নেব্রাস্কার ওমাহায় একটি গ্রোসারি স্টোরে চাকরি পেল দুই তরুণ। বয়সে বড় যে তরুণটি, খুবই দরিদ্র এক পরিবার থেকে এসেছে সে। বিশ্বমন্দার কবলে পড়ে সহায়-সম্বল সব হারিয়েছে তারা। এখন তার কাজ হলো হ্যামস্টার বানিয়ে বিক্রি করা। অন্যদিকে কমবয়েসী তরুণটি ওই দোকানেরই যিনি মালিক, তার নাতি। এবার কলেজ জীবনে পা রাখার কথা তার। কিন্তু সে তা না করে নানা জায়গায় পার্ট টাইম জব করে বেড়াচ্ছে।

ওই সময়ে দুই তরুণেরই দৈনিক আয় মাত্র দুই ডলার করে। এই অতি সামান্য অর্থ দিয়েই কোনমতে খেয়ে-পরে দিন কাটে তাদের। এর মাত্র কয়েক দশক পরের কথা। এই দুই তরুণই প্রতি বছর তাদের কোম্পানি ‘বার্কশায়ার হাথওয়ে’র কল্যাণে প্রতি বছর ২০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে শুরু করে। পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কারা এই দুই তরুণ? তারা আর কেউ নন, চার্লি মাঙ্গার এবং ওয়ারেন বাফেট – যাদের কথা নিশ্চিতভাবেই অসংখ্যবার শুনেছেন আপনারা।

এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে অতি সামান্য একটি তথ্যে: বাফেট তার দিনের ৮০% সময়ই ব্যয় করেন বই পড়ার কাজে!

২০০৭ সালে ৮৪ বছর বয়সী চার্লি মাঙ্গার এক ঝাঁক আইনের শিক্ষার্থীর সামনে দেয়া এক বক্তব্যে তুলে ধরেন তাদের সাফল্যের রহস্য। তিনি বলেন,

‘আমি প্রায়ই এমন অনেক মানুষকে জীবনে সফল হতে দেখি, যারা হয়ত তথাকথিত সেরা স্মার্টদের একজন নন, এমনকি সবচেয়ে পরিশ্রমী ব্যক্তিও নন। কিন্তু তাদের মধ্যে যে বিরল গুণটি রয়েছে, তা হলো প্রতি মুহূর্তে নতুন কিছু জানার ও শেখার স্পৃহা। প্রতিদিন রাতে তারা ঘুমাতে যান আগের দিনের চেয়ে একটু হলেও বেশি জ্ঞানী হিসেবে। এবং বিশ্বাস করো ছেলেরা, এই বিষয়টি জীবনে চলার পথে সত্যিই অনেক সাহায্য করে।’

এই নতুন কিছু জানা ও শেখার জন্যই আসলে দরকার বেশি বেশি বই পড়ার। কেননা বই পড়ে মানুষ একসাথে যত বিচিত্র বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করতে পারে, অন্য কোন মাধ্যমের দ্বারা তা সম্ভব নয়। আর এই বিষয়টিই অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতেন মাঙ্গার ও বাফেট। শোনা যায়, বিনিয়োগ জীবনের শুরুর দিকে বাফেট নাকি এক দিনেই ৬০০ থেকে ১০০০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ে ফেলতেন। এবং এখনও তিনি তার দিনের ৮০% সময় ‘কাজে লাগান’ বই পড়ার মাধ্যমে।

‘প্রতিদিন অন্তত ৫০০ পৃষ্ঠা বই পড়ো। এভাবেই জ্ঞান কাজে লাগে। এটা তোমাকে আরও বড় করে তোলে, তোমার আগ্রহের গন্ডিকে বাড়িয়ে দেয়। তোমরা প্রত্যেকেই এই কাজটি করতে পারো, কিন্তু আমি জানি তোমাদের মধ্যে খুব কম মানুষই এই কাজটি শেষ পর্যন্ত করবে’, বই পড়ার ব্যাপারে এমনই দৃষ্টিভঙ্গি বাফেটের। বাফেটের আরও একটি সাদামাটা কিন্তু কার্যকরী দর্শন হলো: ‘জীবনে যে পরিস্থিতিই আসুক না কেন, শেখার অভ্যাস অব্যহত রাখতে হবে, এবং এভাবেই সফলতার দেখা মিলবে।’

পাঠক যদি মনে করেন বই পড়ুয়াদের মধ্যে শুধু বাফেট আর মাঙ্গারই বিলিয়নিয়ার হতে পেরেছেন, সেটি কিন্তু বড় রকমের ভুল হবে। জীবনে সফল আরও অনেক ব্যক্তিরই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো বই পড়া। 

প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এলন মাস্ক এমনকি রকেট বানানোও নাকি শিখে ফেলেছিলেন কেবল বই পড়েই। ছোটবেলায় দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন মাস্ককে সমবয়সী ও বড়দের কাছ থেকে অনেক হেনস্তার শিকার হতে হতো। সেই সময়ে তিনি স্বস্তি খুঁজে নিতেন ফ্যান্টাসি ও কল্পবিজ্ঞানের বইয়ের জগতে। এবং এই বই পড়ার অভ্যাসই পরবর্তী জীবনে তাকে পৃথিবীর বুকে চিরস্মরণীয় কিছু করে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত বিল গেটসও কিন্তু খুব বড় মাপের একজন বইপোকা। প্রতি বছর প্রায় ৫০টির মত বই পড়ে শেষ করেন তিনি। যদিও সেগুলো সবই নন-ফিকশন। কাজের সুবাদে তাকে নিয়মিতই নিত্যনতুন জায়গায় ভ্রমণ করতে হয়, বিচিত্র স্বভাবের লোকজনের সাথে ওঠাবসা করতে হয়। এসবের সুবাদে নেহাত কম কিছু শেখেন না তিনি। তারপরও নতুন জ্ঞান অর্জনের জন্য বই পড়াকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন তিনি।

একইভাবে, ফেসবুকের জনক মার্ক জাকারবার্গের কাছেও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হলো বই পড়া। অন্য মাল্টি-মিলিয়নিয়ারদের মত প্রচুর বই হয়ত পড়তে পারেন না তিনি। তারপরও ২০১৫ সাল থেকে তিনি চেষ্টা করে আসছেন প্রতি দুই সপ্তাহে অন্তত একটি বই শেষ করার।

প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার এই যুগে এসে অনেকের কাছেই বই পড়াকে ‘যন্ত্রণা’ বলে মনে হতে পারে। কারণ ধরুন আপনি এক ঘন্টা দারুণ মনোনিবেশের মাধ্যমে হয়ত কোন একটি বিষয়ে বই পড়ে কিছু জানলেন। অথচ ওই একই জিনিস সম্পর্কে আপনি ইউটিউবে বা টিভিতে মাত্র পাঁচ মিনিটের একটি ভিডিও দেখেই জেনে ফেলতে পারতেন। তাহলে ‘খামোকা’ বই পড়া কেন?

এর কারণ হলো, জ্ঞানকে তুলনা করা যায় পানিতে ডুবে থাকা একটি বরফখন্ডের সাথে। পানির উপরে তার মাথাটাই শুধু উঁচিয়ে থাকে, বাকি পুরো শরীরটা লুকিয়ে থাকে পানির গহীন তলদেশে। অন্য যেকোন মাধ্যমের দ্বারা আপনি শুধু পানির উপরের অংশটুকুই দেখতে পারবেন। কিন্তু পানির নিচের অংশ আপনাকে দেখাবে কেবল একটি মাধ্যমই, তা হলো বই।

তাহলে পাঠক, আজ থেকে শুরু করছেন তো নিয়মিত বই পড়া?

Comments
Spread the love