাত জাহান এষার রুমের বাইরে জড়ো হয়েছে ছাত্রীরা, তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল অনেকটা সময়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন সেখান থেকে। প্রথমে হল, তারপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে বহিস্কার করা হয়েছে, এর মাঝে ছাত্রলীগও তাকে দল থেকে বহিস্কার করেছে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

দেশের প্রায় শ’খানেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী একটা যৌক্তিক দাবীতে আন্দোলন করছেন, একটা একটা ভুল, কিংবা অন্যায় সিস্টেমকে পরিবর্তনের দাবীতে একাত্ম হয়েছে এতগুলো ছেলেমেয়ে, সেখানে ছাত্রলীগ কেন এমন ভূমিকা নেবে? কেন ছাত্রলীগ গভীর রাতে রামদা হাতে শো-ডাউন করবে ক্যাম্পাসে, কেন আন্দোলনকারীদের রাজাকার আখ্যা দেবে, কেন মধ্যরাতে একটা ছাত্রী হলের ছাত্রলীগ সভাপতি তার কক্ষে ডেকে নিয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রীকে নির্যাতন করবেন? তাকে এই অধিকার কে দিয়েছে? এই আন্দোলন থেকে কি আওয়ামীলীগকে কটাক্ষ করে কিছু বলা হয়েছে? বঙ্গবন্ধু বা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কি গালাগালি করা হয়েছে আন্দোলনকারীদের কোন মিছিল-সমাবেশ থেকে? এই আন্দোলনে কি সরকার পতনের কথা বলা হয়েছে একবারও? তাহলে ছাত্রলীগের কিসের এত ভয়? কেন ছাত্রলীগ যেচে পড়ে আন্দোলনকারীদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে, কেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনটাকে সহিংস হবার দিকে উস্কে দিচ্ছে? একটা জনবান্ধব দাবীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ না করে ছাত্রলীগ কেন সবার কাছে ‘সরকারী ভিলেনে’ পরিণত হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর জবাব কেউ দিতে পারেন?

প্রেস ব্রিফিঙে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেছেন ইফফাত জাহানকে বহিস্কারের কথা। ছাত্রী নির্যাতনের কথাটা স্বীকার করেছেন তিনিও। ইফফাত বহিস্কৃত হয়েছে ছাত্রলীগ থেকেও। আমি জানতে চাই, তার বিরুদ্ধে কি ফৌজদারী আইনে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বা হচ্ছে? শারীরিকভাবে আঘাত করাটা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সেই অপরাধের কারণে তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেয়া হয়েছে কি? ছাত্রলীগ কেন ছাপানো প্যাডে একটা ‘বহিস্কারাদেশ’ লিখেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতে চাইছে? যে প্রেস রিলিজে অভিযুক্তের নামটা পর্যন্ত ভুল বানানে লেখা! ইফফাত জাহান তাদের দলীয় নেত্রী, তাদের মনোনিত হল প্রেসিডেন্ট। সেই নেত্রী যখন অপরাধ করবে, অন্যায় করবে, সেই অন্যায়ের জবাবদিহি তো ছাত্রলীগকেও করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে কেউ কি কথা বলেছেন এই ব্যাপারে? হ্যান্ডমাইক হাতে নিয়ে সুফিয়া কামাল হলের চত্ত্বরে ইফফাত জাহান এষা ক্ষমা চেয়েছেন তার কৃতকর্মের জন্যে, তাকে হলের সভাপতি যারা নির্বাচিত করেছিলেন, তারা কি ক্ষমা চাইবেন?

ছাত্রীদের গায়ে হাত তোলা এই নেত্রীর কি শাস্তি হবে আমি জানি না। বিশ্ববিদ্যালয় বা দল থেকে বহিস্কারটা তার এই অন্যায়ের যথাযথ শাস্তি নয়। অবশ্য এর বেশী কিছু আশা করাটাও অন্যায় বোধহয়। কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটা ছাত্র আন্দোলনে এক ছাত্রীকে পিটিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন কুয়েত মৈত্রী হলের এক ছাত্রলীগ নেত্রী। প্রবল সমালোচনাও হয়েছিল সেটা নিয়ে। সেই নেত্রী এখন সরকারী ডেলিগেশন কার্ড গলায় ঝুলিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে ভারত সফরে যান, নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তোলা ছবি ফেসবুকে আপলোড দেন। সামনে ছাত্রলীগের কাউন্সিল, সেখানে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদও পেয়ে যেতে পারেন, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। ছাত্রীর চুল টানুন আর পেটে লাথি মারুন, ন্যায়-অন্যায়ের বাছবিচার একপাশে ফেলে রেখে দিনশেষে তিনি সংগঠনের প্রতি অনুগত তো!

গতকাল মাঝরাতে ছাত্রলীগ নেত্রীর এই ছাত্রী নির্যাতনের খবরটা যখন ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে, তখন ছাত্রলীগ সভাপতির একটা সাক্ষাৎকার চোখে পড়লো। বাংলানিউজের পক্ষ থেকে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নেতিবাচক ঘটনায় ছাত্রলীগে জড়িত থাকার প্রসঙ্গে। সাইফুর রহমান সোহাগ নির্দ্বিধায় বলে গেলেন- “এসব খবর কে দিয়েছে? আপনারা সাংবাদিকেরা দিয়েছেন। নেতিবাচক ঘটনার কোথাও আমাদের ছাত্রলীগ ছিল না। ছাত্রলীগ অতীতে কখনও অপকর্মে জড়িত ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না…”

করুণার হাসি মুখে ঝুলিয়ে আমি ফেসবুকের নিউজফিডে ভেসে বেড়ানো রক্তাক্ত পায়ের ছবিটা দেখি, ছাত্রলীগের সভাপতিকে আমার কাছে মীরাক্কেলের কোন প্রতিযোগী বলে মনে হয়, দুর্বল কৌতুক বলে যিনি লোক হাসানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যান! ইফফাত জাহান এষাদের এই অন্যায়-অপকর্মের দুঃসাহসটা কোত্থেকে আসে, আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না। ছাত্রলীগের প্রতি ভালোবাসা ছিল না হয়তো,  কিন্ত সহানুভূতিটা ছিল পুরোপুরি। অথচ এখন সেটা ওদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের কারণেই নষ্ট হয়েছে। 

যে ছাত্রলীগ একাত্তরে রক্ত দিয়েছিল, যে ছাত্রলীগ স্বৈরাচারের বুলেট বুকে পেতে নিয়েছিল, সেই ছাত্রলীগ এখন বিশ্বজিতের রক্ত গায়ে মাখে, সেই ছাত্রলীগ এখন ‘জয় বাংলা’ বলে রাস্তাঘাটে মেয়েদের উত্যক্ত করে, সেই ছাত্রলীগের নেত্রী আন্দোলনে অংশ নেয়ার কারণে নিরীহ ছাত্রীদের গায়ে হাত তোলে! আমি নিশ্চিত, বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের এসব কাণ্ডকীর্তি তার জীবদ্দশায় দেখতে পেলে লজ্জায় হেঁট হয়ে যেতেন। ভাগ্যিস, নিজের হাতে গড়া সংগঠনের এই চেহারাটা তাঁকে দেখতে হয়নি!

Comments
Spread the love